kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

দেশে বাণিজ্যিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে

অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

মাসুদ রুমী   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অটোমোবাইল শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে পণ্য পরিবহন বাড়ছে। এতে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, যা দেশে যানবাহন সংযোজন ও উত্পাদন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশ অটোমোবাইল শিল্পের জন্য আকর্ষণীয় বাজার। এই খাতে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ আছে, কিন্তু তার জন্য প্রথমেই একটি যুগোপযোগী অটোমোবাইল প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া ক্ষুদ্র ও ভারী প্রকৌশলে বিনিয়োগ অনেক সময়সাধ্য এবং এ থেকে লাভ তুলে আনাও বেশ কঠিন বলে মনে করছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা।

জানা যায়, বাণিজ্যিক যানবাহন বিক্রি বেড়ে চলেছে ২০১৪ সাল থেকে। বর্তমানে বাণিজ্যিক গাড়ির বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার, অথচ এটি এক দশক আগেও প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ছিল।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালে অন্তত ৩৫ হাজার ইউনিট বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, কার্গো ভ্যান, পিকআপ ও ট্যাংকার বিক্রি হয়েছে, যেখানে ১০ বছর আগেও এই পরিমাণ ছিল ২০০০ ইউনিট। এ ছাড়া গত দশকে বাণিজ্যিক যানবাহনের বাজারের আকার প্রতিবছর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ করে বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, পণ্য আমদানি-রপ্তানি বাড়ার কারণে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদা বাড়ছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বৃদ্ধি, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে বাস-ট্রাকের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাণিজ্যিক যানবাহনগুলোর বিক্রি বছরে ১০.৬৫ শতাংশ হারে বেড়েছে এবং ২০১৮ সালে এই বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ২৫,৯৮০ ইউনিট। আর এদের মধ্যে ট্রাকের বিক্রয় হার সবচেয়ে বেশি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ১২,৬৬৩ ইউনিট ট্রাক বিক্রি হয়েছিল, ২০১৭ সালে ছিল ১০ হাজার ৩৬৩ ইউনিট। অর্থাত্ বিক্রি বেড়েছে ২২.৩১ শতাংশ। লরির বিক্রিও বেড়েছে ১০.৬৮ শতাংশ। ট্রাক্টরের বিক্রি বেড়েছে ২৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে মোট বাস বিক্রি হয় ২৭৫৫ ইউনিট, যেখানে ২০১৭ সালে ছিল ৩৭৬০ ইউনিট।

দেশে এখন ১৪ থেকে ১৫টি বড় অটোমোবাইল পরিবেশ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব সংযোজন কারখানা। বাকিরা শুধু পরিবেশক বা আমদানিকারক। বাংলাদেশে অটোমোবাইলের প্রধান প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইফাদ অটোস, আফতাব অটো, নাভানা, র্যাংগস মোটরস, রনকন মোটরস, নিটল মোটর, রানার মোটর, এজি অটোমোবাইল, এসিআই মোটরস ইত্যাদি। উদ্যোক্তাদের মতে, অর্থনীতির গতি বাড়ছে বলে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক যানবাহনের জন্য একটি সম্ভাব্য বাজার তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক যানবাহনগুলোর চাহিদা দিন দিন বাড়বে। কারণ পণ্য পরিবহন ও মানুষের গতিবিধির জন্য যানবাহন দরকার। তাঁদের মতে, যখনই রাস্তাঘাট ও নতুন সংযোগ হবে তখনই গাড়ির চাহিদা বাড়বে। পদ্মা সেতু চালু হলে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগে চাহিদা আরো বাড়বে। বাড়বে গাড়ির চাহিদাও।

ইফাদ গ্রুপের চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ টিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৮৫ সালে ইফাদ গ্রুপ অটোমোবাইল খাতে ব্যবসা শুরু করে। প্রথমে দেশে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি আমদানি করা হতো, এখন সেটা করা হয় না। পার্টস আমদানি করে অ্যাসেম্বলিং করে পূর্ণাঙ্গ বাস-ট্রাক উত্পাদন করা হয়। এখন বাস-ট্রাক উত্পাদনে আরো এক ধাপ এগিয়েছে ইফাদ।’ তিনি বলেন, ‘আমরাই প্রথম প্লান্ট করেছি। আধুনিক মেশিনারিজের সমন্বয়ে অ্যাসেম্বলিং প্লান্টে প্রতিদিন ২৫টি গাড়ি উত্পাদন হচ্ছে। প্রতি ৪০ মিনিটে একটি গাড়ি তৈরি হচ্ছে। ইঞ্জিন ও চেসিস ছাড়া সব কিছুই দেশে উত্পাদন সম্ভব হচ্ছে।’

র্যাংগস মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহানা রউফ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে আমরা দুই ব্র্যান্ডের বাস, ট্রাক এবং পিকআপ ডিস্ট্রিবিউট করছি। আইশার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে আমরাই প্রথম বাংলাদেশে বিএস-৩ ইঞ্জিন নিয়ে এসেছি। দেশের পিকআপ সেগমেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত গাড়ি মাহিন্দ্রা পিকআপের ডিস্ট্রিবিউটরও আমরাই।’ তিনি বলেন, ‘গাড়ির প্রয়োজনীয় সব কিছু যদি দেশে উত্পাদন করা যায়, তাহলে আমরা গ্রাহকদের জন্য আরো সাশ্রয়ী মূল্যে গাড়ি দিতে পারব। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের জ্বালানির মান অত্যন্ত খারাপ। যেখানে ভারত বিএস-৬ প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখনো বিএস-৩ প্রযুক্তিতে পড়ে আছি। কেননা বিএস-৬ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত জ্বালানি আমাদের নেই।’

এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসীম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবহন খাতকে সমৃদ্ধ করতে আনকাই নামে বাস বাজারজাত করছি আমরা। জ্যাক পিকআপ ভ্যান ও ট্রাকও রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৪ হাজার গাড়ি দেশের রাস্তায় চলছে। ভোক্তাদের কাছে এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়াও পেয়েছি। এসব গাড়ি নিজেরাই স্থানীয়ভাবে সংযোজন করে থাকি। ২০১৯ সালে আমরা দেড় হাজারের বেশি গাড়ি নিজেদের কারখানায় সংযোজন করেছি।’

পিএইচপি অটোমোবাইলস লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ আকতার পারভেজ বলেন, ‘অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রির জন্য আমরা তিন-চার বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি। বাংলাদেশের মানুষ এখন ধীরে ধীরে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির দিকে ঝুঁকছে। দেশের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির বিক্রি এখন বেড়েই চলেছে। কারণ মানুষ গাড়ি কেনার পর অন্তত পাঁচ বছর নিশ্চিন্তে থাকতে চায়। গত দুই বছর আগেও মানুষের মধ্যে এই ধরনের সচেতনতা ছিল না। এখন মানুষ ঝামেলামুক্ত থাকতে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি কিনছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলতে চাই। উত্পাদনের পাশাপাশি রপ্তানিরও সুযোগ রয়েছে। সাফটা চুক্তির আওতায় নেপালে বাংলাদেশে তৈরি প্রোটন গাড়ি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ নিলে দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তিও আরো উজ্জ্বল হবে।’

মন্তব্য