kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

ঢাকায় বনি এম

সত্তরের দশকের জনপ্রিয় সংগীত দল বনি এম ঢাকায় আসছে শুনে অনেকেই বলছেন, সত্যি বলছ? দলটি আশির দশকও জমিয়ে রেখেছিল। নব্বইয়ের দশকেও চলেছে বনি এম। লিখেছেন আবু সালেহ শফিক

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকায় বনি এম

বনি এমের অনেক গানের কথাই মানুষ মনে করতে পারবে।  যেমন—‘ড্যাডি কুল’, ‘রাসপুটিন’, ‘মেরিজ বয় চাইল্ড’ ইত্যাদি। তবে ‘রিভারস অব ব্যাবিলন’ দিয়ে বেশিই চেনা যায় দলটিকে। গানটি তারা জনপ্রিয় করে ১৯৭৮ সালে। জ্যামাইকার র্যাগে দল দ্য মেলোডিয়ান দুঃখের এই গানটি গেয়েছিল ১৯৭০ সালে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৮৬ অব্দে ব্যাবিলনীয়রা ইহুদিদের দেশছাড়া করেছিল। তখন তারা ব্যাবিলনের নদী টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের পারে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। জেরুজালেমের কথা তাদের খুব বেশি মনে পড়ছিল। তারা বলছিল, এই অচেনা দেশে আমরা কিভাবে প্রভুর গান গাইব?  এটি একটি রাস্তাফারি গান। ত্রিশের দশকে ক্যারিবিয়ায়, বিশেষ করে জ্যামাইকায় রাস্তাফারিয়ানিজম একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন। জ্যামাইকানরা ব্যাবিলন শব্দটিকে নিপীড়নের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করে। ‘রাসপুটিন’ ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত বনি এমের ‘নাইটফ্লাইট টু ভেনাস’-এর গান। তুরস্কের একটি লোকগানের সুরে গানটি করা। রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাসের বন্ধু ও উপদেষ্টা ছিলেন রাসপুটিন। তাঁর ছেলের ছিল দুরারোগ্য রক্তরোগ! জারের পত্নী ফিয়োদোরভনার মধ্যে তিনি কঠিন রোগ থেকে সেরে ওঠার আশার বীজ বুনেছিলেন। বনি এম গেয়েছে, ‘রা রা রাসপুটিন, লাভার অব দ্য রাশান কুইন’।

বনি এমের চার সদস্যের সবাই ক্যারিবীয় অঞ্চলের। তাঁদের একসঙ্গে করেছিলেন জার্মান প্রযোজক ফ্রাংক ফারিয়ান। সদস্যরা হলেন লিজ মিশেল, মারিয়া ব্যারেট, মেইজি উইলিয়ামস ও ববি ফারেল। ববি ছাড়া অন্য তিনজনই নারী।

ডিসকো ঘরানার দলটির প্রথম অ্যালবাম ‘টেক দ্য হিট অব মি’ প্রকাশ পায় ১৯৭৬ সালে। শুরুতে বেশি টাকা কামাতে পারেনি। তবে নাম কামাতে ক্লাবগুলোতে নিয়মিত গেয়ে চলছিল। একপর্যায়ে মিউজিক্লাডেন নামের একটি টিভি শোতে দাওয়াত পায় তারা। শোতে ‘ড্যাডি কুল’ গেয়ে বেশ সুনাম কুড়ায়। অল্প সময়ের মধ্যেই জার্মানির এক নম্বর গান হয়ে যায় এটি। একসময় সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে ও অস্ট্রিয়ায়ও বাজতে থাকে। ‘সানি’ শিরোনামের আরেকটি গানও খুব জনপ্রিয় হয়। ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘লাভ ফর সেল’ বের করে তারা। তাদের খুব জনপ্রিয় ‘মা বাকের’ গানটি এই অ্যালবামেরই। এর ‘বেলফাস্ট’ও শ্রোতারা গ্রহণ করে। অ্যালবামটি যুক্তরাজ্যে গোল্ড সার্টিফিকেট পায়।

১৯৭৮ তাদের ক্যারিয়ারের সেরা বছর। ‘রিভারস অব ব্যাবিলন’ এ বছরেরই গান। ‘নাইটফ্লাইট টু ভেনাস’ অ্যালবামটিও। ‘মেরিজ বয় চাইল্ড—ওহ মাই লর্ড’ গানটিও এ বছরেরই। যুক্তরাজ্যে ক্রিসমাস নাম্বার ওয়ান হয় এই গান। এ বছর দলটি সোভিয়েত ইউনিয়নে বেড়াতে যায়। অবশ্য ব্ল্যাক বিউটি সার্কাস নামে বড় বড় কনসার্ট করেছে ওই ১৯৭৬-৭৭ সালেই।

তাদের আরেকটি তুমুল জনপ্রিয় গান ‘হুররে হুররে ইটস আ হলি হলি ডে’ বের হয় ১৯৭৯ সালে। ‘পলি উলি ডুডল’ নামের একটি শিশুতোষ ছড়া থেকে গানটি তৈরি। ছড়াটি হার্ভার্ড স্টুডেন্ট সংবুকে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। তবে নিউ ইয়র্কের বাউরি এম্ফিথিয়েটারে ছড়াটি প্রথম গাওয়া হয় ১৮৪৩ সালে। ১৯৭৯ সালের শেষ দিকেই বের হয় বনি এমের চতুর্থ অ্যালবাম ‘ওশানস অব ফ্যান্টাসি’। ‘গটা গো হোম’, ‘বাহামা মামা’র মতো জনপ্রিয় গান ছিল এই অ্যালবামে। এটি যুক্তরাজ্যে এক নম্বর হয়ে যায় এবং প্লাটিনাম সার্টিফায়েড হয়। ১৯৮০ সালে আসে তাদের অন্যতম সেরা অ্যালবাম ‘দ্য ম্যাজিক অব বনি এম—টোয়েন্টি গোল্ডেন হিটস’। ‘মাই ফ্রেন্ড জ্যাক’ ও ‘আই সি আ বোট অন দ্য রিভার’ গান দুটি ছিল এতে।

‘বুনুনুজ’ শিরোনামের পঞ্চম অ্যালবামটি আসে ১৯৮১ সালে। ‘বুনুনুজ’ ক্যারিবীয় শব্দ। অর্থ সুখ। রিদম অ্যান্ড ব্লুজ, র্যাগে ও ইউরো ডিসকো ঘরানার গান ছিল এতে। ফ্রাংক ফারিয়ানই ছিলেন প্রযোজক। তারপর ১৯৮২, ’৮৫, ’৮৮-তেও অ্যালবাম এনেছে বনি এম। ১৯৮৬ সালে ছিল দলটির দশম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। তবে প্রযোজক ফারিয়ান এর মধ্যে দলটির প্রতি আগ্রহ হারান। একরকম এলোমেলো হয়ে যায় তারা। পরে ফারিয়ানকে ছাড়াই ১৯৮৮ সালে সদস্যরা একসঙ্গে হন এবং প্রকাশ করেন ‘গ্রেটেস্ট হিটস অব অল টাইম—রিমিক্স’। কিন্তু সদস্যদের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। লিজ মিশেল পরের বছর দল ছাড়েন। ১৯৯২ সালে আবারও বনি এমের গানে আগ্রহী হয় মানুষ। ‘বনি এম মেগা রিমিক্স’ যুক্তরাজ্যে সেরা দশের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ওয়ার্ল্ড ট্যুরেও বের হয় এ সময়। ‘পাপা চিকো’ নামের একটি গান প্রকাশ করে। তবে বেশি বাজার গরম করতে পারেনি। এরপর দলটি আর সেভাবে জুড়ে থাকেনি। লিজ মিশেল নিজের মতো করে একটি বনি এম তৈরি করেন। ববি ফারেলও একটি বনি এম গড়ে তোলেন। তাই বলে মূল বনি এম হারিয়ে যায়নি। ২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রোহ মু ইউন বনি এমের ‘বাহামা মামা’ গানটিকে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করেছিলেন। তিনি জয়লাভও করেন।

২০০৬ সালের আগস্টে বনি এমের ‘ড্যাডি কুল’ গানটিকে কেন্দ্র করে লন্ডনে একটি নাটক মঞ্চস্থ হতে থাকে। ২০০৭ সালে বার্লিনেও নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ২০০৭ সালে ‘বুনুনুজ’, ‘টেন থাউজেন্ড লাইটইয়ার্স’সহ তাদের চারটি অ্যালবাম সিডিতে প্রকাশিত হয়। অনেকে বলে, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সঙ্গে নামের ব্যাপারে যোগ আছে বনি এমের। ব্রিটিশরা নেপোলিয়নকে বনি নামে ডাকত। আর এম দিয়ে মিউজিক বোঝানো হচ্ছে।

১৩ জুলাই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে ‘বনি এম লাইভ ইন ঢাকা’ অনুষ্ঠানে গান করবে দলটি। এদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা চলবে তাদের পরিবেশনা। আয়োজনে ক্রেইন্স।

মন্তব্য