kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৪ রবিউস সানি     

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহার

স্বকৃত নোমান

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রযুক্তি গোটা পৃথিবীটাকে বদলে দিয়েছে। পরকে করেছে আপন, দূরকে এনেছে কাছে। আমার বন্ধুটি আমেরিকায় থাকে, না জাপান থাকে, এখন এটা কোনো সমস্যা নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে মুহূর্তেই তার সঙ্গে কথা বলতে পারছি, তার ছবিটি দেখতে পাচ্ছি, তার লেখাটি পড়তে পারছি। শৈশব-কৈশোরের কোনো বন্ধুর সঙ্গে বহুদিন দেখা নেই। হঠাৎ একদিন দেখি ফেসবুকে তার ছবি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হারানো বন্ধুটিকে আবার খুঁজে দিয়েছে। আমি তরুণ লেখক। গল্প-কবিতা লিখি। কিন্তু তরুণ লেখক বলে আমার গল্প-কবিতা কোনো পত্রিকা ছাপতে চায় না। তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমি ফেসবুকে পোস্ট করে দিচ্ছি। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডসংখ্যা পাঁচ হাজার এবং আমাকে ফলো করছে আরো পাঁচ-দশ হাজার। সবার কাছে আমার গল্প-কবিতাটি পৌঁছে যাচ্ছে। তারা আমার লেখায় লাইক দিচ্ছে, কমেন্ট করছে।

খেয়াল করে দেখুন, ওপরে আমার লেখাতেই রয়েছে বেশ কিছু ইংরেজি শব্দ। যেমন—ফেসবুক, পোস্ট, ফ্রেন্ড, ফলো, লাইক, কমেন্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফেসবুক। বর্তমানে প্রায় ১৮৬ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটির কিছু নির্দিষ্ট শব্দ রয়েছে। যেমন উপর্যুক্ত শব্দগুলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব শব্দ আমাদের ব্যবহার করতে হয়। কারণ ফেসবুক আমাদের দেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় না, নিয়ন্ত্রিত হয় অন্য দেশের অন্য ভাষার মানুষদের দিয়ে। আমরা ইচ্ছা করলেই ফেসবুককে অন্য নামে পরিচিত করে তুলতে পারব না। তবু কেউ কেউ ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত এসব ইংরেজি শব্দ বাংলায়নের চেষ্টা করেছেন। যেমন কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকের বাংলা করেছেন, ‘মুখপঞ্জি’। কিন্তু শব্দটা পরিচিতি পায়নি। পাওয়ার কথাও নয়। কারণ ফেসবুক নামটি কর্তৃপক্ষের দেওয়া। সহজে এর বাংলায়ন সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব হয়নি মোবাইলের ক্ষেত্রে। মোবাইলকে অনেকে মুঠোফোন লেখেন। তাতে লাভ হয় না। মানুষ বলার ক্ষেত্রে মোবাইলই বলে থাকে।

যেহেতু উপর্যুক্ত শব্দগুলো ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত, সেহেতু অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব শব্দ আমাদের ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু যখন আমরা ফেসুবকে কিছু লিখি, তখন কর্তৃপক্ষ আমাদের এই শর্ত দেয় না যে তোমাকে ইংরেজিতেই লিখতে হবে, বাংলায় লিখলে তা আমরা গ্রহণ করব না। ইউনিকোড ফন্ট আবিষ্কারের পর আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহজেই বাংলা লিখতে পারছি।

বাংলা লেখার এমন সুবিধা থাকার পরও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার যাচ্ছেতাই ব্যবহার। একটি উদাহরণ দিই। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড পাঁচ হাজার পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কেউ আমাকে বন্ধুত্বের অনুরোধ (ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট) পাঠাতে পারে না। নতুন কাউকে তালিকায় যুক্ত করতে হলে পুরনো কাউকে বাদ দিয়ে করতে হয়। আবার বন্ধু নয় এমন কারো মেসেজ সরাসরি আমার ইনবক্সে আসে না, জমা হয় মেসেজ রিকোয়েস্ট বক্সে। সেদিন এক অপরিচিতজন আমাকে লিখলেন, ‘ব্রো, কেমন আছেন? আমি আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে অ্যাড হতে চাই। প্লিজ! অ্যাড মি।’ দেখুন, এখানে কয়টি ইংরেজি শব্দ। ব্রো, ফ্রেন্ডলিস্ট, অ্যাড, প্লিজ, অ্যাড মি। কথাটি কি এভাবে লেখা যায় না, ‘ভাই, কেমন আছেন? আমি আপনার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হতে চাই। দয়া করে আমাকে যুক্ত করবেন।’ কিন্তু এভাবে লিখবে না, লিখবে বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ি ভাষায়। কে যে তাদের এই জগাখিচুড়ি ভাষাটি শিখিয়েছে কে জানে। এটা তারা ইচ্ছা করেই করে কি না আমার জানা নেই। হয়তো নিজেদের শিক্ষিত ও স্মার্ট প্রমাণ করার জন্য বাংলা ভাষার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে এই জগাখিচুড়ি ভাষায় লেখে। এটি মোটেই উচিত নয়। বাংলা লিখতে কারো অসুবিধা হলে ইংরেজিতে লিখতে পারে। ইংরেজিতে লিখতে অসুবিধা হলে বাংলায় লিখতে পারে। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি বানানো কেন?

এ তো গেল ইংরেজি-বাংলা মেশানো জগাখিচুড়ি ভাষার ব্যবহার। বাংলা ভাষা কি সঠিকভাবে ব্যবহার হয়? হয় না। ফেসবুকে বাংলা শব্দের যথেচ্ছ বিকৃতি দেখা যায়। যেমন—বলছিকে লেখা হয় বলসি, গেছেকে গেসে, খাচ্ছিকে খাইতাসি, যাচ্ছেকে যাইতেসে, মন চায়কে মুঞ্চায়, খারাপকে খ্রাপ, আমরাকে আমড়া বা আম্রাসহ এ রকম অসংখ্য বিকৃত শব্দ চোখে পড়ে। বাংলা শব্দকে এভাবে বিকৃত করে তারা কী আনন্দ পায় তা গবেষণার বিষয়। বিকৃতির বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে উল্টো হুমকি দেয়, ‘এটা আমার ওয়াল। সুশীলগিরি ফলাতে চাইলে নিজের ওয়ালে গিয়া ফলান, আমার এখানে না।’ আরেকটা দল আছে, যারা বলে থাকে, ‘কে কিভাবে কথা বলবে বা লিখবে, তা আপনি ঠিক করে দেওয়ার কে? ভাষা পুলিশিং চলবে না।’ তার মানে কোনো প্রতিবাদও করা যাবে না, কিছু বলা যাবে না, যার যেভাবে ইচ্ছা ভাষাকে বিকৃত করবে।

সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কথা বলে লাভ নেই। সাধারণরা কোনো কিছুর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে না। নির্ধারণ করে বিশেষ মানুষরা। লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শিল্পীরা হচ্ছে বিশেষ মানুষ। সাধারণ মানুষ এদের অনুসরণ-অনুকরণ করে থাকে। এরাই সব কিছুর গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়। ভাষার গতি-প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে লেখকের দায় বেশি। কারণ ভাষা নিয়েই লেখকদের কারবার। কোনো লেখক যখন ফেসবুকে বিকৃত ভাষায় লেখেন, তখন আসলেই কষ্ট লাগে। তাঁর বিকৃত ভাষার লেখাটির মধ্য দিয়ে একুশের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়, ভাষাশহীদরা অপমানিত হন।

পৃথিবীর কয়টা জাতি ভাষার জন্য সংগ্রাম করেছে, প্রাণ উৎসর্গ করেছে? বাংলা তো আমাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষা। এই ভাষাকে যদি আমরা এভাবে দূষিত করতে থাকি, ভবিষ্যতে এই ভাষা তো অন্য ভাষায় বিলীন হয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকিয়ে দেখুন। হিন্দি ও ইংরেজির আগ্রাসনে বাংলা ভাষা সেখানে ধুঁকছে। ওখানকার লেখকরা এখন বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে হবে। রোধ করতে হবে ভাষাদূষণ। এই দায় নিতে হবে আমাদেরকেই।

মন্তব্য