kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

অন্তরালের মানুষ

তিনি শব্দের কারিগর

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। এ সময়ের আলোচিত প্রায় সব ছবির শব্দগ্রাহকই তিনি। অন্তরালের এ মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন ইসমাত মুমু

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তিনি শব্দের কারিগর

নিজের স্টুডিওতে তৌকীর আহমেদের মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবি ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর শব্দের কাজ করছেন রিপন

স্বপ্ন দেখতেন মিউজিশিয়ান হবেন। ওস্তাদজির কাছে নিয়মিত তালিম নিয়েছেন। অনার্স পড়ার সময়ই মাথায় এলো কিছু একটা করতে হবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, গানবাজনা করে তো আর জীবন চলবে না। বাবার ইচ্ছে পড়াশোনা শেষে চাকরি করবে ছেলে। ‘মেজদা স্বপন নাথের কাছের বন্ধু শব্দ প্রকৌশলী রতন পাল। দাদাকে বললাম, তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাই, দাদাও রাজি হয়ে গেলেন। এভাবেই ঢাকা ও মিডিয়ায় ঢুকে পড়া। মাথায় ছিল, সাউন্ডের কাজ শেখার পাশাপাশি মিউজিকটাও করব’, বললেন রিপন।

শুরুর সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। প্রায় পাঁচ বছর স্ট্রাগল করেছেন। গন্তব্য অনেক দূর, তাই স্ট্রাগলে কাবু হননি কখনো। কর্মজীবনের শুরু বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিকের ধ্বনিচিত্রে। সেখানে ছিলেন প্রায় ১০ বছর। প্রথম কাজ অমিতাভ রেজার একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম। প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজও অমিতাভ রেজার সঙ্গে—সানসিল্কের একটা বিজ্ঞাপন। ‘প্রথম বিজ্ঞাপনের কাজটি করতে পেরেছিলাম অনেকটা ভাগ্যের জোরে। আমার সিনিয়র সহকর্মী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, সুযোগ পাই আমি। এরপর কত হাজার বিজ্ঞাপনের সাউন্ড ডিজাইন করেছি বলে শেষ করতে পারব না’, বলেন রিপন।

চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন—সাউন্ডবক্স স্টুডিও। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজিয়েছেন স্টুডিও। এখানে রয়েছে Protools HDX, অত্যাধুনিক MicroPhone & Sorround Sound Setup. এখানে একটা ফিল্মের পূর্ণাঙ্গ সাউন্ডের কাজ হয়। আগে এই কাজটার জন্য দেশের বাইরে যেতে হতো দেশীয় নির্মাতাদের।

কাজটি কিভাবে রপ্ত করেছেন? ‘আসলে শেখার তো শেষ নেই। প্রত্যেক দিনই নতুন কিছু না কিছু শিখছি। শব্দ তো দেখা যায় না, শুনে করতে হয়। পুরোটাই ফ্রিকোয়েন্সির খেলা। সাউন্ড ডিজাইনার হওয়ার জন্য বিজ্ঞানের অনেক টার্ম জানা জরুরি। এ পেশাটার জন্য খুব জরুরি বিষয় হলো ধৈর্য। নতুনদের অনেকে এসেই হুটহাট কিছু একটা করে ফেলতে চায়! এভাবে হয় না’, বলেন রিপন।

এ সময়ের নামি প্রায় সব চলচ্চিত্রের সাউন্ডের কাজ করেছেন রিপন। ২০০৪ সালে প্রথম কাজ করেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’-এ। রিপন বলেন, “আমি তখন সহকারী। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতাম। দেখতাম কিভাবে কী করছেন পরিচালক। তিনি না থাকলে একটা-দুইটা ডাবিং করতাম, ভয়েস নিতাম। আমার তখনকার বস আব্দুস সত্তার রিপন দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। সেই সুযোগে কাজটা মেলে। নিজের নামে করা প্রথম ছবি হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে জল।’”

মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সব ছবিরই শব্দ প্রকৌশলী তিনি। ‘ফারুকী ভাই এবং তাঁর ছবি আমাকে একটু বেশিই অভিজ্ঞ করেছে। আমার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অনেকেই। একজনের নাম বলতে হলে সেটা ফারুকী ভাই’, বলেন রিপন।

জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন দুবার। ২০১৩ সালে রেদওয়ান রনির ‘চোরাবালি’ ও ২০১৭ সালে অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’-তে।  আবু শাহেদ ইমনের ‘জালালের গল্প’, গিয়াসউদ্দিন সেলিমের ‘মনপুরা’ ও ‘স্বপ্নজাল’ ছবিতেও প্রশংসিত হয়েছে রিপনের কাজ। উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় আছে ‘প্রজাপতি’, ‘তারকাটা’, ‘সম্রাট’, ‘আইসক্রিম’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘হালদা’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘বিজলি’ ও ‘বেঙ্গল বিউটি’। আছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও—‘দাগ’, ‘পেপার ফ্রগ’, ‘নট ইকুয়েল’ ও ‘আ পেয়ার অব স্যান্ডেল’।

কাজ করেছেন ভারতীয় ছবিতেও—আশিষ রায়ের ‘সিতারা’।

‘শব্দ প্রকৌশলীদের অনেকেই পুরস্কার দিতে চান না। শুধু জাতীয় পুরস্কারেই শব্দগ্রাহককে মূল্যায়ন করা হয়। ফারুকী ভাইয়ের সব ছবিই আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু তিনি জাতীয় পুরস্কারে ছবি জমা দেন না। দিলে হয়তো পুরস্কারের পাল্লা আরো ভারী হতো। তবে এসব নিয়ে আফসোস নেই’, বললেন রিপন।

রিপন বলেন, ‘একটা ফিল্মের শব্দের কাজ ভালো করতে হলে ৪৫০ ঘণ্টা সময় লাগে। খুব ভালো করতে চাইলে লাগবে ৬০০ ঘণ্টা। আয়নাবাজির কথাই বলি। এই ছবির জন্য এক হাজার ২০০ ঘণ্টা কাজ করেছি। কাজটা করেছি আত্মতৃপ্তির জন্য। আমার শতভাগ আত্মবিশ্বাস, বিদেশের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ দিয়ে কাজ করতে পারি আমরাও। কিন্তু আমাকে সময় ও সময়ের দাম তো দিতে হবে! শুটিংয়েই একটা ছবির বাজেট শেষ, পোস্ট প্রডাকশনের জন্য আর টাকা থাকে না। এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেও চায় না। তবু কাজটা করছি, কারণ আমি অনেক বেশি প্যাশনেট ফিল্মের ব্যাপারে।’

‘শুধু বাংলাদেশ নয়, আরো অনেক দূর যাওয়ার প্ল্যান আমার। সেটা যদি করতে পারি, তাতে বাংলাদেশের নামই উজ্জ্বল হবে’, বলেন রিপন।

 

রিপনকে নিয়ে

তার সাফল্য কামনা করি

তৌকীর আহমেদ

আমার শেষ তিন ছবির কাজ ও করেছে। আস্থা আছে বলেই ওর কাছে যাই। সাউন্ডের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সে কোয়ালিটি কাজ করছে। কাজগুলো সে শৈল্পিকভাবে করে। তার সাফল্য কামনা করি। আমার শেষ ছবিটা পিরিওডিক্যাল—‘ফাগুন হাওয়ায়’। এসব ছবিতে সাউন্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘অজ্ঞাতনামা’ এবং ‘হালদা’-তেও সাউন্ডের মাধ্যমে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আবহ তৈরি করেছে সে। আশা করি আমাদের সামনে আরো কাজ হবে।

 

ও আমাদের আস্থার জায়গা

অমিতাভ রেজা

এফডিসির বাইরে আমরা যাঁরা ছবি বানাচ্ছি, রিপন নাথ তাঁদের ওয়ান অ্যান্ড অনলি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। অনেক বছর ধরে সে আমাদের আস্থার জায়গা। আমি তো জীবনের প্রথম থেকেই ওর সঙ্গে কাজ করছি। আমার সিনেমাসহ প্রায় সব বিজ্ঞাপনের কাজ ওর করা। টেলিভিশন প্রডাকশনও যা বানিয়েছি সব করেছে ও। সে জানে আমি কী চাই। রিপনের সীমাবদ্ধতা একটাই। যেহেতু সে একা এবং একমাত্র এখানে, তার হাতে প্রচুর কাজ। এ কারণে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না। আরেকটা কথা না বললেই নয়, দিনের পর দিন ও ফোন ধরে না। প্রচুর গালাগাল করে ওর সঙ্গে কাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু কী করা? ও ছাড়া তো আমাদের অপশন নেই। ওর স্টুডিওর সোফায় ঘুমিয়ে কত রাত কাটিয়েছি। এমনও হয়েছে ও টানা ৭২ ঘণ্টা কাজ করে চেয়ারে ঘুমিয়ে গেছে। ওকে উঠিয়ে আবার কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।

মন্তব্য