kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ভাষার ব্যবহার

শামস্ আল্দীন

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। আমাদের সংবিধানের প্রথম অংশের ৪ নাম্বার অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ অর্থাৎ যেদিন থেকে সংবিধান প্রণীত হলো, সেদিন থেকেই আমাদের এই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বর্তমানে বাংলার ব্যবহার সর্বত্রই বেড়েছে। তবে এর বিপরীতে দেখা যায়, উচ্চ আদালতে বাংলা ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। সেখানে দেখানো হয়েছে আইনি পরিভাষার দোহাই। পক্ষান্তরে সম্মানীয় কিছু বিচারপতি বাংলা ভাষায় রায় ঘোষণা করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন, বাংলা ভাষায় রায় দেওয়া সম্ভব। আমরা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখি বাংলা ভাষার প্রয়োগে। অর্থাৎ আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে পারিনি। আমাদের একটা রাষ্ট্রনীতি ও পরিকল্পনা থাকা দরকার, যা স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এসেও হয়নি। আমরা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারিনি আজও, সবই যেন মুখেই রয়ে গেছে। তার পরও আমরা দ্বিধাগ্রস্ত নই। বর্তমানে সেই শঙ্কা কিছুটা হলেও কেটেছে এবং আমরা আশাবাদী যে অচিরেই এ সমস্যার সমাধান ঘটবে। এ লক্ষ্যে বর্তমান সরকার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪৭টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০২টি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা নেই, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চালু করার কথা ঘোষণা দিয়েছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ বিষয়ক কোর্স পড়ানোর জন্যও তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছেন। সে মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কমিটি গঠন করে এবং অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর প্রণীত ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ বিষয়ক গ্রন্থটি এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা খুব শিগিগর হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনা পাব সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কোর্স পড়ানোর। অর্থাৎ এ উদ্যোগই আমাদের আরো অনেক ধাপ এগিয়ে দেবে বাংলা ভাষার ব্যবহারে। এর ফলে অন্যান্য বিষয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি বাংলা ভাষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও অনুরাগ জন্মাবে।

আমরা জানি, ‘সংস্কৃতি’ একটি ‘জাতির’ ও ‘সভ্যতার’ মানদণ্ড। এ সংস্কৃতিচর্চার বাহন হচ্ছে বাংলা ভাষা। এরই মধ্যে সে প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ‘ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি’, ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি’, ‘ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি’ ও ‘ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি’তে ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের’ কোর্স পড়ানো হয়। এ কোর্সগুলো পড়ান দেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যাঁরা খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি সম্প্রতি আটজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে পূর্ণকালীন হিসেবে এ কোর্সটি পড়ানোর জন্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের আয়ের উৎসই শিক্ষার্থীর বেতনের অর্থ। অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার্থীর বেতন অনেক এবং লাভজনক। বাংলা বিষয়ের ক্ষেত্রে সেটা একেবারেই নয়, তার পরও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কথা বিবেচনায় অলাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বাংলা পড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক পক্ষ। আরো আশার কথা যে ‘সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি’, ‘উত্তরা ইউনিভার্সিটি’, ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’, ‘শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি’, ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ইউনিভার্সিটি অব অল্টারনেটিভ’ ও রাজশাহীর ‘নর্থ-বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণাঙ্গ বাংলা বিভাগ আছে।

আমাদের জীবনমান বিবেচনায় শিক্ষায় সংস্কৃতির মানদণ্ডে ভূমিকা রাখছে, বর্তমানে এ কথা অনায়াসে বলতেই পারি। বর্তমানের সময়ধারা রক্ষার্থে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ। এ গুরুত্ব বিবেচনায় অলাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বাংলা বিভাগ এসব প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পড়াশোনা ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য। আমি নিজে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আমার প্রথম কর্মস্থল ছিল উত্তরা ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগ। ফলে ভেতরের কর্মকাণ্ড ও শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আমি অবগত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তিনটি কার্যক্রম চালু আছে—অনার্স, এমএ (দুই বছর) ও এমএ (ফাইনাল)। তিনটি কার্যক্রমে ছাত্র-ছাত্রী নিয়মিত ক্লাস করেন এবং বাঙালি সংস্কৃতির পৌষ, ফাল্গুন, নবান্নসহ নিয়মিত আলোচনাচক্র ও দেয়ালিকার কাজে তাঁরা সম্পৃক্ত। এসব অনুষ্ঠানের অর্থ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও তা সমস্যার কারণ হয়নি।

সর্বোপরি বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও তার প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ফলপ্রসূ গতিতে এগোচ্ছে। আমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাকে নিজস্ব চিন্তার ও ধারণের কেন্দ্রে রাখতে সক্ষম হয়েছি। জীবনের প্রয়োজনে ও আর্থিক সচ্ছলতার তাগিদে অন্যান্য বিষয়ের প্রতি আমাদের যেমন গুরুত্ব আছে, বাংলার ক্ষেত্রে কম—এ কথা বলা যাবে না। বাংলা ভাষা প্রসারের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা অনস্বীকার্য। আমরা আশাবাদী মানুষ। আশায় আমাদের বিশ্বাস ও স্বপ্ন।

মন্তব্য