kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রয়োজন গাড়ি উৎপাদনে

সোহানা রউফ চৌধুরী এমডি, র‍্যাংগস মোটরস

মাসুদ রুমী   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রয়োজন গাড়ি উৎপাদনে

 

আইশার বাস ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত মহেন্দ্র পিকআপ বাজারজাত

 

করছে র‍্যাংগস মোটরস

 

নীতিমালার অভাবে স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও দেশে গাড়ি উত্পাদন শিল্পের প্রসার ঘটেনি। সেসব দেশেই গাড়ি উৎপাদনকারীরা পা রেখেছে, যেখানে শুল্ক কাঠামো কম। বাংলাদেশেও গাড়ি নির্মাতা কম্পানিগুলো যাতে কারখানা খুলতে উৎসাহিত হয় তার জন্য একটি বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা জরুরি বলে মনে করেন র‍্যাংগস মোটরস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সোহানা রউফ চৌধুরী। তাঁর মতে, চলমান চাহিদা, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে একটি যথোপযুক্ত নীতিমালা এখন সময়ের দাবি। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অটোমোবাইল শিল্পের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। 

সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের দেশকে যেকোনো শিল্পের জন্যই একটি আকর্ষণীয় বাজার উল্লেখ করে সোহানা রউফ চৌধুরী বলেন, ‘এই খাতে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ আছে, কিন্তু তার জন্য প্রথমেই একটি সুনির্দিষ্ট অটোমোবাইল নীতিমালা অত্যন্ত প্রয়োজন। কোনো রকম নীতিমালা ছাড়া বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারে না কোন কোন বিষয়ে তাদের নজর রাখা উচিত এবং কী কী অনুসরণ করা প্রয়োজন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা তখন খুব কঠিন হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া ক্ষুদ্র ও ভারী প্রকৌশলে বিনিয়োগ অনেক সময়সাধ্য এবং এ থেকে লাভ তুলে আনাও বেশ কঠিন। আমি মনে করি, এই শিল্পের বিকাশে এটিই সবচেয়ে বড় বাধা।’

নীতিমালা হওয়ায় দেশ এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টু হুইলার (মোটরবাইক) উৎপাদন শুরু হয়েছে। এখন চার চাকার বাণিজ্যিক যানবাহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি তৈরির জন্য নীতিমালা হলে এই খাতেও প্রচুর বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছেন র‍্যাংগস মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, ‘মানুষের আয় বৃদ্ধির ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ায় দেশে বর্তমানে একটি স্বাস্থ্যকর প্রবৃদ্ধির পরিবেশ বিদ্যমান। এখানে সব পণ্য ও সেবার ৬০ শতাংশই সড়কপথে মানুষের দরজায় পৌঁছে। বাণিজ্যিক যানের চাহিদা এখানে তাই সব সময়ই থাকবে। বাণিজ্যিক যান বলতে কিন্তু শুধু ট্রাকই বোঝায় না, প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী পরিবহন করা বাসও এ ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। সড়কে মানসম্মত যান ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। রাস্তা, মহাসড়ক ও ব্রিজের সংস্কারের ফলে সড়কে মানুষের যাতায়াত ও বাণিজ্যিক যান পরিবহনের পরিমাণও বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘কত দ্রুত আমরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছি এবং ক্ষুদ্র থেকে ভারী প্রকৌশলে বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেরাই উৎপাদনে যেতে পারছি তার ওপর এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আমরা যদি তা করতে পারি তাহলে এ শিল্প শুধু বিকাশই লাভ করবে না, বাণিজ্যিক বাহন উৎপাদন ও পরিচালনা অনেক মানুষের কর্মসংস্থান ও দেশের উন্নয়নে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

দেশে ফোর হুইলার কারখানা স্থাপন কতটা লাভজনক জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নির্ভর করছে  উৎপাদিত গাড়ি কতটা মূল্য সংযোজন করছে তার ওপর। বাইরে থেকে আনা যন্ত্রাংশ এখানে অ্যাসেম্বল করে আসলে ততটা লাভ হয় না, যেহেতু এ ক্ষেত্রে শুধু আমদানি করটাই বাঁচে। আসল লাভ হবে যদি আমরা দেশের ভেতরেই কিছু করতে পারি। মানে বাংলাদেশেই আমরা কতটি যান পরিপূর্ণ তৈরি করতে পারছি। বাসের ক্ষেত্রে আমরা তা এরই মধ্যেই করছি। চেসিস, ইঞ্জিন ও গিয়ার-বক্স বাদে একটি বাসের বাকি সব অংশই আমরা দেশে তৈরি করি। অর্থাৎ যানবাহনের যত বেশি যন্ত্রাংশ আমরা দেশে  উৎপাদন করতে পারব, লাভের পরিমাণ তত বেশি হবে।’

এই উদ্যোক্তার মতে, গাড়িশিল্পের এখনো বহুদূর যাওয়া বাকি। যদিও বাসের ক্ষেত্রে আমরা একটু এগিয়েছি, হালকা যানের ক্ষেত্রে আমাদের আরো অনেক উন্নত হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট খাতে প্রয়োজনীয় সহায়ক শিল্প এখনো তেমন গড়ে ওঠেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে ২০২০ সালকে ক্ষুদ্র প্রকৌশলের বছর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, যা এই খাতে কিছুটা গতি এনেছে বলে জানালেন র‍্যাংগস মোটরসের এমডি। তিনি বলেন, ‘একটি পরিপূর্ণ ও আধুনিক নীতিমালা বিনিয়োগ ত্বরান্ব্বিত করবে। একটি অনুকূল কর-ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি ্উৎসাহিত করবে। এসব উদ্যোগের পরোক্ষ ফল হিসেবে এই খাতে বিপুল কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।’

র‍্যাংগস মোটরসের পরিবেশিত ব্র্যান্ডের বিশেষত্ব সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহানা রউফ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে আমরা দুই ব্র্যান্ডের বাস, ট্রাক এবং পিকআপ ডিস্ট্রিবিউট করছি। এলসিভি (লাইট কমার্শিয়াল ভেহিকল) সেগমেন্টের আইশার বাসও বাংলাদেশে ডিস্ট্রিবিউট করছি। আমরা যেগুলোকে ‘মিনিবাস’ বলে থাকি এগুলো সবই এলসিভি সেগমেন্টেরই গাড়ি। এই সেগমেন্টে বর্তমানে আমাদের ৬০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার রয়েছে। আইশার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে আমরাই প্রথম বাংলাদেশে বিএস-৩ ইঞ্জিন নিয়ে এসেছি, যা দেশের অন্যান্য ব্র্যান্ডের ইঞ্জিনের তুলনায় সবচেয়ে বেশি জ্বালানি সাশ্রয় করে এবং সবচেয়ে কম দূষণ করে।’

তিনি বলেন, ‘দেশের পিকআপ সেগমেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত গাড়ি মহেন্দ্র পিকআপের ডিস্ট্রিবিউটরও আমরাই। আমাদের বলেরো রেঞ্জের গাড়ির মার্কেট শেয়ার ৫০ শতাংশের বেশি। দেশের পার্বত্যাঞ্চলে গেলে এই গাড়িগুলোই বেশি চোখে পড়ে।’ 

যানবাহনের দাম কিভাবে আরো সাশ্রয়ী করা যায় জানতে চাইলে সোহানা রউফ চৌধুরী বলেন, ‘গাড়ির প্রয়োজনীয় সব কিছু যদি দেশে উৎপাদন করা যায়, তাহলে আমরা গ্রাহকদের জন্য আরো সাশ্রয়ী মূল্যে গাড়ি দিতে পারব। আমাদের ৮০ শতাংশের বেশি গাড়ি বিক্রি হয় বকেয়ার ভিত্তিতে এবং এর অন্যতম একটি কারণ হলো আমাদের অধিকাংশ গ্রাহকই গাড়ি কেনার জন্য ব্যাংকঋণ পান না। গ্রাহকদের গাড়ি কেনায় যদি সরাসরি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারতেন, তাহলে গাড়ির দাম আরো কমে আসত।’ তিনি বলেন, ‘আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো বাণিজ্যিক গাড়ির জন্য মানসম্মত জ্বালানির ঘাটতি। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের জ্বালানির মান অত্যন্ত খারাপ। যেখানে ভারত বিএস-৬ প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, আমরা তখনও বিস-৩ প্রযুক্তিতে পড়ে আছি। কেননা বিএস-৬ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত জ্বালানি আমাদের নেই। উৎপাদন ও মূল্য সংযোজন খাতকে উৎসাহিত করতে হলে ক্ষুদ্র প্রকৌশল খাতকে প্রসারিত করতে হবে।’

মন্তব্য