kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

স্মার্ট পোশাক রপ্তানি বাড়াবে এসকোয়্যার

মাসুদ রুমী   

৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



স্মার্ট পোশাক রপ্তানি বাড়াবে এসকোয়্যার

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

বিশ্ববাজারে বাড়তি চাহিদা মেটাতে ৫৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানা সম্প্রসারণ করছে এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট লিমিটেড। বিদেশি উৎস থেকে ঋণের পাশাপাশি আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ১৫০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করেছে বস্ত্র খাতের কম্পানিটি। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আরো ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানিয়েছেন এসকোয়্যার নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহসান উল হাবিব। তিনি বলেছেন, উন্নত দেশগুলোর উচ্চমানের পোশাকের চাহিদা পূরণে উদ্ভাবন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করছে এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট। ক্রেতা চাহিদা পূরণে স্মার্ট পোশাকসহ উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করে ২০২৫ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে আশা করছেন এই সাহসী উদ্যোক্তা। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কর্মীবান্ধব নানা উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান।

দেশের শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসকোয়্যার নিট কম্পোজিট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০১৫ সালে যখন কম্পানিটি পাবলিক লিমিটেডে রূপান্তরিত হয় তখন সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার মতো পণ্য রপ্তানি হতো। কিন্তু ক্রেতাদের কাছ থেকে বড় বড় চাহিদা আসতে থাকে। তা পূরণে ভালুকায় কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হয় বলে জানান এহসান উল হাবিব। তিনি বলেন, ‘আইএফসি আমাদের ২২ মিলিয়ন ডলার (১৮৫ কোটি টাকা) অর্থায়ন করেছে। দেশের কোনো তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারীর জন্য এটাই সর্বোচ্চ অর্থায়ন। সব ধরনের কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করায় ২০০৮ সাল থেকে আমরা বিদেশি অর্থায়ন ব্যবহার করছি। এ ছাড়া আইপিওর মাধ্যমে আমরা পুঁজিবাজার থেকে দেড় শ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাঁচপুরে একটি কারখানা আছে। বছরের শেষ নাগাদ ভালুকা প্রকল্পে উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এরই মধ্যে আমাদের পাঁচতলা ভবনের কাজ শেষ হয়ে গেছে। শিগগিরই মেশিনারির জন্য এলসি খোলা হবে। মার্চে আমরা পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর জুন থেকে পূর্ণদ্যোমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাব।’

তিনি বলেন, ‘নতুন প্রকল্প চালু হওয়ার তিন বছর পর এসকোয়্যার নিট কম্পোজিটের টার্নওভার ৮০০ থেকে প্রায় দেড় হাজার টাকায় উন্নীত হবে। আরো ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিন বছর পর মোট ২৫ হাজারের মতো কর্মসংস্থান হবে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমরা ৩৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছি। করোনা মহামারি সময়ে উৎপাদন বিঘ্ন ঘটলেও ২০১৯-‘২০ অর্থবছরে ২৬ কোটি মুনাফা করেছি। তিন বছর পর এটা ৫০ কোটি ছাড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।’

প্রতিষ্ঠানটিতে নিটিং, ফ্যাব্রিক, ডাইং, অ্যাকসেসরিজ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল লন্ড্রি এবং গার্মেন্টস সুইংয়ের ওয়ানস্টপ সুবিধা রয়েছে। বর্তমানে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ভালুকায় নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আরো ১৫ হাজার লোকের নতুন কর্মসংস্থান হবে। সবুজ এই কারখানা সব কমপ্লায়েন্স অডিটে উত্তীর্ণ হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের নানা সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ক্যান্টিন, মেডিক্যাল, ফেয়ার প্রাইস শপ, ডে কেয়ার সেন্টারসহ কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি সব দেওয়া হয়।

এহসান উল হাবিব বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা খুশি, তাদের চাকরি ছাড়ার হার খুবই কম। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহেই আমরা বেতন দিচ্ছি। আমাদের কারখানার ভেতর এটিএম বুথ আছে, তারা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ওঠাচ্ছে। অনেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়েও লেনদেন করছে।’

ইউরোপ-আমেরিকায় করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়ায় কিছু অর্ডার স্থগিত হলেও বাতিল হয়নি বলে জানালেন নিট কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘এখন একসঙ্গে সব ক্রয়াদেশ আসা শুরু করেছে, যা সামাল দিতে আমাদের হিমসিম খেতে হচ্ছে। আমাদের ভালুকা কারখানা ঘিরে নতুন ক্রেতা আসছে। আমরা বিদ্যমান কারখানায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন কারখানার পণ্য উৎপাদন করছি।’

নতুন প্রকল্পে লঞ্জারিস, অ্যাক্টিভ ওয়্যার, স্পোর্টস ওয়্যারের মতো উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করা হবে বলে জানান মো. এহসান উল হাবিব। তিনি বলেন, ‘আমরা সনাতনি পোশাক থেকে বেরিয়ে উচ্চমানের পণ্যের দিকে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘এখন উন্নত দেশগুলোর ক্রেতারা সকালে জিমে যে পোশাক পরে সেটা পরেই আবার অফিস করছে। আমেরিকা, ইউরোপে স্মার্ট ক্যাজুয়াল ড্রেসগুলো নতুনভাবে চাহিদা তৈরি হচ্ছে। উচ্চমূল্যের এসব পণ্য বাংলাদেশের জন্য নতুন। এসব পোশাকের জন্য উন্নত প্রযুক্তি আমরা নতুনভাবে সংযোজন করছি। আমাদের নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি সেন্টার আছে। আমরা এমন পোশাক তৈরি করছি যেখানে কোনো সেলাই নেই।’

রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে এহসান উল হাবিব বলেন, ‘আমাদের এই বছরের লক্ষ্যমাত্রা আছে ১২০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করা। নতুন প্রকল্প যখন শেষ হবে তখন আরো ১৫০ মিলিয়ন ডলার বাড়তি যোগ হবে। এটা ধাপে ধাপে হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে তা ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করছি।’

ভালুকা প্রকল্পের অগ্রগতি জানাতে চাইলে এমডি বলেন, ‘ময়মনসিংহের ভালুকায় নিজস্ব জমিতে নতুন প্রকল্পটির সুপার স্ট্রাকচারের কাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৬৬ হাজার বর্গফুটের ১০ তলার মূল প্রডাকশন ভবনের পঞ্চম তলা পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ ৩৩ হাজার বর্গফুট শেষ হয়েছে। বর্তমানে ভবনের ভেতরের আনুষঙ্গিক কাজ পূর্ণ উদ্যোমে চলছে। এ ছাড়া ইউলিটি ভবনের কাজও চলছে। সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ফায়ার ইকুইপমেন্ট মেশিনারি বসবে।’

তিনি জানান, ইন্টিগ্রেটেড উৎপাদন সুবিধা সংবলিত কারখানাটি একটি নিজস্ব শিল্প পার্কের মধ্যে অবস্থিত, যা ২০ একর ভূমির ওপর বিস্তৃত হবে এবং দুটি ১০ তলা বিশিষ্ট গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট থাকবে। একই সঙ্গে ইটিপি সুবিধা সম্পর্কিত ফ্যাব্রিক পার্ক, ক্যান্টিন ও অন্যান্য সুবিধা সংবলিত কর্মী পরিবেশ বিল্ডিং, একটি ভিজিটর ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আবাসন সুবিধা সংবলিত ভবন, শ্রমিকদের আবাসন সুবিধা থাকবে। সম্প্রসারিত প্রকল্পে নতুন ধরনের পণ্য উৎপাদন করা হবে, যেমন : অ্যাকটিভওইয়্যার, লিঞ্জারি। গ্রাহকরা ব্যয়াম ছাড়া অন্য কাজের জন্য অ্যাক্টিভ ওয়্যারের পোশাকে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ক্রমবর্ধমান ভোক্তাদের চাহিদার কারণে অ্যাথলেটিক পোশাক বিক্রয় দ্বিগুণের চেয়ে বেশি হয়েছে অন্যান্য নন অ্যাক্টিভ পোশাকের তুলনায়। এই বিক্রয়টি বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত ব্যাপক চাহিদা, মার্চেন্ট, ফাস্ট ফ্যাশন রিটেইলার ও অন্যান্য দামি ব্র্যান্ডভিত্তিক এই বিলিয়ন ডলার ব্যবসায় ব্যাপক অংশগ্রহণের কারণে।

এহসান উল হাবিব বলেন, ‘লিঞ্জারে পণ্য মূলত ফিট, আরাম, দাম এবং অবশ্যই প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে উৎকর্ষতার সমন্বয়ে তৈরি। হাইটেক ফ্যাব্রিক ও নতুন প্রযুক্তির ও নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমরা আকর্ষণীয় পণ্য তৈরির জন্য প্রস্তুত।’

তিনি বলেন, ২০১৯-২০২০ সালে ৫০০ কোটি টাকা বিক্রি করে, যা ২০১৮-১৯ সালে ৫৯১.৯৫ কোটি টাকা ছিল। তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত বিক্রয় ছিল ৪৬৩ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরে ছিল ৪৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৭-১৮ সালের তুলনায় ২০১৮-১৯ সালে বিক্রয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সম্পর্কে জানতে চাইলে এসকোয়্যার নিটের এই শীর্ষ নির্বাহী বলেন, ‘চীন, টার্কির মতো প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের শ্রম সস্তা। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতার ফারাক আছে। সেই হিসেবে আমরা খুব বেশি কস্ট ইফেক্টিভ না। ওদের শ্রমিক যারা ৮০ শতাংশ দক্ষতায় কাজ করে সেখানে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির গড় দক্ষতা ৪০ শতাংশ। দ্বিগুণ বেশি বেতন দিয়েও তারা আমাদের চেয়ে প্রতিযোগী। এ জন্য শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও পণ্য বৈচিত্র্যকরণে আমরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছি।’

রপ্তানি বাজারেও বৈচিত্র্য আনতে এসকোয়্যার নিট কাজ করছে বলে জানালেন এহসান উল হাবিব। তিনি বলেন, ‘ইউরোপ, আমেরিকার পাশাপাশি আমরা চীন, ভারত, রাশিয়া ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেও চেষ্টা করছি রপ্তানি বাড়াতে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণে আমাদের ভালুকায় নতুন প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখবে। এখন থেকে যেসব পণ্য উৎপাদন হবে সেগুলো সাধারণত ইউরোপিয়ান ক্রেতারা ইউরোপ কিংবা চীন থেকেই নিয়ে থাকে সেই ধরনের পণ্যগুলো আমরা বাংলাদেশে তৈরি করব। সেগুলো তৈরির জন্য আমাদের কাঁচামাল শতভাগই আমদানি করতে হবে। আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে কিছুটা মূল্য সংযোজন করব। আস্তে আস্তে আমরা এটারও ব্যাক্যুয়ার্ড লিংকেজে যাব। এতে মূল্য সংযোজন আরো বাড়বে।’

এসকোয়্যার গ্রুপের ব্যবসা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এহসান উল হাবিব বলেন, ‘আমাদের গ্রুপের আরো অনেক নতুন প্রকল্প আসছে। আমরা অ্যাগ্রো প্রকল্প নিয়ে শুরু করেছি। আমাদের পরিবারের সদস্যদের বিষমুক্ত খাবার খাওয়ানোর জন্য শখের বসে একটি প্রকল্প করেছিলাম। পরে দেখলাম সচেতন ভোক্তাদের এই খাবার তুলে দিতে পারলে একটি ভালো কাজ হবে। শ্রীপুরে আমাদের এই প্রকল্পে সেই প্রত্যয় থেকেই আমি একটি অর্গানিক বিপ্লবের কাজে হাত নিয়েছি। এখানে পোল্ট্রি, ফিশারি, শাক-সবজি-পুরো ভ্যালু চেইনই অর্গানিক হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইলেকট্রনিক পণ্যও দেশে তৈরি করতে জাপানের সহায়তায় দেশে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করেছি। আগামীতে এসব পণ্যও দেশে উৎপাদন করব বলে আশা করছি। জেনারেল ও শার্পের কিছু পণ্য উৎপাদনে আমরা কাজ করছি। আমাদের নিজস্ব এসকোয়্যার ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদনের কাজ শুরু করেছি। মেঘনায় আমাদের এসকোয়্যার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক আছে। আমরা বাংলাদেশ থেকে প্রচুর হ্যাঙ্গার রপ্তানি করছি এইচঅ্যান্ডএম, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার তাদের হ্যাঙ্গারের পুরোটাই আমরা বাংলাদেশ থেকে সরবরাহ করি।’

এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘যেহেতু আমাদের ব্যবসা শুরু ইলেকট্রনিকস দিয়ে, তাই এই খাতে আমাদের বড় স্বপ্ন আছে। বাংলাদেশের পণ্য এখন বিশ্বমানের। আমরা জাপানের নীতি মেনেই পণ্য উৎপাদন করবো। জাপানিজ মান নিশ্চিত করে কিভাবে জাপানিজ পণ্য বাংলাদেশে উৎপাদন করে আরো সাশ্রয়ী দামে দিতে পারি সেই চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করছি আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে আসতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘সরকার চাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিগুলো যাতে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে থাকুক। আমরা সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্যতম উদ্যোক্তা। এখানে শুধু আমাদের ইন্ডাস্ট্রিই নয়, যাতে বিদেশি বিনিয়োগও আসে আমরা সেই লক্ষ্যে কাজ করছি।’