kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বারবার ব্যর্থ ঝং যেভাবে এশিয়ার শীর্ষ ধনী

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বারবার ব্যর্থ ঝং যেভাবে এশিয়ার শীর্ষ ধনী

খুব কম মানুষই চীনা এই ধনকুবের সম্পর্কে জানেন, গণমাধ্যমকে যিনি এড়িয়ে চলেন। অথচ চীনজুড়ে তিনিই গড়ে তুলেছেন বোতলজাত পানির এক বিশাল সাম্রাজ্য, যা চীনের বিশুদ্ধ পানির বাজার এখন শাসন করছে। জনসাধারণের অগোচরে থাকা সেই ঝং শানশানই এ বছর ভারতের মুকেশ আম্বানিকে সরিয়ে এশিয়ার শীর্ষ ধনী হয়েছেন। একই সঙ্গে গড়েছেন নতুন রেকর্ডও। 

গত বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় ঝংয়ের বোতলজাত পানির কম্পানি নংফু স্প্রিং মিনারেল ওয়াটার। ওই সময় কম্পানি মূলধন উত্তোলন করে ১০০ কোটি ডলার। একই সঙ্গে বাজারে ভালো ব্যবসা করছে তাঁর ওষুধ কম্পানি ওয়ানতাই বায়োলজিক্যাল ফার্মেসি এন্টারপ্রাইজ। করোনা মহামারিতে এই প্রতিষ্ঠানের তৈরি পরীক্ষা কিটের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়।

এই দুইয়ের কল্যাণেই সম্প্রতি চীনভিত্তিক হুরুন রিপোর্টের ধনীর তালিকায় ঝং শানশান বিশ্বের সপ্তম ও এশিয়ার শীর্ষ ধনীর খেতাব অর্জন করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর সম্পদ বেড়ে হয়েছে আট হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে আট হাজার ৩০০ কোটি ডলার সম্পদ নিয়ে বিশ্বের অষ্টম ধনী ভারতের মুকেশ আম্বানি। তিনিই এত দিন এশিয়ার শীর্ষ ধনী ছিলেন।

জনসমক্ষে খুব কম আসা এবং মিডিয়া এড়িয়ে চলার প্রবণতার কারণে চীনা গণমাধ্যমের কাছে তিনি ‘নিঃসঙ্গ নেকড়ে’ বা একাকী মানুষ হিসেবে পরিচিত। ব্লুমবার্গের মতে, খুব দ্রুত সম্পদের মালিক হওয়ার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ঝং। তিনিই প্রথম চীনা উদ্যোক্তা, যিনি প্রথম বছরই হুরুনের বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর তালিকায় প্রবেশ করেছেন। ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ ও আমেরিকান বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের কাছাকাছি এখন তাঁর অবস্থান।

ঝং শানশানের আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে লড়াই আর ব্যর্থতার এক অনবদ্য গল্প। মাত্র ১২ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দিতে হয় ১৯৬৬-৭৬ সময়ে চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘিরে রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের কারণে। তখন পরিবারের খরচ চালাতে রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন দীর্ঘ ১০ বছর। ১৯৭৭ সালে কলেজে ভর্তি হতে দুইবার পরীক্ষা দিয়ে ব্যর্থ হন। এরপর মা-বাবার উপেদেশে ঝেংজিয়াং রেডিও ও টিভি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে সক্ষম হন ১৯৭৭ সালে। স্নাতক সম্পন্ন করে ঝেংজিয়াং ডেইলিতে রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে প্যাসিফিক পোস্ট নামে নিজেই একটি পত্রিকা গড়ে তোলেন। কিন্তু লোকসানে ছেড়ে দিতে হয়। এরপর শুরু করেন মাশরুমের ব্যবসা। ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হলেন। বড় অঙ্কের অর্থ লোকসান দিয়ে এবার ধরলেন চিংড়ি চাষের ব্যবসা। সেখানেও মার খেলেন। এরপর এক বন্ধুর পরামর্শে নামলেন পানির ব্যবসায়।

১৯৯৬ সালে বোতলজাত পানির কম্পানি নংফুু প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ধরা দেয় সাফল্য। এখনো পর্যন্ত কম্পানির ৮৪ শতাংশ শেয়ার ঝংয়ের মালিকানায় রয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিনটেল জানায়, চীনের বোতলজাত পানির বাজারের এক-তৃতীয়াংশ তাঁর কম্পানির দখলে। দেশের ছোট-বড় সব ধরনের স্টোরেই মেলে নংফু স্প্রিংয়ের পানি। কম্পানিটি চা, স্বাদযুক্ত ভিটামিন পানীয় ও জুসও বিক্রি করে।

বিশ্বজুড়ে পরিচিত আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মাকে সরিয়ে এর আগে চীনের শীর্ষ ধনী হয়েছিলেন ঝং। বিরল এক সাক্ষাৎকারে একবার তিনি চীনা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তোষামোদ করার স্বভাব আমার ব্যক্তিত্বের মধ্যে নেই। এগুলো আমি মানুষকে বলতেও চাই না, শুনতেও চাই না।’

চীনের প্রযুক্তিকেন্দ্র পূর্বাঞ্চলীয় শহর হংঝুভিত্তিক কম্পানি নংফু গত বছর হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর পাশাপাশি ওয়ানতাইয়ের বড় শেয়ারধারী জং। এটিও সাংহাই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ওয়ানতাই হচ্ছে ইয়াংশেংতাংগ গ্রুপের বায়োফার্ম শাখা। মেডিক্যাল কম্পানিটি নংফু প্রতিষ্ঠার তিন বছর আগে গড়ে তুলেছিলেন ঝং। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি কভিড-১৯ পরীক্ষা কিটে ফলাফল পাওয়া যায় মাত্র ৭৫ মিনিটে। কম্পানিটি এক কোটিরও বেশি কিট চীনের বাজারে সরবরাহ করে। ওয়ানতাই কভিড-১৯ টিকার ন্যাজাল স্প্রে তৈরিতেও কাজ করছে।

হুরুন জানায়, কম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় ঝং বিশ্বের গুটিকয় উদ্যোক্তার মধ্যে অন্যতম হলেন, যিনি ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া চীনের ব্যাবসায়িক তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক কম্পানিতে অংশীদার, বিনিয়োগ বা বোর্ড সদস্য হিসেবে আছেন ঝং। সূত্র : এএফপি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।