kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও জোর দিতে হবে অবকাঠামো উন্নয়নে

সংকটেও হাল ধরেছে গ্রামীণ অর্থনীতি

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সংকটেও হাল ধরেছে গ্রামীণ অর্থনীতি

করোনা মহামারির আঘাতে গত বছর দেশের অর্থনীতিতে যে বিপর্যয় নেমে আসে তাতে বড় নির্ভরতা হয়ে ওঠে কৃষি খাত। বিশেষ করে শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাওয়া লাখ লাখ শ্রমিকের সাময়িক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পের সাফল্যেই দেশে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে বলা হয়, করোনায় সেবা খাতের কর্মসংস্থান যেখানে নেতিবাচক এবং শিল্পে মাত্র ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেখানে কৃষি খাতে কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ, যদিও কর্মঘণ্টা ও আয় কমেছে। বেকারত্বের বড় চাপ সামাল দিয়েছে দেশের এই খাতটি। তাই এবারের বাজেটে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিতে আরো নজর দেওয়া উচিত বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।

করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল কৃষি খাতে। তৃতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এর পাশাপাশি গ্রামীণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মহীনতা এবং কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের জন্য ব্যাপক কর্মসৃজন ও পল্লী উন্নয়নকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিকে আবার অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। শিল্পে অচলাবস্থা এবং লাখ লাখ মানুষের বেকারত্বের চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আসছে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দ বাড়ালে তা দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজে লাগাবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘শহরে চলাচলের বিধি-নিষেধের কারণে শ্রমজীবূদের একটি বড় অংশ গ্রামে চলে গেছেন। তারা এখন গ্রামের জন্য বিশাল বোঝা হয়ে গেছে। তাই বোঝা কমিয়ে তাদের যদি শক্তিতে রূপান্তর করতে হয় তবে তাদের আয় বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে এবারের বাজেটে আলাদাভাবে কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং পোল্ট্রি, মৎস্যসহ গ্রামে যেসব কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ হচ্ছে সেগুলোতে সহায়তা আরো বেশি দিতে হবে।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ও আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে কৃষিতে ভর্তুকি বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষিঋণে সুদের হার কমাতে হবে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলোকে সুসংহত করতে হবে। বীজ, সার, কৃষি যন্ত্রপাতির দাম কমানোসহ কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামে হাসপাতালগুলোয় বেডসংখ্যা, আইসিইউ বাড়ানো, সরঞ্জামাদির দাম ও ভ্যাট কমানো এবং ডাক্তার ও নার্সদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও বাজেটে থাকা উচিত।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘বাজেটে সরকার কৃষিতে যে বরাদ্দ দিয়ে আসছে তা পর্যাপ্ত বলা যায় না। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাও সহজ হবে। তাই সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রাংশসহ সার্বিক কৃষি খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি অকৃষি খাতেও যাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয় সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামে যেসব কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠছে যেমন, পোল্ট্রি, দুধ, মাংস, ফল ইত্যাদি প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সরকার খুব বেশি সহায়তা দিচ্ছে এমনটি চোখে পড়ে না। অথচ এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো গেলে খাদ্য নিরাপত্তা যেমন বাড়বে তেমনি কর্মসংস্থানের একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে।’

কভিডের আঘাতে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। এর মধ্যে শহরে নতুন দরিদ্রের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ৪৪ শতাংশ। করোনা যদি চলমান থাকে, তাহলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা তপন চৌধুরী বলেন, ‘সিপিডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কভিডে নিম্নবিত্ত শ্রমিকের ওপর বেশি প্রভাব পড়েছে। কৃষিক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বাড়লেও এতে শ্রমঘণ্টা এবং আয় কমেছে। এটি উদ্বেগজনক— এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।’ অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ভ্যাট ও কর ছাড় দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের মতামত নিয়ে সরকার এরই মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশের প্রস্তুতি শুরু করেছে। করোনা মহামারিকে সামনে রেখে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে ছয় লাখ এক হাজার ৫১১ কোটি টাকার বাজেট প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী বাজেট হবে গরিববান্ধব বাজেট। এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩.১ শতাংশ। আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে। ফলে এর আওতা আরো বাড়বে। এ ছাড়া বাজেটে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, দেশি শিল্প, গ্রামীণ অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানে বিশেষ নজর থাকবে বলে জানা যায়। সেই সঙ্গে অব্যাহত থাকবে প্রণোদনা প্যাকেজও।