kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

সাহিত্যের রূপরেখা

সেলিনা হোসেন   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাহিত্যের রূপরেখা

১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান খালি পায়ে মহান শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। ছবি : বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সৌজন্যে

বাঙালির আবহমানকালের মূল্যবোধ, জীবনদর্শন নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি বর্তমানে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের অধিবাসী। এই স্বাধীনতা বাংলা ভাষাকে একটি দেশের রাষ্ট্রভাষা করেছে। এই স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়ে একে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তিনিই সেই বাঙালি, যিনি বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও বলব—আমি বাঙালি, বাংলা আমাদের দেশ, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে।’ এই স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ পটভূমি আছে। এই পটভূমি স্বল্প সময়ে অনায়াসে তৈরি হয়নি। এর জন্য সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এই জনগোষ্ঠীকে—ঝরেছে অগণিত মানুষের রক্ত ও জীবন।

মোটা দাগের টানে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়—

এক. সাতচল্লিশে দেশভাগের পরবর্তী সময়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন পূর্ববঙ্গের বাঙালির একটি বিশাল এবং স্থায়ী সাংস্কৃতিক অর্জন। মাতৃভাষার জন্য এই জীবনদান পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। এ ঘটনা বাঙালির জীবনে এক অমিত সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তাই ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধ আমাদের কাছে অতীতের একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

দুই. এই ভূখণ্ডের বাঙালির পরবর্তী ধাক্কা সামরিক শাসনের নিপীড়ন-সামরিক শাসনের অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম এবং কোনো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে এ ধরনের নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল কি না তা আমার জানা নেই, যার ভেতর থেকে সে জনগোষ্ঠীর লেখকরা কুড়িয়ে আনতে পারে গুটিকয় সোনালি শস্যদানা।

তিন. পৃথিবীর কোথাও রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে পড়েননি, যেমন পড়েছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করেছিলেন রেডিও-টেলিভিশনে। পূর্ববঙ্গবাসী তাঁকে বুকে আগলে রাখার জন্য প্রতিবাদে, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। রবীন্দ্রসংগীত গাইবার অপরাধে সরকারের হাতে নিগৃহীত হয়েছিলেন কোনো কোনো শিল্পী। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খাঁ রবীন্দ্রসংগীত লিখতে পারেন না কেন বলে ধমকেছিলেন লেখকদের তাঁর সরকারি বাসভবনে ডেকে নিয়ে। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ থেকে ছাড়া পেয়ে তাঁর প্রথম ভাষণে বলেন, ‘আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্রসংগীত গাইবই এবং রবীন্দ্রসংগীত এই দেশে গীত হবেই।’ সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদের পাশাপাশি এটি ছিল একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রতিরোধের মুখে নতি স্বীকার করেছিল পাকিস্তান সরকার রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রে নিষিদ্ধঘোষিত রবীন্দ্রসংগীত পুনঃপ্রচারের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের কোনো নির্দেশ ছিল না, তবু মানুষের মুখে মুখে সেই দারুণ দুর্দিনে যে গান উঠে আসে তা রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

চার. পাকিস্তান সরকারের শোষণ, বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক পদদলনের প্রতিবাদে ৯ মাস স্থায়ী যুদ্ধ বাঙালির জীবনের আকাশছোঁয়া অন্য রকম অভিজ্ঞতা। দেখতে হয়েছে গণহত্যা, বন্দিশিবিরের নিদারুণ অত্যাচার, নারী ধর্ষণ-শিশুর খুলি রাজপথে বেয়নেটের মাথায়। দেখতে হয়েছে গেরিলা অপারেশন, রাতের অন্ধকারে মুক্তিযোদ্ধার জ্বলজ্বলে চোখ। দেখতে হয়েছে স্বাধীনতার পর যুদ্ধশিশু। বিধ্বস্ত দেশ। শুনতে হয়েছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ। সইতে হয়েছে বুদ্ধিজীবী হত্যার শূূন্যতা।

পাঁচ. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের মহান বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে জীবন দিতে হয় সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে। যিনি ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তাঁর গমগমে কণ্ঠস্বরে স্পিকারকে বলেছিলেন, “স্যার, আপনি দেখবেন, ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার বলেছি, আপনারা এ দেশটাকে ‘বাংলা’ নামে ডাকেন। বাংলা শব্দটার একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য। আপনারা এই নাম পরিবর্তন করতে চাইলে আমাদের জনগণের সঙ্গে আলাপ করতে হবে।” তিনিই আবার ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিবসে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বলেছিলেন, “আর পূর্ব পাকিস্তান নয়, আর পূর্ব বাংলা নয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি—আজ থেকে বাঙালি জাতির এই আবাসভূমির নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।” এই বাংলাদেশে তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাই বলে ইতিহাসের নিজস্ব গতি কেউ থামিয়ে দিতে পারে না। বাংলাদেশ তার নিজস্ব পথ খুঁজে নিয়ে চলেছে। উর্বর হচ্ছে তার নিজস্ব মাটি।

যে কয়টি বড় ঘটনার উল্লেখ করলাম এর বাইরে আরো নানা ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলা করতে হয়েছে দেশবাসীকে। দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন এবং গণ-অভ্যুত্থানের মতো অসংখ্য ছোট-বড় ঘটনা এ দেশের মানুষের শান্তি ও স্বস্তির বিপরীতে লৌহকঠিন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার শপথ।

এই পথ পরিক্রমার অজস্র অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্য। এই নির্মাণ হাজার বছরের বাংলা ভাষার মূল স্রোতে একটি বড় সংযোজন, যে সংযোজনের ফলে হাজার বছরের বাংলা ভাষার বৈচিত্র্য ও আয়তন বেড়েছে। এ যাত্রার অনুষঙ্গ নানাবিধ—বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসবে কিভাবে এ দেশের ভাষা ও সাহিত্য বাঙালির গৌরবকে শাণিত করেছে, দিয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী রচনার মৃত্তিকা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা আমাদের গদ্যের এক বড় সম্পদ। বাংলা একাডেমি থেকে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রকাশিত হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষার এই বিপুল শব্দভাণ্ডার, লেখকদের ব্যবহার পদ্ধতি আমাদের গদ্যকে বাংলা ভাষার অন্য অঞ্চলের গদ্য থেকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। দিয়েছে ভাষার প্রাণশক্তি। যে প্রমিত গদ্য বাংলাদেশের মানুষ ব্যবহার করে তার কাঠামো সবটা কলকাতাকেন্দ্রিক নয়। অনেক সময় তা পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক ভাষাকাঠামোর ওপর শুধু শুদ্ধ শব্দের প্রতিস্থাপন। এটি বাংলাদেশের সাহিত্যের গদ্যকে কিছুটা স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করে। উচ্চারণ ও বাকভঙ্গির ভিন্নতা গদ্যের বৈচিত্র্য নির্ণয়ের একটি বড় উপাদান। যে জনগোষ্ঠী যে ধরনের সংস্কৃতির ভেতরে বসবাস করে সে সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের ওপরও গদ্যের প্রকাশ কী হবে, তা নির্ভর করে। একটি জনগোষ্ঠী নিজস্ব মূল্যবোধের ভিত্তিতে যে জীবনাচরণ গড়ে তোলে সেটা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। ভাষা সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। এই ভাষা শুধু আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকেই চিহ্নিত করেনি, রাজনৈতিক দিকনির্দেশনারও বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটিয়েছে।

১৯৪৮ সালের ঢাকার কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ওপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপালে তা পূর্ব বাংলায় গণহত্যার শামিল হবে।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’

এভাবেই সাহিত্যের ভেতর দিয়ে আমরা জীবন অভিপ্রায়ের এবং একই সঙ্গে শিল্প অভিপ্রায়ের লক্ষ্য স্থির করেছি। আমাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। একটু পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলতে চাই, বিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলিম লেখকদের সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ কথা কে না জানে যে মননের চর্চা কখনোই রাতারাতি বাজিমাত করে না, তার লক্ষ্য ধীর প্রক্রিয়ায় উৎকর্ষ সাধন। সংগঠিত চিন্তা এবং জীবনযাপনের নানাবিধ মৌল উপাদান সাহিত্যের প্রাথমিক শর্ত। এই শর্ত পূরণ করে জাতির জীবন জিজ্ঞাসার অন্বেষা ও নান্দনিক বোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ঘটনাসমূহ। অসংখ্য ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার মানুষকে তার অস্তিত্বের মূলটুকু খুঁজে নিতে হয়েছে সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ের শুরু থেকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের বাসিন্দা হিসেবে, যে ভূখণ্ডের রাজধানী ঢাকার জন্ম মোগল শাসকদের হাতে মধ্যযুগে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির হাতে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা নগরী থেকে যার বিকাশ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায়।

একুশের ভাষা আন্দোলনের পর থেকে বাংলা সাহিত্যের শতাব্দীজুড়ে বহমান মূল স্রোত থেকে একটি ভিন্ন ধারা নির্মাণ করে এগিয়ে এসেছে।