kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

স্মৃতিতে গানের বুলবুল

২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্মৃতিতে গানের বুলবুল

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল [১৯৫৬-২০১৯]

তাঁর সুরে হাজার খানেক গান গেয়েছি

এন্ড্রু কিশোর

বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ১৯৭৬ সালে। তখন তিনি সত্য সাহার প্রধান সহকারী। গিটার বাজাতেন। সমবয়সী হওয়ায় দ্রুত সখ্য গড়ে ওঠে আমাদের; যদিও আমি তাঁকে আপনি করেই বলতাম। তিনি বলতেন তুই করে। তাঁর আজিমপুরের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বুলবুল ভাই এবং তাঁর বড় ভাই টুটুল একই রুমে থাকতেন। তিনিও মুক্তিযোদ্ধা। ওই রুমটাই ছিল আমাদের আড্ডার জায়গা। তাঁর মা-বাবাও আমাদের আড্ডাবাজি পছন্দ করতেন। পরে বিশ্ব [কুমার বিশ্বজিৎ] ও তপন [তপন চৌধুরী] ঢুকল আমাদের সার্কেলে। ‘আঁখি মিলন’ ছবির ‘আমার গরুর গাড়িতে’ তাঁর সুরে আমার প্রথম গান। গানটিতে দ্বৈত গাওয়ার জন্য আমিই তাঁকে সামিনা চৌধুরীর বাসায় নিয়ে যাই। গানটির শ্রোতাপ্রিয়তার পর ‘নয়নের আলো’ ছবিতে আবারও জুটিবদ্ধ হই   সামিনার সঙ্গে। ছবিতে আমি একক কণ্ঠে গাই ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’। সামিনার সঙ্গে ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’। গানগুলো হিট হওয়ার পর বুলবুল ভাইয়ের সুরে টানা গাইতে থাকি। আমার মনে হয়, তাঁর সুরে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার গান করেছি। আমাদের এত এত গান শ্রোতারা পছন্দ করেছে, গানগুলোর কথা এখন মনেও করতে পারব না।

বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে কত কত স্মৃতি। একটা স্মৃতি এ মুহূর্তে বেশ মনে পড়ছে। তখন নিয়মিত সকাল ১১টার দিকে তাঁর স্টুডিওতে যেতাম। দুপুরে মগবাজার হোটেলে খেতাম। একটা গানে ভয়েস দেওয়ার আগে বললাম, আমি একটু বাসায় যাই। বললেন, ‘তুই দেরি করিস না। গান করতে হবে।’ বাসায় গিয়ে দেখি ভাত রান্না হয়নি। গোসল সারলাম। সব মিলিয়ে আসতে ঘণ্টা দেড়-দুয়েক দেরি। ফিরে এসে দেখি গানটি অন্য শিল্পী গাইছেন। আমি কাউকে কিছু না বলে বাসায় ফিরে আসি। নিজে নিজে দুঃখ করি, কাঁদি। নিজেকে বোঝালাম দোষ তো আমারই, দেরি করেছি আমি। কষ্ট পাওয়ার কথাটা তাঁকে কখনোই বলিনি।

‘বুলবুল ভাই’য়ের সঙ্গে এন্ড্রু কিশোর

গত বড়দিনে আমার বউ একটা কেক বানায় তাঁর জন্য। কেকটা নিয়ে বাসায় যাই। তাঁর ছেলে মনও ছিল। অনেকক্ষণ গল্প করি। এক ফাঁকে দুজন নিজেদের কবরস্থান নিয়ে কথা বলি। আমার কথা শুনে বলেন, ‘শোন, আমি কিন্তু একটা চিন্তা করে রেখেছি। এই হাউজিংয়ের [আফতাবনগর] মধ্যে একটা জায়গা কিনব। সেটাই হবে আমার কবরস্থান।’ বললাম, ‘এই হাউজিংয়ে কবর করতে দেবে না।’ বলেন, ‘না না। অথরিটির সঙ্গে আমি কথা বলব।’ আজ [গতকাল] মনকে সে কথা বলতেই কেঁদে উঠে বলল, ‘আব্বা চাইতেন রাস্তার পাশে তাঁর কবর হবে। লোকজন আসবে। ফুল দেবে!’

সর্বশেষ আমাকে ফোন দেন সপ্তাহখানেক আগে। বলেন, ‘তুই কি জানিস সুরকার সেলিম আশরাফ অসুস্থ। তোরা তো সব জায়গায় চলাফেরা করিস। দেখ না তাঁর জন্য একটা ফান্ড করা যায় কি না।’ আজ বুলবুল ভাই নিজেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! ব্যথায় বুকটা ভারী হয়ে আসছে।

 

তাঁর গান করেই পেয়েছি প্রায় সব পুরস্কার

রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বাংলার বুলবুল। একাধারে তিনি শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা ও কম্পোজার। গানের জগতে তিনি ছিলেন সব্যসাচী। সারা জীবন গান নিয়ে গবেষণা করেছেন। ‘চাহিবা মাত্রই’ তাঁর গানে প্রেম, বিরহ, কটাক্ষ, অনুরাগ, দেশপ্রেম, শিশুর সারল্য, সামাজিক নাটকীয়তা, বিদ্রোহ পাওয়া যেত। তাই ছবির গানের ফরমায়েশি জগতে তাঁর কদর ছিল আলাদা। তাঁর সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, নিজেই গান লিখতেন। তাই সুর আরো সুন্দর করে বসে যেত গানের কথায়। মনে হতো এই গানের সুর ও কথা যমজ হয়ে জন্ম নিয়েছে! তিনি ছিলেন স্বভাবকবি। মুখে মুখে গান বানানোর অসম্ভব দক্ষতা তাঁর। একই সঙ্গে নিজের সৃষ্টিকে অবহেলা করার দারুণ স্পর্ধাও ছিল। গান রেকর্ড হয়ে গেলে সে লেখা তিনি ছিঁড়ে ফেলতেন। আমরা আপত্তি জানালে বলতেন, আমার গান আমি কেন সংগ্রহ করব। গান ভালো হলে কালের প্রবাহেই তা জমা থাকবে।

ব্যক্তিগত জীবনে বোহেমিয়ান এ মানুষটা নিজের জন্য কিছুই করেননি। গান, গান আর গান করেই জীবন পার করলেন। জীবনের প্রথম দিকে বেহালা গিটার বাজাতেন, মাঝ বয়সে এসে সেগুলোই আবার নতুন করে শেখার কী প্রচেষ্টাই না ছিল তাঁর! নিজেই ছিলেন নিজের শিক্ষক।

অসম্ভব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। গানেও অপার দেশপ্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ করে গেছেন। ছবির গানেও তিনি বায়না করে দেশের গান ঢোকাতেন। ভালো কণ্ঠের জন্য তিনি শিল্পী খুঁজে বেড়াতেন আজীবন। আমাকেও তিনি নিজে খুঁজে বের করেছিলেন। ১৯৯২ সালের কথা, এক অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী শাকিলা আপা বললেন, ‘কনক, বুলবুল ভাই তোকে খুঁজছেন, তাড়াতাড়ি যোগাযোগ কর।’ তাঁর সঙ্গে পয়লা গান ‘সাদা কাগজ এই মনটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম’, মিলু ভাইয়ের সঙ্গে দ্বৈত। সেদিনই বুলবুল ভাই বললেন—ভাবী, ইনশাআল্লাহ অনেক গান হবে, আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব কখনো পেছনে তাকাতে হবে না! সত্যিই, সেদিন থেকে আমার আর অবসর ছিল না। বুলবুল ভাই মাসে প্রায় ১০টা ছবি হাতে নিতেন এবং বেশির ভাগ গান আমাকে দিয়েই গাওয়াতেন। নিজে অনেক গবেষণা করতেন কিন্তু গানের কণ্ঠের ব্যাপারে নির্ভরশীল হতে চাইতেন। এরপর সত্যিই আমাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রায় প্রতিটি গানই মাইলফলক হয়ে যাচ্ছিল। তাঁর গান করেই প্রায় সব পুরস্কার পাওয়া আমার! তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

একটি কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’র পর  যদি আর কোনো গানই সুর না করতেন তবু বাংলাদেশ তাঁর কাছে সমান কৃতজ্ঞ থাকত। আমি এই সব্যসাচী সংগীতজ্ঞের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ উনাকে ওপারে শান্তি দিন। আমীন।

মন্তব্য