kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

আদালতে বাংলা ভাষা

তানজিম আল ইসলাম

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভাষা আন্দোলনে শহীদ রফিকের মা একদিন ভাষাসৈনিক এবং আইনজীবী গাজীউল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, হাইকোর্টে যে আইন ব্যবসা করেন, এতে বাংলা ভাষার ব্যবহার করেন কি না? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো হাইকোর্টে বা সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ভাষায় আরজি বা জবাব লিখি না, সওয়াল, জবাব করি না।’ এরপর ভাষা শহীদ রফিকের মা রফিজা খানম বলেছিলেন, ‘তাহলে রফিকেরা প্রাণ দিল কেন?’ কথাটি গাজীউল হকের কাছে মৃদু তিরস্কারের মতো মনে হয়েছিল। [উচ্চতর আদালতে বাংলা প্রচলন (২০০৪), গাজীউল হক]। রফিকের মায়ের এ প্রশ্নটি যেন আজও আমাদের কানে মৃদু তিরস্কারের মতোই বাজে। আজ অবধি উচ্চ আদালতে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষা প্রচলন হয়নি। অবশ্য না হওয়ার পেছনে নানা যুক্তি।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলাকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ মতে, সংবিধানই হচ্ছে প্রাধান্যমূলক আইন। এ ছাড়া সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলা পাঠের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সংবিধান হচ্ছে বিশেষ আইন। এবং সংবিধানকেই অন্যান্য আইনের চেয়ে প্রাধান্য দিতে হবে। সংবিধানের উল্লিখিত অনুচ্ছেদগুলো একত্রে বিশ্লেষণ করলে বাংলা ভাষা ব্যবহারকেই প্রাধান্য দিতে হবে। কেননা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। অষ্টম সংশোধনী (আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ) মামলায়ই এ ধারণাটি পাকাপোক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন নামের একটি আইন পাস করা হয় এবং সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনে দ্বিধা তৈরি করেছে ১৯৯১ সালে হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া একটি রায়, যা হাসমতুল্লাহ বনাম আজমিরি বিবি মামলা (৪৪ ডিএলআর ৩৩২) নামেই পরিচিত। এ রায়ে বলা হয়, রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা হলেও বিচার বিভাগের ভাষা বাংলা নয়। মামলাটির বিচার্য বিষয় ছিল, আদালতে ইংরেজি দরখাস্ত বৈধ হবে কি না। এ রায়ে দুটি যুক্তি দেওয়া হয়। বলা হয়, ১৯৮৭ সালের আইনটি একটি সাধারণ আইন, অথচ দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি বিশেষ আইন। এ আইনটির (Non-Obostante Clause) আইনের প্রাধান্যসূচক বিধি না থাকায় কোনো বিশেষ আইন বাতিল করতে পারে না। হাসমতুল্লাহ মামলার রায়ে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রভাষার অর্থ হবে তিনটি। রাষ্ট্রভাষা, অফিসের ভাষা আর আদালতের ভাষা। বলা হয়, আদালতের ভাষা রাষ্ট্রভাষার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। অর্থাৎ আদালত তাঁর নিজের ভাষা নির্ধারণ করতে পারবেন। এর মানে হচ্ছে, আদালতের ভাষা ইংরেজিই হবে, তা-ও কিন্তু বলা হয়নি। এ রায়ের অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজতে গেলে বাংলা ভাষা উচ্চ আদালতে নিষিদ্ধ করা হয়নি। সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক এবং বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়ে এর প্রমাণও দিয়েছেন। দেওয়ানি কার্যবিধির ১৩৭ ধারা আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে একটি বড় বাধা। ১৩৭-এর ১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার অন্যভাবে নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই আইন বলবৎ হওয়ার সময় যে ভাষা হাইকোর্ট বিভাগের অধীনস্থ আদালতের ভাষা ছিল, ওই ভাষাই অনুরূপ আদালতের ভাষা হিসাবে চলিতে থাকিবে।’ বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি থাকাকালে কয়েকজন বিচারককে নিয়ে উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনের বিষয়ে একটি সমীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু বিচারকদের একটি অংশ বাংলা ভাষায় শুনানি ও রায় ঘোষণার বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পরে এ প্রকল্পটি আর বাস্তবায়ন করা যায়নি। আইন কমিশনও আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনে একটি সুপারিশমালা দিয়েছিল। আদালতে যাঁরা বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিরোধিতা করেন, তাঁদের মত হচ্ছে, মামলা রুজু করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন নজির নিতে হলে ইংরেজি বই থেকে নিতেই হয়। এ ছাড়া ইংরেজি ভাষার প্রতিশব্দের অভাব, সাঁটলিপিকার ও মুদ্রণসহকারীর অভাব। এ ছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অনেক রায় বিদেশের আদালতগুলোতে নজির হিসেবেও নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলায় লেখা থাকলে তা আর সম্ভবপর হয়ে উঠবে না।

বিগত কয়েক বছরে উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে, দৈনন্দিন কার্যতালিকা বাংলায় ছাপা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের দাপ্তরিক ভাষা বেশির ভাগ বাংলায়ই হচ্ছে। বিভিন্ন মামলার সমন জারি, রুল জারিসহ বিভিন্ন আদেশও বাংলায় লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। হাইকোর্ট বিভাগের প্রতিটি বেঞ্চেই বাংলায় আইনজীবীরা বাংলায় শুনানি করতে পারছেন। নিম্ন আদালতে আরজি, জবাব এবং রায় বেশির ভাগই বাংলায় দেওয়া হচ্ছে। এ দিক থেকে বিবেচনা করলে আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে অনেকটাই অগ্রগতি হয়েছে বলা যায়।

আদালতে বাংলায় দেওয়া রায় কিংবা অন্যান্য কাগজপত্র ইংরেজিতে অনুবাদের কিংবা ইংরেজিতে দেওয়া রায় বাংলায় অনুবাদের জন্য পৃথক একটি অনুবাদ সেল তৈরি করা যেতে পারে। বাংলা একাডেমির সহায়তায় প্রতিশব্দ বা পরিভাষার কাজটি করা যায় সহজেই। উচ্চ আদালতে বিচারপতিরা রায় বাংলায় না দিলেও রায়ের প্রধান অংশটুকু অন্তত বাংলায় দেওয়ার প্রথা চালু করতে পারেন। অনেক সময় নিম্ন আদালতের অনেক বিচারকও ইংরেজিতে রায় লেখেন। এ ক্ষেত্রেও রায়ের মূল অংশ বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দেওয়ানি কার্যবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধিসহ যেসব আইন এখনো ইংরেজিতে রয়েছে, সেই প্রয়োজনীয় আইনগুলোর একটি অনুমোদিত বাংলা পাঠ প্রকাশে উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।

মন্তব্য