kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

মাঝারি মূল্যের গাড়ি বেশি বেচাকেনা সিলেটে

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সিলেটে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির চাহিদা কম। মূলত  মাঝারি মূল্যের গাড়িই এখানে বেশি বেচাকেনা হয়। কিন্তু পাঁচ-ছয় মাস ধরে সে ব্যবসাও একেবারে নিস্তরঙ্গ নদীর মতো। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেচা-বিক্রি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কোনো কোনো শোরুমের অবস্থা আরো খারাপ, সারা মাসেও বিক্রি হচ্ছে না দুটি গাড়ি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও গাড়ির ক্ষেত্রে ঋণ দিতে অনাগ্রহী। এ রকম চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, সিলেটে গাড়ির ক্রেতাদের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে প্রবাসীরা। এর পরই চিকিত্সক ও ব্যবসায়ী। ব্যাংকাররাও আছেন সে তালিকায়। তবে সিলেটে প্রবাসীদের আনাগোনা কমে যাওয়ায় এবং তাঁদের দেশে বিনিয়োগের মানসিকতায় পরিবর্তন আসায় অন্যান্য ব্যবসার মতো গাড়ির ব্যবসায়ও মন্দা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও ঋণ দিতে অনাগ্রহী। নগরের কুমারপাড়া এলাকায় গাড়ির শোরুম ফরিদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘পাঁচ-ছয় মাস ধরে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। অন্যান্য বছর এ সময়টায় আমরা যেখানে ১৫-২০টি গাড়ি অনায়াসে বিক্রি করতে পারতাম এবার সেখানে মাত্র দুই-তিনটি গাড়ি বিক্রি করেছি।’ সামগ্রিক বিচারে গত পাঁচ-ছয় মাসে গাড়ি বিক্রি ৭০ শতাংশ কমে গেছে বলে তিনি জানান।

কেন গাড়ি বিক্রি কমেছে, এমন প্রশ্নে তিনি অনেক কারণ তুলে ধরলেন। ক্রেতা শ্রেণির বড় অংশ প্রবাসীরা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা দেশে আসছেন কম। যাঁরা আসছেন তাঁরা ক্যাশ টাকায় গাড়ি কেনার সাহস করছেন না। কারণ অনেক প্রবাসীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকে না। ফলে তাঁরা টিআইএন বের করতে পারেন না। এতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা সম্ভব হয় না। আর নগদ টাকা দিয়ে তাঁরা কিনতে চান না। বিশেষ করে শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর অনেকেই টাকা খরচ করছেন না।’

তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, জিপ, অ্যাম্বুল্যান্সের পাশাপাশি ভারী যানবাহন বিক্রি করত। ভারী যানবাহন বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন জানিয়ে শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘পাথরকোয়ারি বন্ধ থাকায় বড় প্রভাব পড়েছে আমাদের ব্যবসায়। কারণ সিলেটের বড় ব্যবসায়ী, প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের অনেকেরই পাথরকোয়ারিতে বিনিয়োগ আছে। কোয়ারি বন্ধ থাকায় তাঁরা ব্যয় কমিয়েছেন। তা ছাড়া মূলত কোয়ারির কাজের জন্য ভারী যানবাহন কেনা হতো। এখন সেগুলো বন্ধ থাকায় আমরাও ভারী গাড়ি আনা বাদ দিয়েছি।’

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে আনার সিদ্ধান্তের পর থেকে ব্যাংকগুলো গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ঋণ দিতে চাচ্ছে না। আগে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা নিয়মিত আমাদের শোরুমে আসতেন। মানুষকে ঋণ দিয়ে গাড়ি কেনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। এখন তাঁদের দেখাও পাওয়া যায় না।’

সিলেটে শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম থাকায় বিলাসবহুল গাড়ির চাহিদা কম। তবে এর বাইরেও যাঁরা গাড়ি ব্যবহার করতে চান তাঁরা উচ্চ মূল্যের জন্য সাহস করেন না বলে জানিয়েছেন সিলেটের সবচেয়ে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি  ব্লু-বার্ড অটোসের স্বত্বাধিকারী আফজাল রশিদ চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে নগরের ইলেকট্রিক সাপ্লাই এলাকায় যাত্রা শুরু করে তাঁর প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, ‘সিলেটে এখন ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা বাজেটের মধ্যে গাড়ির চাহিদা বেশি। এলিয়েন, প্রিমিও, হাইয়েস, নোহার মতো গাড়িগুলোই বিক্রি হয় বেশি। বিলাসবহুল গাড়ির ক্রেতা কম। আর যাঁরা কেনেন তাঁরা সরাসরি চট্টগ্রাম বা ঢাকা থেকে কিনে আনেন।’ গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর ওপর তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা সময় আমরা দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় স্টেশনওয়াগনের মতো গাড়িগুলো ক্রেতাদের দিতে পেরেছি। এখন অতিরিক্ত শুল্কের কারণে গাড়ি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এ বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিলে ১৩০০ সিসির গাড়িগুলো পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকায় ক্রেতাদের দেওয়া সম্ভব হবে। এতে পরিবেশের জন্য ভালো হবে। সিএনজিচালিত অটোরিকশার আমদানি কমবে। জাপানের সুজুকি আলট্রো, প্রবক্সের মতো গাড়িগুলো আনা যাবে।’

মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া মানা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ১৭-১৮ লাখ টাকা দামের মাইক্রোবাসকে অ্যাম্বুল্যান্স দেখিয়ে ১১-১২ লাখ টাকায় নিয়ে আসছেন। পরে সেগুলো মাইক্রোবাস হিসেবে বিক্রি করছেন বেশি দামে। আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের পক্ষে এসব করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আমরা মার খাচ্ছি।’

সিলেটে বিলাসবহুল গাড়ির বাজার তেমন নেই। তার পরও প্রায় সাড়ে চার বছর আগে নগরের শাহজালাল উপশহর এলাকায় জমকালো আয়োজনে ‘মিলেনিয়াম অটোমোবাইল’ যাত্রা শুরু করে। সেখানে বিশ্বখ্যাত হুন্দাই ও নিশানের বিলাসবহুল গাড়ি তোলা হয়। কিন্তু ভালো সাড়া না পাওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বরে শোরুমটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন উদ্যোক্তারা। মিলেনিয়াম অটোমোবাইলসের ব্যবস্থাপক হারুন উর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাড়ে চার বছরে মাত্র ৪০টির মতো গাড়ি বিক্রি হয়েছে। কিভাবে এত বড় একটা শোরুম টিকিয়ে রাখা যায়?’ দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর ধরে সিলেটে এই পেশায় সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, গত নভেম্বর থেকে ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে।

মন্তব্য