kalerkantho

সম্প্রচার নীতিমালা কি বাকস্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার?

আরিফুজ্জামান তুহিন   

১২ আগস্ট, ২০১৪ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



সম্প্রচার নীতিমালা কি বাকস্বাধীনতা হরণের হাতিয়ার?

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের কার্যত বিরোধিতা করার মতো দেশে কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই। পার্শ্ববর্তী একটি শক্তিশালী দেশের বেপরোয়া সমর্থন, দুর্বল রাজনৈতিকবিরোধী শক্তি, আমলারা পক্ষে থাকায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে প্রশ্ন করার মতো বাস্তবতাও কারো নেই। দেশের গণমাধ্যম নানা ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেসব তথ্য জনগণের সামনে আনছে, তার ভেতরেও নেই সরকারবিরোধিতার আলামত। ফলে একটি সরকারের নিয়মতান্ত্রিক কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধাও থাকার কথা নয়। কিন্তু এত কিছুর পরও সরকার 'জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা' করে টিভি ও রেডিওগুলোর টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করছে। এটা করার পেছনে সরকারের যে মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে তা হলো, আপাত চুপচাপ শান্ত টিভিগুলোই যদি সরকারবিরোধী অবস্থান নেয় তাহলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ জন্যই জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা এমনভাবে করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী অবশিষ্ট মনোভাবেও সেলফ সেন্সরশিপ (স্বপ্রণোদিত নিষেধাজ্ঞা) জারি হবে। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার বিভিন্ন দিক নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লিখেছেন আরিফুজ্জামান তুহিন

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে দৃশ্যত কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। গত ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রশক্তি একটি সামগ্রিক দমননীতির সরকার দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। বড় দল হিসেবে বিএনপির সরকারবিরোধী মাঠ জমানো আন্দোলনের সম্ভাবনা প্রায় শেষ। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামী সরকারের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও জামায়াত নিষিদ্ধের চাপে পড়ে সাময়িক আন্দোলন না করার কৌশলি অবস্থান নিয়েছে। শাহবাগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে হেফাজতে ইসলামের যে উত্থান হয়েছিল, তার পলিটিক্যাল ডিসকোর্স রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নয়; ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে অরাজনৈতিক কর্মসূচির আদলে যে রাজনীতি হেফাজত ইসলাম শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ গণজাগরণ মঞ্চটিকে প্রথমে দখল ও পরে ধ্বংস করে তারও লেজিমিটিসি শেষ করে দিয়েছে। একমাত্র গণমাধ্যম রয়েছে, যা কোনো মুহূর্তে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে পারে। গণমাধ্যম যাতে সেই সুযোগ না পায়, সে কারণে বিকশিত টিভি মিডিয়ার মুখ সেলাইয়ের দাওয়া হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা।

নীতিমালার অর্ন্তগত সত্য

সরকার বলছে, এ নীতিমালাটি ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি অনুযায়ী হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন হলো, বিবিসি অনুযায়ী কেন হবে? বিবিসিতে ব্রিটিশ সরকারের একটি পাবলিক মিডিয়া, যা ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির আলোকে চলে। কিন্তু বাংলাদেশে ২৩টি বেসরকারি টিভি, আরো ১৮টি সম্প্রচারের অপেক্ষায়। একমাত্র সরকারি টিভি বিটিভি ছাড়া বাকিগুলো বেসরকারি টিভি। তাহলে তাদের মুখ সেলাই করার জন্য একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের নীতির আলোকে হতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের তথ্য মন্ত্রণালয় বা সরকারের কোনো নীতিনির্ধারক ফোরাম থেকে দেওয়া হয়নি। পুরো নীতিমালাটি যদি খুব মনোযোগ দিয়ে কোনো পাঠক পড়েন, তাহলেই এই নীতিমালা প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু পাঠক ধরে ফেলতে পারবেন। নীতিমালার প্রতি পদে পদে সরকারের দুর্নীতি, অপশাসন যাতে প্রকাশ না হয় তাকে সুন্দরভাবে রক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই নীতিমালা অনুযায়ী বাস্তবে সব টিভির বিটিভির ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর থাকবে না। এই নীতিমালা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে টিভি থেকে কোনো ধরনের বিরোধিতা, সরকারের নেতিবাচক কোনো প্রতিবেদন ও অনুষ্ঠান প্রচারিত না হয়।

সেলফ সেন্সরশিপ বাড়বে

দৈনিক পত্রিকার একজন কর্মী হিসেবে যে অভিজ্ঞতা, তা হলো, সরকার ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অনেক দুর্নীতির তথ্য আমরা নিজেরাই চেপে চাই। এই যে স্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বা সেলফ সেন্সরশিপের ব্যাপারটি কিন্তু সরকার কোনো নীতিমালা দিয়ে আমাকে বাধ্য করেনি। বাংলাদেশে যে দলই ক্ষমতায় আসে, তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে তাতে সংবাদকর্মী আগেভাগেই জেনে যান, কোন রিপোর্ট করা যাবে, আর কোনটি করা যাবে না। অর্থাৎ সরকারের পরোক্ষ চাপের কারণেই সংবাদকর্মী নিজেই অনেক রিপোর্টের মৃত্যু ঘটিয়ে দেন। নীতিমালার কারণে এই সেলফ সেন্সরশিপ আরো বাড়বে। একজন প্রতিবেদকের কোনো প্রতিবেদন করার আগে মাথায় রাখতে হবে যার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তিনি করছেন তিনি কোনো বাহিনীর কি না, তিনি কোনো সরকারি কর্মকর্তা কি না, বন্ধু রাষ্ট্র কি না ইত্যাদি। ফলে প্রতিবেদন তৈরি হওয়ার আগেই এভাব বহু সম্ভাবনায় দুর্নীতি বা অসঙ্গতির প্রতিবেদন নিহত হবে।

সংবিধানবিরোধী নীতিমালা

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানকে মান্যগণ্য করে বলেই বিভিন্ন সময় দলটির নীতিনির্ধারকরা বলেছেন। এই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অজুহাতে ৫ জানুয়ারি একতরফা ভোটারশূন্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। অথচ দলননীতি নেওয়ার সময় সাংবিধানিক অধিকারের ব্যাপারটি তারা বেমালুম ভুলে যায়। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, সকল নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এমন একটি নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যাতে শুধু মত প্রকাশ বন্ধই নয়, মত প্রকাশের চিন্তাও একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অতীত ইতিহাস ভালো নয়

এই আওয়ামী লীগের আমলে ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সমমনা চারটি পত্রিকা রেখে বাকি সংবাদ মাধ্যমের গলাটিপে তৈরি করা হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ বা বাকশাল। তখন বিরুদ্ধ মত উচ্চারণ করার আর কোনো সুযোগ তৎকালীন সরকার রাখেনি। জিয়াউর রহমানের আমলেও গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার জন্য একটি নীতিমালা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তা হয়নি। স্বৈরাচার এরশাদের আমলেও এ চেষ্টা অব্যাহত ছিল। এরপর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বেসরকারি খাতে একুশে টিভিতে সংবাদ দিয়ে যাত্রা শুরু করলে হৈচৈই পড়ে যায়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকার এসে টিভিটি বন্ধ করে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর এ পর্যন্ত ভিন্নমতের একটি পত্রিকা ও দুটি টিভি বন্ধ করে দিয়েছে। এ কথা সহজেই অনুমান করা যায় যে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে এ সরকারের সময় দেওয়া টিভিগুলোর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নয়। সেগুলো আদৌ সম্প্রচার করতে পারবে কি না তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের হাতে

৫ আগস্ট যে সম্প্রচার নীতিমালা মন্ত্রিসভা পাস করেছে তার একদিন পর গেজেট আকারে প্রকাশ দেখানো হয়েছে। এ নীতিমালার আলোকে তৈরি হবে আইন ও বিধিমালা। এরপর তৈরি হবে কমিশন। এই কমিশন স্বাধীন থাকবে বলে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু কবে নাগাদ কমিশন গঠন করা হবে তার কোনো টাইমলাইন বেঁধে দেয়নি সরকার। আর যতক্ষণ না কমিশন গঠন হচ্ছে, ততক্ষণ এই নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। অর্থাৎ সরকার নিজেই দেখভাল করবে কোথায় নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটছে। স্বাধীন কমিশন বাংলাদেশে সোনারপাথর বাটি। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), মানবাধিকার কমিশন, ল কমিশনসহ দেশের সব কমিশনই সরকারের ইচ্ছের বাইরে এক ইঞ্চি গেছে- এমন নজির নেই। সেখানে বেসরকারি টিভিগুলোর নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করবে- এটা দিবাস্বপ্ন ছাড়া কিছুই না।

টক শো সরকারের জন্য বেদনার

দেশের টিভিগুলোতে দুর্নীতি বা সরকারের অনিয়মের ওপর রিপোর্ট কম পত্রিকার তুলনায়। এর অন্যতম কারণ হতে পারে যে সরকারের দমননীতির আশঙ্কা। কিন্তু সরকারের গুণগান বারবার প্রচার করলে সেই টিভি থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেবে- এটা সাধারণ সত্য। টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট (টিআরপি) গণনা করে একটি ভারতীয় ফার্ম। ওই ফার্মের করা টিরআরপি সূত্রে জানা যায়, যেসব টিভি সরকারের গুণগান করে বেশি মাত্রায় খবর, টিভি টক শো প্রচার করে তাদের দর্শক খুবই কম। অর্থাৎ মানুষ সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা শুনতে চায়। সরকারের একতরফা গুণগান নয়। টিভিগুলোতে যেহেতু বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কম সে কারণেই তাদের টিরআরপি ধরে রাখতে টিভি টক শো'কে বেছে নিয়েছে তারা। এই টিভি টক শো এখন খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু যেসব টক শোতে আবার সরকারি দলের আলোচক বেশি সেখানে দর্শক কম। অর্থাৎ মানুষ গঠনমূলক বিরোধিতা শোনার জন্য টিভির রিমোট ক্রমাগত পাল্টাতে থাকে। এসব তথ্য মূলত টিআরপি থেকেই নেওয়া। টিভি টক শোতে সমস্যাও কম। দুই বা তারও অধিক আলোচক এনে বসিয়ে দিলেই জমে যায়। এই ব্যাপক জনপ্রিয় টক শো সরকার কোনোভাবেই পছন্দ করেনি। এমনকি নির্বাহী বিভাগ ও রাষ্ট্রের প্রধান নিয়ন্ত্রক প্রধানমন্ত্রী টিভি টক শোকে 'মধ্যরাতের সিঁদ কাটা চোরের' সঙ্গে তুলনা করে সমালোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ইচ্ছেটাকে সামনে রেখে সম্প্রচার নীতিমালা করা হয়েছে, এমন করে যদি কেউ ভাবেন তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ টক শোসম্পর্কিত নীতিমালায় বলা হচ্ছে, 'আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে কোনো প্রকার বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য বা উপাত্ত দেওয়া পরিহার করতে হবে। এ ধরনের অনুষ্ঠান সবপক্ষের যুক্তিসমূহ যথাযথভাবে উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে।' টক শোগুলোতে রাজনৈতিক নেতারা ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আসেন। সরকার ও বিরোধীদলীয় রাজনীতিকের ভাষা ও আক্রমণের পদ্ধতি থাকে ভিন্ন। তাতে যুক্তি ব্যবহারের চেয়ে গলার জোর ও ক্ষমতার দাপট থাকে বেশি। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা যুক্তি ও তথ্য দিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আপাত নিরীহ এই শর্তগুলো টক শো'য়ে উপস্থিতি সরকারপন্থীকে সুরক্ষা দেবে আর বিরুদ্ধ মতকে গলা টিপে ধরবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তা বুঝতে পারা কঠিন নয়।

এ আমলে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত নয়

যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত। ইতিহাস অন্তত আমাদের এই সাক্ষ্যই দেয়। কিন্তু সম্প্রচার নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ের ৫.১.৯-এ বলা হচ্ছে, 'জনস্বার্থ বিঘি্নত হতে পারে এমন কোনো বিদ্রোহ, নৈরাজ্য ও হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন পরিহার করতে হবে।' প্রথমত বলে রাখা ভালো, শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে যা কিছুই যায়, তাকে তারা নৈরাজ্য, যড়যন্ত্র, হিংসাত্মক হিসেবে প্রচার করে। কারণ এতে বিদ্রোহকারীদের ন্যায্যতা ছুড়ে ফেলা সম্ভব হয়, আর বিদ্রোহীদের ওপর দমননীতিও পরিচালনা করা সম্ভব হয়। যদি এসব আমলেও নিই তারপরও বিদ্রোহ কেন ন্যায়সংগত হবে না? কেন বিদ্রোহের খবর প্রচার করা যাবে না? নিশ্চয় একটি ভূখণ্ডের অখণ্ডতা নিয়ে যারা প্রশ্ন করবে বা বিদ্রোহ করবে গণমাধ্যম সেসব খবরকে ইতিবাচক হিসেবে প্রচার করবে না। কিন্তু সাধারণভাবে 'বিদ্রোহ' করার ওপর সরকার বিধিনিষেধ জারি করল!

শ্রেণি সংগ্রাম প্রচার করা যাবে না

আমরা একটি শ্রেণি বিভক্ত সমাজে বাস করি। এই সমাজের প্রধান নিয়ম হলো, পরস্পরবিরোধী শ্রেণিগুলোর দ্বন্দ্ব ও সমাজের বিকাশ। যতদিন শ্রেণি থাকবে ততদিন শ্রেণি সংগ্রাম থাকবে। কিন্তু সম্প্রচার নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ের ৫.১.২ বলা হচ্ছে, 'শ্রেণী বিদ্বেষ প্রচার পরিহার করতে হবে।' কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের অকমিউনিস্ট পুঁজিবাদী টিভিগুলো যদি সমাজের ভেতরকার মানুষের কষ্ট-দুঃখের প্রতিবেদন না করে তাহলে ওই টিভি মানুষ কেন দেখবে? সাম্প্রতিক সময় নাটক ও অনুষ্ঠানের নামে যে মধ্যবিত্তের 'কেলাসনে' দেখার জন্য টিভি খুলবে? এর চেয়ে স্টার জলসা খারাপ কি? ফলে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে শ্রেণি সংগ্রাম শুধু কমিউনিস্টদের আন্দোলন-সংগ্রামেরই বিষয় নয়, একই সঙ্গে এটা একটি বিক্রিযোগ্য পণ্যও বটে। সমাজের অভ্যন্তরে ধনী-গরিবের বৈষম্য নিয়ে যদি টিভিগুলো প্রতিবেদন ও অনুষ্ঠান না করে তাহলে সেই টিভি থেকে সহজেই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। সব থেকে বড় কথা, সমাজের প্রান্তিক এসব মানুষের কথা কারা বলবে মিডিয়া ছাড়া। আর এতে শ্রেণিবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়তেই পারে। সরকারের উচিত, ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানো। শ্রেণি সংগ্রাম যা হচ্ছে, তা প্রচার বন্ধ করা নয়।

সরকারবিরোধিতা মানে রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়

সম্প্রচার নীতিমালায় রাষ্ট্র বিপদে পড়ে মানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘি্নত হতে পারে, এমন কোনো সামরিক বা সরকারি গোপন তথ্য ফাঁস করা যাবে না। বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ দুর্নীতি করে সরকারি দপ্তরগুলো। এখন কোনো একজন ক্ষমতাবান মন্ত্রী ও সচিবের বিরুদ্ধে একটি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন হলো, প্রতিবেদকের কাছে প্রয়োজনীয় সরকারি ডকুমেন্টও থাকল, কিন্তু সরকার মনে করল যে এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে। ভাবতেই পারে। কারণ সরকারের মন্ত্রীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট যাওয়া মানে সরকারের ইমেজ শেষ। এবার কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে আপনার ওপর খৰ নেমে আসবে। সরকার আর রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। সরকার পাঁচ বছরের জন্য তৈরি হয়, আবার পাঁচ বছর পর তাকে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসতে (হোক সেটা একতরফা নির্বাচন) হবে বা বিদায় নিতে হবে (বাংলাদেশ অবশ্য এর ব্যতিক্রম)। আর রাষ্ট্র হলো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার জন্য; ওই শ্রেণি যতদিন থাকবে ততদিন রাষ্ট্র টিকে থাকবে। এখন আওয়ামী লীগ যাঁরা করেন এর বাইরেও রাষ্ট্রের স্টেকহোল্ডার আছেন। তাই আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জেহাদ নয়।

এসব ভিডিও প্রচার করা কি যাবে?

দৈনিক কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছবিটি ছাপা হয়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিজিএমইএ ঘেরাওকালে পুলিশ একজন প্রতিবাদকারীর গলা চেপে ধরেছে। যেকোনোভাবে হোক ওখানে আলোকচিত্রী সাংবাদিকরা থাকায় ছবিটি তোলা গেছে। কিন্তু প্রতিনিয়তই পুলিশ ও সরকারি দলের লোকজন এভাবেই মানুষের গলা টিপে ধরে। এখন এই ছবিটি কিন্তু টিভিতে প্রচার করা যাবে না। কারণ যিনি গলা টিপে ধরেছেন তিনি একজন সরকারি লোক। নীতিমালার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিজিএমইএ ঘেরাওকালে ওই গলা টিপে ধরা পুলিশটি তার দায়িত্ব পালন করছিল। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে (বিজিএমইএকে রক্ষা করা এই শ্রেণি বৈষম্যের সমাজে শাসক শ্রেণির রাষ্ট্রের প্রধান কাজ। আর শ্রমিককে পেটানো তাদের জন্য ফরজ) কোনো কাজকে প্রচার করা যাবে না যাতে তিনি হেয় প্রতিপন্ন হন। এখন পাঠক আপনি বলুন, এই ছবি সম্প্রচারের পর পুলিশ সদস্যের পরিচিতদের মধ্যে কি তাঁর শয়তানি চরিত্র বা খাসলত ফাঁস হয়ে যায়নি? তাতে তিনি অবশ্যই যথেষ্ট হেয় প্রতিপন্ন হয়েছেন। এবার বোঝ ঠ্যালা! সম্প্রচার নীতিমালায় আটকে যাবে এই গলা টিপে ধরার দৃশ্য। পাঠক, এই সম্প্রচার নীতিমালা দিয়ে আপনার গলা টিপে ধরবে, আপনি কিছু বলতে পারবেন না, এমনকি দম বন্ধ হয়ে গেলেও না।

সভ্য দেশে কী হয়

বাংলাদেশ কাগজ-কলমে একটি 'বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক' দেশ। এ রকম বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশের সরকারি তথ্য ফাঁস করতে কোথাও মানা নেই। স্নোডেনের কথা, উইকিলিকসের কথা নিশ্চয় ভুলে যায়নি বিশ্ববাসী। এই দুই বীর যুক্তরাষ্ট্রের এন্তার সব জারিজুরি এমনকি জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন। এ জন্য ওই দুই ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার খুঁজছে। কিন্তু যেসব গণমাধ্যম এই জাতীয় নিরাপত্তা বিঘি্নত হয় এমন সব তথ্য প্রকাশ করেছে, তাদের গণমাধ্যমগুলো আমেরিকা কিন্তু বন্ধ করেনি। আর এটা আজকের যুগে সম্ভবও নয়। এ রকম বহু উদাহরণ দেওয়া যেত। এটা কেবল পাকিস্তানে সম্ভব। পাকিস্তানের জিওটিভি দেশটির সেনাগোয়েন্দা আইএসআইয়ের ওপর একটা প্রতিবেদন করেছিল, জিওটিভির প্রধান হামিদ মীরকে প্রথমে গুলি করা হয়। তারপর টিভিটাই বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একমাত্র সোল এজেন্ট আওয়ামী লীগের উৎসাহদানকারী দেশ কি পাকিস্তান?

মিডিয়া জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়

একটি দেশ বা প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে কোনো কিছুকেই জবাবদিহিতার ঊধর্ে্ব রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মিডিয়ার ক্ষেত্রেও তা সমান সত্য। দেশের বেসরকারি টিভিগুলোর অবশ্যই সম্প্রচার নীতিমালা দরকার। কিন্তু তার লক্ষ্য যদি হয়, তার গলা টিপে ধরা, তাহলে তা কাম্য নয়। সম্প্রচার নীতিমালা হতে হবে একটি সুষ্ঠু, সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য। আর সেই সম্প্রচার নীতিমালার দায়িত্ব দিতে হবে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত মানুষদেরই। সরকার থেকে কোনো সম্প্রচার নীতিমালা চাপিয়ে দেওয়া একটি বিকশিত গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যাঁরা রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন যে বাংলাদেশে তথ্য পাওয়া সব থেকে কষ্টের ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সরকারি তথ্য ভাণ্ডারে বেআইনি পথেই ঢুঁ মারতে হয়। সরকারি তথ্যভাণ্ডারে বেআইনিভাবে ঢুঁ মেরে আমরা জাতীয় নিরাপত্তা ভাঙি না। গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভেঙেছে- এ রকম কয়টা রিপোর্ট দেখানো যাবে? সাংবাদিকরা যা করেন, তা হলো, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে দুর্নীতি, দুর্বলতা খুঁজে বের করা ও সেটা প্রকাশ করা। সরকারের ভয় কি এখানে যে গণহারে লুটপাট হচ্ছে, তার খবর কোনোভাবেই যেন মানুষের কাছে না যায়?

লেখক : সাংবাদিক

 

 

মন্তব্য