kalerkantho

প্রিয় গানের গল্প

৪২টি একক অ্যালবাম করেছেন। এর বাইরেও আছে আরো অসংখ্য গান। সেসব থেকে নিজের সেরা ৫ গানের গল্প শুনিয়েছেন মনির খান। লিখেছেন আতিফ আতাউর

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




প্রিয় গানের গল্প

মা

আমি আর আমার বন্ধু লিয়াকত গ্রাম থেকে ঢাকায় আসি ১৯৯১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। দুজন একসঙ্গে থাকি। ও চাকরির সন্ধানে ঘোরে, আমি গান করতে ঘুরি। কিছুদিন পর চাকরি পেয়ে লিয়াকত সিলেটে চলে গেল। তখন মোবাইল ফোন ছিল না। যোগাযোগ বন্ধ। কয়েক বছর পর একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। খুব খুশি হলাম ওকে দেখে। দুদিন পর ঈদ। বললাম—বন্ধু, চলো গ্রামে যাই, ঈদ করে আসি। শুনে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল। কারণ ওর মা মারা গেছে। বন্ধু বলল, ‘জীর্ণশীর্ণ বাড়ি, মা চোখে কম দেখত, চশমা কিনে দিয়েছিলাম। মা পান খেত, পানের বাটা কিনে দিয়েছিলাম। এখন মা নেই, শুধু আছে মায়ের চশমা, পানের বাটা, জীর্ণ ঘর। এসব সইতে পারব না বলেই গ্রামে যাব না।’ কথাটা শোনার পর আমারও বুকটা দুমড়েমুচড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মিল্টন খন্দকারের কাছে ছুটে গেলাম। বললাম, ‘এ রকম কথার ওপর একটি গান করা যায় কি না। তিনি চোখ বুজে দম ধরে বললেন, কেন করা যাবে না। তোমার বন্ধুর মা, সে তো তোমারও মা, আমারও মা।’ তিনি এক ঘণ্টার মতো চিন্তা করে গানটি সাজিয়ে দিলেন।

 

বাবা

১৯৮৭ সালে মেট্রিক পরীক্ষার পর বাবা একটি হারমোনিয়াম কিনে দিলেন। বাসায় হারমোনিয়াম বাজাতে শুরু করলাম। যে ঘরে বাজাতাম, তার পাশে ছিল মসজিদ। মসজিদ থেকে হুজুররা এসে খুব ঝামেলা শুরু করল। বাবার ওপর চাপ দিল, এখানে সংগীতচর্চা করা যাবে না। এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া, বাগিবতণ্ডা। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে ঘরটা ভেঙে মাঠের মধ্যে নির্জন একটি জায়গায় তুলে দিলেন বাবা। বললেন, এখানে থেকেই পড়াশোনা করো, গান করো। তবু গান ছাড়া যাবে না। গান শিখতে শিখতে মেট্রিকের রেজাল্ট দিল। কোটচাঁদপুর কলেজে ভর্তি হলাম। কিন্তু হুজুররা থেমে থাকেনি। তারা বিভিন্ন জায়গায় যোগসাজশ করে আমার নামে সাতটি মামলা করল। অভিযোগ, বাস ভেঙেছি, আদম পাচার করেছি ইত্যাদি। এইচএসসি পড়া অবস্থায় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। দুই বছর মামলা চলল। বাবার এক ছাত্র উকিল ছিলেন। তিনি দায়িত্ব নিলেন। আমি কাঠগড়ায় বিচারকের সামনে গান গেয়ে বেকসুর খালাস পেয়েছিলাম। এই ঘটনা নিয়ে মিল্টন খন্দকার গান লিখলেন।

 

আট আনার জীবন

‘আবার কেন পিছু ডাকো’ অ্যালবামের কাজ করার সময় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বললেন, ‘আমাদের চার স্তরের জীবন—মায়ের গর্ভে আসার আগে, মায়ের গর্ভে, পৃথিবীতে এবং পরকালে। এই চার জীবনের একটা জীবনই কি আমরা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারি?’ তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন। বললাম, ‘কী রকম?’ ‘১২-১৩ বছর পর্যন্ত বুদ্ধি হওয়ার আগের এক জীবন। বুদ্ধি হওয়ার পর সক্ষমতার সঙ্গে কর্মতত্পরতার সঙ্গে যুক্ত থাকা ৪৫ থেকে ৬০ বছর। তার পরের জীবনটা বৃদ্ধজীবন। সব কিছু বাদ দিয়ে থাকল আট আনার জীবন। এই আট আনার মধ্যে আবার চার আনা ঘুম, দুই আনা প্রেম করার ফাঁক দিয়ে কেটে যায়, বাকি থাকে জীবনের দুই আনা। এই দুই আনা জীবন নিয়েই জীবনের হিসাব-নিকাশ করতে হবে। সময় কম, অনেক কাজ পড়ে আছে।’ ব্যাখ্যা করলেন তিনি। এই গল্প নিয়েই গানটি।

 

বিধি আমার এ চোখ অন্ধ করে দাও

গানটি সুর করেছেন আজাদ মিন্টু, লিখেছেন লিয়াকত আলী বিশ্বাস। গানটি লেখার পর তিনি বললেন, ‘মনির, সুন্দর একটি গান লিখেছি।’ আমি তখনো গানটির কথা বুঝে উঠতে পারিনি। অনুভূতির হাজার দুয়ার বন্ধ করে দাও, তার চোখে আর আমার এ চোখ পড়ে না যেন—কথাগুলো আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। কিন্তু তিনি বললেন, ‘এর ভেতরে অনেক গভীরতা আছে।’  প্রথম যখন সুর হলো, বললাম, ‘আজাদ ভাই, সুর খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু আমাকে সুযোগ দিলে একটা কথা বলতে চাই। বিধিকে আমরা কখনো দেখি নাই। অদৃশ্য। তাকে ধ্যানের মধ্যে ডাকি। মনে করি, বিধি অনেক দূরে থাকে। তাকে কাছে আনতে গেলে চিত্কার করে ডাকতে হবে। আমি বিধিকে চিত্কার করে ডাকতে চাই। শুনে তিনি রাজি হন।’

 

চিঠি লিখেছে বউ আমার

গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তিনি আমাকে মামা বলে সম্বোধন করতেন। বললেন, ‘মামা, বলো তো আর কী ধরনের গান করা যায়?’ বললাম, গ্রামের একটা গান করা দরকার। গ্রামের বধূদের মনের আকুতি নিয়ে গানটি হলে ভালো হয়। অনেক বধূর স্বামী শহরে চাকরি করে, বিদেশে থাকে। স্বামী কাছে না থাকার যন্ত্রণা, ভালো কিছু রান্না করলে স্বামীকে না খাওয়াতে পারার বেদনা—এসব টানাপড়েন থাকবে। তিনি বললেন, ‘চলো তাহলে, গ্রাম ঘুরে আসি।’ আমরা স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে বেড়াতে গেলাম। সন্ধ্যায় সাভারের একটি মেঠো সরু পথে দেখলাম চেক শাড়ি পরা এক বধূ বঁটি নিয়ে লাউয়ের মাচা থেকে লাউ কাটছে।  বুলবুল গাড়ি থামাতে বললেন। আমাকে বললেন—মনে করো, এই বধূ লাউ দিয়ে শিং মাছ রান্না করেছে। খাওয়ার সময় তার চোখে পানি পড়ছে, স্বামীকে মনে করে বলছে—ওগো, তুমি যদি কাছে থাকতা তাইলে খেতে পারতা। এই আকুতি নিয়ে সে তখন রাতে গোপনে চিঠি লিখছে স্বামীর কাছে। ওদিকে শাশুড়ি ও ননদ বাতি জ্বালিয়ে চিঠি লেখায় কটুকথা বলছে। ফিরে এসে গানটি লিখলেন।

মন্তব্য