kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

দেশের সবচেয়ে আস্থাশীল ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হবে হিরো

উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে হিরো

আরিফুর রহমান   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




দেশের সবচেয়ে আস্থাশীল ও জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হবে হিরো

আব্দুল মুসাব্বির আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নিলয় মটরস্ লিমিটেড

বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের বাজারে দাপটের সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছে নিলয় মটরস্ লিমিটেডের হিরো মোটরসাইকেল। অল্প সময়ের মধ্যে, শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর কারণ তরুণদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় রয়েছে হিরো মোটরসাইকেল। উত্পাদনের দিক থেকে দেশের শীর্ষ অবস্থানে হিরো। বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের বাজারের সম্ভাবনা নিয়ে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে কথা বলেছেন নিলয় মটরস্ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল মুসাব্বির আহমেদ।

তিনি বলেন, আমরা গত তিন-চার বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছি, দেশে মোটরসাইকেলের বাজার দিন দিন বাড়ছে। মোটরসাইকেল শিল্পের প্রবৃদ্ধি বিস্ময়কর। ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে গ্রাহকের কাছে পছন্দের তালিকায় হিরো অন্যতম। উত্পাদন কারখানা স্থাপনের কারণে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং ম্যাল্টি ন্যাশনাল ব্র্যান্ড হিরো সর্বপ্রথম বাংলাদেশে নিজস্ব উত্পাদন কারখানা শুরু করে ২০১৭ সালের জুন মাসে। দেশব্যাপী এখনো মোটরসাইকেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এর মূল কারণ, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তারুণ্যের হার বেশি এবং তরুণদের পছন্দের তালিকায় মোটরসাইকেল অন্যতম। তা ছাড়া এখনো অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চল রয়েছে, যেখানে মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা যায় না। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল একটি নির্ভরযোগ্য বাহন।

সরকার শুল্ক ছাড় দেওয়ার আগে প্রতিবছর মোটরসাইকেল বিক্রি হতো দুই থেকে আড়াই লাখ। শুল্ক ছাড় দেওয়ার পর বছরে এখন মোটরসাইকেল বিক্রি হচ্ছে পাঁচ লাখের বেশি। সরকার যখনই শুল্ক কমিয়েছে; তখনই বাজারে মোটরসাইকেল বিক্রির হার ৫০ শতাংশ থেকে শতভাগ বেড়েছে। দামের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ক্রয়ের একটা সম্পর্ক আছে। এতে বোঝা যায়, বাজারে মোটরসাইকেলের চাহিদা কতটুকু।

জ্বালানী সাশ্রয়, নির্ভরযোগ্য, প্রাণোচ্ছল পণ্যের জন্য গ্রাহকদের কাছে হিরো স্বীকৃত, বাংলাদেশের ক্রেতাসাধারণের মধ্যে হিরো তার ব্র্যান্ডের প্রতি বিশ্বস্ততা অর্জন করেছে। আমরা বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। শোরুম করার আগে আমরা ওয়ার্কশপ তৈরি করেছি আর এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিশ্চিত করছি গ্রাহকসেবা। বাজারে অনেক মোটরসাইকেলের বড় বড় শোরুম রয়েছে; কিন্তু ওয়ার্কশপ অনেক ছোট। অনেকের আবার ওয়ার্কশপই নেই। যারা আমাদের ডিলারশিপ নেবে, তাদের আমরা বলে দিয়েছি কতটুকু নির্ধারিত জায়গার ওপর ওয়ার্কশপ হবে। আমাদের দর্শন হলো, ওয়ার্কশপ আগে। হিরো ম্যাল্টিন্যাশনাল ব্র্যান্ড হিসেবে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের ওপর পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়েছি। আপনি যদি এখন মোটরসাইকেল কেনেন, পাঁচ বছরের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে আমরা ঠিক করে দেব। আমরা আমাদের শোরুমগুলোতে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে রেখেছি, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস নয়। যখন গ্রাহকদের কাছে মোটরসাইকেল হস্তান্তর করা হয়, তখন নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের বিস্তারিত বলা হয়ে থাকে। কিভাবে গাড়ি চালানো উচিত, সে বিষয়ে আমরা ক্যাম্পেইন করে থাকি। হেলমেট পরার ওপর গুরুত্ব দিই। অনেকে মনে করেন, মোটরসাইকেল অনিরাপদ। আপনি যদি নিয়ন্ত্রিত গতিতে মোটরসাইকেল চালান, দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম। কিভাবে মোটরসাইকেল চালাতে হবে, অবশ্যই জানতে হবে। দুজনের বেশি কিছুতেই মোটরসাইকেলে চড়া উচিত নয়। আমাদের মোটরসাইকেলের নকশা দুজনের জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তিনজন ওঠেন। ক্ষেত্র বিশেষে চারজন ওঠানোরও চেষ্টা থাকে। আইথ্রিএস প্রযুক্তি (আইডল স্টপ স্টার্ট সিস্টেম) হিরো মোটরসাইকেলের একটি পেটেন্টেড টেকনোলজি, যা বাইকটি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। যখন বাইকটি দাঁড়িয়ে থাকে, এটি জ্বালানি সাশ্রয় করে এবং একই সঙ্গে পরিবেশে কার্বন নিঃসরণকে সীমাবদ্ধ করে পরিবেশগত ক্ষতি এবং বাইকারের স্বাস্থ্যের ক্ষতি কম করে। মোটরসাইকেল শিল্পে এই প্রযুক্তিটি নিশ্চিত করা উচিত। আমরা সব ধরনের সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিষয়গুলো শেয়ার করি।

বাংলাদেশে একটা ধারণা হচ্ছে, আপনি যদি উত্পাদনকারী হন, সব কিছু আপনি তৈরি করবেন। বিশ্বে এখন কোথাও এমন হয় না। আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে যারা উত্পাদনকারী ছিল, সবকিছু ফ্যাক্টরিতে বানাত। কিন্তু এই ধারা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়েছে। জাপানে শুরু হয়েছে ভেন্ডর ডেভেলপমেন্ট। পৃথিবীর সব দেশেই এখন ভেন্ডর ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে চলছে। বাংলাদেশে যে শুল্ক কাঠামো আছে, তাতে ভেন্ডর ডেভেলপমেন্ট সম্ভব হবে না।

মোটরসাইকেলের খরচ সাশ্রয়ী বা নাগালে আনতে হলে ভেন্ডর ডেভেলপমেন্ট করতে হবে। ভেন্ডর যারা পার্টস বানাচ্ছে, ভেন্ডর উন্নয়ন হলে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কমে যাবে। সরকার যেসব নীতিমালা তৈরি করছে; সেসব খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তখনকার নীতিমালা দেখে আমরা বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু নতুন করে যেসব নীতিমালা হচ্ছে, তা আমাদের বিনিয়োগ সহায়ক নয়। যদিও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে শুল্ক বাড়ানো হয়নি। দেশে প্রগ্রেসিভ ম্যানুফ্যাকচারিং নামে একটা খাত তৈরি করা হয়েছে। কিছু কিছু বড় ব্র্যান্ড ওই খাতে বিনিয়োগ এবং সিকেডি অ্যাসেম্বলিং করছে। সম্প্রতি তারা বিনিয়োগও শুরু করছে। তারা সরকারের কাছ থেকে কর অবকাশ সুবিধা পেয়েছে। সেটা দেশের জন্য কতটা ভালো দেখতে হবে। আমরা উত্পাদনের জন্য বিনিয়োগ করেছি, তাই কিছু সুবিধা পাচ্ছি। অন্যরা বিনিয়োগ না করেও আমাদের মতো সমান সুবিধা পাচ্ছে। তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ জন্য উত্পাদনকারী ও আমদানিকারকদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রাখা উচিত। অন্ততপক্ষে চার-পাঁচ বছরের জন্য। যশোরে আমাদের কারখানা স্থাপনের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। এখন যে শুল্ক কাঠামো আছে, তাতে কোনো ব্যবসায়ীর উত্পাদন করতে স্পৃহা নাও থাকতে পারে—সবার আগ্রহ থাকবে প্রগ্রেসিভ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে।

১৫ বছর ধরেই এই পেশায় আছি। দেখেছি এই পেশায় যেসব মেকানিক কাজ করে তারা অত্যন্ত দক্ষ। আপনি যদি কোনো মেকানিককে জিজ্ঞেস করেন কোথা থেকে কারিগরি শিক্ষা পেয়েছে; সে বলবে ওস্তাদের কাছ থেকে। তবে আমাদের দেশে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলে সুবিধা হতো।

বাংলাদেশে স্কুটারের চাহিদা খুবই কম। সার্ক দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কা, ভারত, নেপালে স্কুটার ব্যবহার বাড়ছে। আমাদের দেশে একটা মানসিকতা আছে, স্কুটার মেয়েদের জন্য; আর বাইক ছেলেদের জন্য। স্কুটার চালানো সহজ। এটা নিরাপদও। যারা মোটরসাইকেল চালাতে আগ্রহী নয়, তাদের জন্য স্কুটার উত্তম বাহন এবং স্কুটার চালানো শেখা সহজ। স্কুটারের চাহিদা এখনো তৈরি হয়নি। এটা সামাজিক ব্যাপার। গ্রাহক যেটা চায় আমরা সেটাই দেব।

আমরা এখন যা বিক্রি করছি, তার চেয়ে দুই গুণ বা তিন গুণ বেশি বিক্রি করব ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই, আমাদের ডিলার, কর্মী, গ্রাহক সবাই যাতে খুশি থাকে। আমরা শুধু মোটরসাইকেল তৈরি করি না, সুখ তৈরি করি। সুখ উত্পাদন করি। আমি চাই আগামী দুই বছরে, হিরো দেশের সর্বাধিক আস্থাশীল এবং জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

 ছবি : লুৎফর রহমান

মন্তব্য