kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার

এমরান কবির

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ডে বাংলা ভাষার ব্যবহারের বিষয়টি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের আওতাভুক্ত। দুঃখজনক সত্য যে ভাষা আন্দোলনের এত বছর পরও আমরা এ ক্ষেত্রে সফল হতে পারিনি; বরং দিনকে দিন বাংলা ভাষা ব্যবহার করার মর্ম আমাদের চেতনা থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ডে ইংরেজির ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে। বাড়ছে মিশ্র ভাষার ব্যবহার; কিন্তু এমনটি যে আইনবিরুদ্ধ তা যেমন এর ব্যবহারকারী জানে না, তেমনি আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও কোনো গরজ নেই। ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নাম্বার প্লেট, সরকারি দপ্তরের নামফলক এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এর ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন প্রণয়ন করা হয়। এ আইনের ২ ও ৩(১) ধারায় বলা আছে—কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে। ৩ ধারায় বলা আছে—কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এ আইন অমান্য করলে তা সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ বলে গণ্য হবে এবং এর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসদাচরণের শাস্তি চাকরিচ্যুতি। এই আইনের অধীনে কোনো সরকারি, অসরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এ আইন মানতে কাউকে বাধ্যও করা হয়নি; এমনকি এ রকম যে একটি আইন আছে সে বিষয়ে কাউকে সজাক করতেও কোনো সরকারকে দেখা যায়নি।

সাইনবোর্ডগুলোতে দেদার ইংরেজি ভাষার ব্যবহার চলছে। সঙ্গে যদি বাংলা ভাষা ব্যবহার করা হয় তা ভুল বানানে ভরা। যে ভাষার জন্য এত প্রাণ বিসর্জন দিতে হলো, এত ত্যাগ-তিতিক্ষা করা হলো তার পরিণাম এ রকম দেখলে কার না খারাপ লাগে; কিন্তু তা চলছেই এবং বেড়েই চলছে। বিল বোর্ড ও ব্যানারেরও একই অবস্থা। গড়ির নাম্বার প্লেট এখনো বাংলা হলো না। সরকারি দপ্তরের নামফলকও যদি ইংরেজি ও মিশ্র ভাষার হয়ে থাকে তাহলে আর বলার কী থাকে! গণমাধ্যমগুলো এতই বিজ্ঞাপনভুক যে মিশ্র কেন, হিব্রু ভাষায়ও যদি কোনো কম্পানি বিজ্ঞাপন দেয় কোনো কর্তন ছাড়াই তারা তা প্রচার করবে। কারণ বিজ্ঞাপন মানেই তো টাকা। তা-ও না হয় হলো, গণমাধ্যমের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও অর্ধেক বাংলা (তা-ও বিকৃত উচ্চারণে এবং ইংরেজি অনুকরণে) অর্ধেক ইংরেজি ব্যবহারের হেতুবাদ কী হতে পারে তা কে বলবে। এসবের মাধ্যমে ভাষার ব্যবহার কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কী অনুশীলন করা হচ্ছে ও করানো হচ্ছে, তা কি অনুষ্ঠানপ্রধানরা ভাবতে পারেন!

ভাবতে পারেন না। ভাবলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতেন। দায়বদ্ধ হতেন নিজের বিবেকের প্রতি। ভাষার চেতনার প্রতি। অথচ অনেক আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলা একাডেমিতে বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা চালু হবে, সে হবে না। ক্ষমতা নিয়েই সর্বস্তরে বাংলা চালু করে দেব। ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন হবে।’ ভাষার প্রতি পাহাড়সমান দরদ না থাকলে এমনটি বলা যায় না।

‘নানান দেশের নানান ভাষা/বিনে স্বদেশি ভাষা/পুরে কি আশা’ রামনিধি গুপ্তের এই কবিতাংশ শুধু আমাদের জন্য নয়। পৃথিবীর সব মাতৃভাষাভাষী মানুষের কাছেই ধ্রুব সত্য; কিন্তু এই ধ্রুব সত্যকে আমরা উপেক্ষা করছি। নিজের মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞা করে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারেনি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কম ইংরেজি জানতেন না; কিন্তু তিনিই তাঁর আমার ছেলেবেলা গ্রন্থে লিখেছিলেন আগে ‘নিজ ভাষার গোড়াপত্তন’।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামার ইনস্টিটিউট অব লেঙ্গুইস্টিকের ভাষ্যমতে, পৃথিবীতে এখন ভাষার সংখ্যা ছয় হাজার ৯০৯টি। এতগুলো ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার অবস্থান দশের ভেতরে। এটা যে কত বড় গৌরবের বিষয়, তা ভাবলেই মন ভরে যায়। আর আমরা কি না সে ভাষাকে উপেক্ষা করছি। ভাবলে গা শিউরে ওঠে যে আমরা উপেক্ষা করছি সেই ভাষাকে যে ভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। পৃথিবীতে আর কোনো উদাহরণ নেই যার।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এবং এখন পৃথিবীর ৭০টি দেশে তা পালন করা হয়। এই ঘোষণা এবং বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষা দিবস পালনের বিষয়টি আমাদের ভাষা আন্দোলনকে একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে।

বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ডে বাংলা ভাষার নির্ভুল ব্যবহার করার মতো জরুরি কাজটি করতে পারে বাংলা একাডেমি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এবং দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা। প্রয়োজনের রাস্তায় নেমে উদাহরণ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এভাবে মানুষকে সচেতন করলে অন্তত বিজ্ঞাপন ও বিলবোর্ডে বাংলা ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারে।

এত সব মন খারাপের মতো বিষয়ের মধ্যে একটি আশার কথা হলো আমাদের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষায় রায় প্রদান শুরু হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এ কাজটি শুরু করেছিলেন হাইকোর্টে বিচারপতি থাকাকালে। ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথম বাংলায় একটি মামলার রায় লেখেন। এরপর প্রায় দুই শ রায় তিনি লেখেন বাংলায়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরও তিনি বাংলায় রায় লেখা অব্যাহত রেখেছিলেন। আর বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন আট হাজার রায় বাংলায় লিখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

মন্তব্য