kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

মোটরসাইকেল শিল্প এগিয়ে নিতে ভেন্ডর উন্নয়ন জরুরি

হাফিজুর রহমান খান চেয়ারম্যান, রানার গ্রুপ

মাসুদ রুমী   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মোটরসাইকেল শিল্প এগিয়ে নিতে ভেন্ডর উন্নয়ন জরুরি

ছবি : লুত্ফর রহমান

        উৎপাদকদের স্থানীয় যন্ত্রাংশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করার দাবি

দেশে বছর বছর মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান এই চাহিদা পূরণে শীর্ষ মোটরসাইকেল কম্পানিগুলো স্থানীয় উৎপাদন শুরু করেছে। তবে মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক যে লিংকেজ শিল্প তার প্রসার ঘটছে না। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ভেন্ডরদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় উত্পাদকরা এখনো আমদানি করা খুচরা যন্ত্রাংশ দিয়েই তাদের চাহিদা পূরণ করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বাধ্যবাধকতা আরোপের দাবি জানিয়েছেন রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান। তিনি বলেন, দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের আরো প্রসার ঘটাতে ভেন্ডর (লিংকেজ শিল্প) উন্নয়নে জোর দিতে হবে। অন্যথায় এই শিল্প পরবর্তী ধাপে পৌঁছতে পারবে না। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে দেশের মোটরসাইকেল শিল্পের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন মোটরসাইকেল শিল্পের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

মোটরসাইকেল প্রস্তুত ও রপ্তানিতে প্রথম দেশি ব্র্যান্ড রানার অটোমোবাইলস লিমিটেড। রানারের যাত্রা শুরু ২০০০ সালে, মোটরসাইকেল আমদানির মধ্য দিয়ে। ২০০৭ সালে প্রথম মোটরসাইকেলের খুচরা সামগ্রী তৈরির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সংযোজন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে রানার পানচিং, ওয়েল্ডিং, পেইন্টিং, অ্যাসেম্বলিং, টেস্টিংসহ আনুষ্ঠানিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী হিসেবে সরকারি অনুমোদন লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৪০ একর জমির ওপর রানারের নিজস্ব উৎপাদনকেন্দ্র আছে। এটি পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ কারখানা’। আইএসও সার্টিফায়েড কম্পানি হিসেবে পরিপূর্ণভাবে কমপ্লায়েন্স মেনে চলা হয় বলে জানান হাফিজুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘৮০ সিসিতে আমরা বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছি। এ ছাড়া ১০০ সিসিতেও আমরা ভালো অবস্থানে আছি। পাশাপাশি ১৫০ সিসির ফ্যাশনেবল মোটরসাইকেলেও জোর দিচ্ছি।’ 

দেশের বাজারের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানে মোটরসাইকেল রপ্তানি করছে রানার অটোমোবাইলস। ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে নেপালের বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ লেখা মোটরসাইকেল আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ৮০ থেকে ১৫০ সিসির সাত মডেলের মোটরসাইকেল নেপালে পাঠায় রানার। পরে তাদের মোটরসাইকেল রপ্তানি হয় ভুটানে। আগামী বছর আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও রপ্তানির দরজা খুলতে চান বলে জানালেন রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি ২০০ সিসির মোটরসাইকেল নেপালে রপ্তানি করেছি। এতে আমরা খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। নেপালের বাজারে এটি সর্বোচ্চ বিক্রীত মোটরসাইকেল।

তিনি বলেন, ‘আমরা আশির দশক থেকে সিকেডি অ্যাসেম্বলির বলয়ের মধ্যে আটকে ছিলাম। এটি কেউ ভাঙছিল না। ২০১০ সাল পর্যন্ত সবাই মোটরসাইকেল সংযোজন করেছে। আমরাই প্রথম এই বলয় ভাঙার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এতে শুধু আমরাই সফল হয়েছি তা নয়, আরো অনেক কম্পানি ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে এসেছে। কিন্তু এখন আবার একটি বলয়ে এই শিল্প আটকে গেছে। আর তা হলো স্থানীয়ভাবে ভেন্ডর উন্নয়ন না করা।’ এখন মোটরসাইকেলের চেসিসের সঙ্গে দুটি কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচার করলেই তিনি ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে গণ্য হবেন। একটি মোটরসাইকেলের মধ্যে হাজারখানেক কম্পোনেন্ট আছে।

ভেন্ডর উন্নয়নে দ্রুত পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে এই শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা যদি পর্যাপ্ত ভেন্ডর তৈরি করতে না পারি, স্থানীয়ভাবে সহায়ক শিল্পের বিকাশ না ঘটাতে পারি, তাহলে মোটরসাইকেলের দাম আরো কমানো যাবে না। তা ছাড়া এই শিল্পের মাধ্যমে দেশে শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের যে আশা করা হচ্ছে, তাতে গতি আসবে না। দু-একটি কারখানা যে সিট, চেইন স্থানীয়ভাবে তৈরি করছে, তা আমরাই নিচ্ছি আর কেউ নিচ্ছে না। সবাই যদি স্থানীয় কম্পোনেন্ট না নেয়, তাহলে এ খাতের বিকাশ ঘটবে না। এ খাত আবার একটি বলয়ের মধ্যে আটকে যাবে। তাই উত্পাদকদের স্থানীয় কম্পোনেন্ট নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা করতে হবে। এটি না করতে পারলে দেশের মোটরসাইকেল শিল্প পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে না।’

কেউ যদি স্থানীয় কম্পোনেন্ট না কেনে, তাহলে ভেন্ডররা তা বানাবে না উল্লেখ করে হাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘প্রতিটি ব্র্যান্ডকে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় ভেন্ডরের কাছ থেকে কম্পোনেন্ট নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। অন্যথায় তাদের যেসব শুল্ক সুবিধা আছে, তা স্থগিত করতে হবে। এ ধরনের চাপ সরকারের কাছ থেকে আসতে হবে, তাহলে এই শিল্পের প্রসার ঘটবে।’

২০১৯ সালে সাড়ে পাঁচ লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। এর আগের বছর চার লাখের বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। চলতি বছর আগের বছরের মতো প্রবৃদ্ধি হবে না উল্লেখ করে রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে আমাদের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার চলতে পারছে না। ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুস্থ নয়, আবার পুঁজিবাজারও স্বাভাবিক আচরণ করছে না। আবার করোনভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনীতিতে চাহিদা কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে বিক্রিতে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে রানার গ্রুপের মার্কেট শেয়ার ঠিক থাকবে বলে আশা করছি।’

রানারের মোটরসাইকেলের বিশেষত্ব জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রেতার চাহিদাকে অনুধাবন করে সেই অনুযায়ী মোটরসাইকেল বাজারে আনি। আমরা যতটা না ফ্যাশনেবল বাইক আনি, তার চেয়ে বেশি কাস্টমার ফ্রেন্ডলি বাইক আনি। কিভাবে আরো সাশ্রয়ী দামে জ্বালানি সাশ্রয়ী একটি মোটরসাইকেল সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা আমরা বেশি করি। বাজারে ১৫০ সিসির মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে। আমরা সেই ক্রেতাদেরও চাহিদা পূরণ করে চলেছি। চলতি মাসে এই সেগমেন্টের আরো দুটি মোটরসাইকেল বাজারে আনব।’

বিশ্ববাজারে উচ্চমানের শৌখিন মোটরসাইকেল রপ্তানি করতে যাচ্ছে রানার অটোমোবাইলস লিমিটেড। নেপালের পর প্রতিষ্ঠানটির নজর এখন ভুটান, মিয়ানমার, ভারতের সাতটি রাজ্য (সেভেন সিস্টার), আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। সম্ভাবনাময় এসব বাজারে উচ্চ প্রযুক্তির মোটরসাইকেল রপ্তানির জন্য ২০১৮ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৬৫ থেকে ৫০০ সিসি পর্যন্ত বাইক রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানির অনুমতি পেয়েছে রানার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শৌখিন বাইকারদের কাছে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে উল্লেখ করে রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিবছর দুই কোটি ইউনিট উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। এই বাজার ধরতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মোটরসাইকেল কম্পানি ইউএম মোটরসাইকেল তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করবে। স্থানীয় বাজারেও এসেছে ‘রানার-ইউএম’ মোটরসাইকেল। এ ছাড়া ভুটানের বাজারেও আমরা মোটরসাইকেল রপ্তানি করেছি।”

বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ মোটরসাইকেল রপ্তানির আরো সুযোগ আছে উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমাদের দেশে সরকারি কোনো মান সনদ প্রদানকারী সংস্থা না থাকায় আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। বিএসটিআই, বিআরটিএ কোথাও বিদেশে মোটরসাইকেল রপ্তানির জন্য টেস্টিং মেশিন নেই। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি এই ব্যবস্থা করার। বিএসটিআই এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আমরা পিছিয়ে যাব।’

রানার অটোমোবাইলস বিক্রয়োত্তর সেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে উল্লেখ করে হাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘প্রত্যেক ক্রেতাকে আমরা আমাদের ডাটাবেইসের মধ্যে নিয়ে এসে তাদের চাহিদা অনুযায়ী দৌরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিচ্ছি। আমরা খুচরা যন্ত্রাংশও সহজলভ্য করেছি।’ তিনি বলেন, মোটরসাইকেল শিল্পের বিকাশে রেজিস্ট্রেশনে উচ্চ ব্যয় একটি বাধা। এটি আরো কমানো দরকার।

রানার গ্রুপ মোটরসাইকেল উৎপাদন ছাড়াও বাণিজ্যিক যানবাহন ও থ্র্রি হুইলার বাজারে এনেছে।

হাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘সরকারের পরিবহন নীতিমালায় নানা বৈপরীত্য আছে। থ্রি হুইলার রেজিস্ট্রেশন এখন বন্ধ আছে। এই যানবাহন আটকে দিলেও ব্যাটারিচালিত বাহনগুলোকে চলতে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো সরকারের অনুমোদিত নয়। অথচ বিপজ্জনক লাখ লাখ গাড়িতে ছেয়ে গেছে রাজধানীসহ সারা দেশ। কিন্তু যেটি অনুমোদিত গাড়ি সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে। আমরা সরকারের কাছে এ ব্যাপারে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আশা করি।’

মন্তব্য