kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

এই উদাসীনতার দায় আত্মিক নয়, বৈষয়িক

শ্যামল চন্দ্র নাথ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাষ্ট্রের ভাষা এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা যে সব সময় সব ক্ষেত্রে এক হবে এমনটা ভাবা বোকামি বৈকি? বোকামি বৈকি এ জন্য বলছি, আমরা এখন যে সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, সে সময়ে এসে দেখি আমাদের রাষ্ট্রের ভাষা ঠিক বাংলা নয়, অন্য কিছু। অন্য কিছু বলার একমাত্র কারণ, এ ভাষার জন্য আমরা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ পার হয়ে একাত্তরের মধ্য দিয়ে একটি জাতিরাষ্ট্র এবং ভাষার স্বাধীনতা পেয়েছি, যা আমরা একেবারেই কাজে লাগাতে পারিনি। আমরা হয়ে গেছি উদাসীন। এই উদাসীনতার দায় শুধু আত্মিক নয়, বৈষয়িক কিংবা বস্তুগতও আমরা বলতে পারি। আমাদের রাষ্ট্রের লোকেরা, কর্তাব্যক্তিরা যে বাংলা চর্চা করেন, অথবা তাঁরা বাংলার পক্ষের লোক, তাও কিন্তু নয়। এর ফলে যেটি দাঁড়িয়েছে, এই সময়ে এসেও আমাদের ভাষার জন্য আফসোস করা, আত্মগ্লানিতে ভোগা, যা-ই বলি না কেন তলে তলে আমরা বেশির ভাগই ইংরেজির কাছে দাসত্ব মেনে নিয়েছি। আমাদের রাষ্ট্রের নিজস্ব যে ভাষা, সেটা যে সর্বত্র বাংলাই হবে সে ধারণা বোধ হয় কোনো অতীব আশাবাদী মানুষও আর বিশ্বাস করবে না। আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন উর্দুবিরোধী ছিল, কিন্তু ইংরেজবিরোধী ছিল কি না তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। কিন্তু সেটা ইংরেজিবিরোধী হওয়াও উচিত ছিল। কেননা, আমাদের আন্দোলন ছিল বাঙালি তথা আমরা নিজেরা নিজেদের পায়েই দাঁড়াব। বাংলাভাষার মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ, ইহজাগতিক এবং একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ব। কিন্তু হায় অবশেষে আমরা এখন কী পেলাম? আমাদের প্রতিনিয়ত শ্রেণিসংগ্রাম করতে হচ্ছে, ধর্মের সংগ্রাম করতে হচ্ছে, করতে হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম। যে সংগ্রাম আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, তা আবার নতুন করে করতে হবে এমন আশা বোধ হয় কেউ করেননি। অন্যদিকে এই দেশে, এই ভূখণ্ডে উচ্চশিক্ষায় বাংলাভাষা চালু করার কথা ছিল তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে চাই রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার পর ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র, প্রাবন্ধিক ও ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক আমাদের ডাক্তারদের জন্য বাংলায় তাঁদের এমবিবিএস কোর্সের বইগুলো অনুবাদ করে চিকিৎসাশাস্ত্রে বাংলাভাষার প্রচলন করাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি কি সফল হয়েছেন? না, হননি? কারণ, তাঁরা তা আর তাঁদের পাতে তোলেননি। কিন্তু সমগ্র বিশ্বে বাংলাভাষীর সংখ্যা বিপুল ও বিচিত্র। এই ভাষায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা মোটেই অসম্ভব ছিল না। এবার আসি আমাদের গণমাধ্যম, আমাদের নাটক, মঞ্চনাটকে যথেচ্ছ বাংলার ব্যবহারের কথা নিয়ে। গণমাধ্যম বলতে যা বুঝি, তা হলো টেলিভিশন। এই টেলিভিশন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে। এবং সর্বত্রই তা শাসক শ্রেণির ভাষায় রূপান্তরিত হয়। সেটি সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই। যখন ভাষার ভুল ব্যবহার, ভুল উচ্চারণ দেখি, তখন খুবই ব্যথিত হই। কারণ, সালাম, জব্বার, রফিক, বরকতের রক্ত বৃথা চলে যাচ্ছে। যদিও একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই কিংবা এই মাস এলেই শুধু আমাদের চৈতন্য জেগে ওঠে ভাষার অবদমনের কথা। পুরো বছর আমরা কোথায় যেন, কোন গর্তে লুকিয়ে থাকি। এভাবে ভালোবাসা হয় না। নিজের কাছে সৎ থাকা হয় না। নিজের কাছে সৎ না থাকলে কিভাবে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে গড়ে তুলব নিজস্ব মন ও মননে? নতুন প্রজন্ম টেলিভিশনকে অনুকরণ করে, উচ্চারণ থেকে শুরু করে বলার ভঙ্গি পর্যন্ত। মাতৃভাষা পাওয়াটা ছিল আমাদের জন্য ত্যাগের, কিন্তু তার উন্নয়নের জন্য আমরা কিই বা করতে পেরেছি? শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, তা পারে না ভালোভাবে করতে। পারে সামগ্রিক বোধ, উত্তুঙ্গমানের ভাষা চর্চা এবং সর্বত্র বাংলাভাষার ব্যবহার। আমরা ভাষাটিকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যেতে পারিনি। এর দায় বোধ হয় আমার আপনার সবার। আমি যখন নাগরিক নাট্যাঙ্গন ইনস্টিটিউট অব ড্রামার হয়ে মঞ্চনাটকে কাজ করতে গিয়েছিলাম তখন তাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন ভাষার ব্যবহার এবং প্রমিত উচ্চারণ। এর জন্য ড. ইনামুল হক এবং লাকী ইনামের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিন্তু মঞ্চনাটকেও অনেক মঞ্চের কর্মীদের দেখেছি তাঁরা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতন নন। আর টেলিভিশন নাটক কিংবা রেডিওতে বাংলা ভাষার ব্যবহার তো যথেষ্ট নিম্নমানের এবং অপমানজনকও। নাটকে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার থাকতে পারে, কিন্তু তাও দেখি হাস্যরসাত্মক ও ভুল উচ্চারণের। নাটকের যে সৃজন হওয়ার কথা ছিল, তা এখন জ্ঞানের উদ্রেক না করে শুধু সস্তা সুড়সুড়ি দেওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে আমরা বিকৃত ভাষায় বিজ্ঞাপনও দেখতে পাই। কিন্তু আমাদের মননে, চিন্তায় এবং কাজকর্মে আমরা আমাদের মায়ের ভাষাকে শুধু বস্তুগত অর্থে নয়, চৈতন্যের মধ্যে প্রবাহিত করতে কি পেরেছি? না, পারিনি। পারলে আমাদের চিন্তার সৃষ্টির বিস্তার এ পর্যায়ে এসে মুখ থুবড়ে পড়ত না। আমরা সবচেয়ে খারাপ যা দেখছি, এখন তা হলো সর্বত্র বিকৃত বাংলার সঙ্গে ইংরেজির সংমিশ্রণ। আর আমরা ভাবছি আমরা স্মার্ট হচ্ছি। বিষয়টা তা নয়, স্মার্ট হওয়া মানে নিজের মাতৃভাষাকে অবদমিত করা, অসম্মান করা নয়। অপরদিকে টেলিভিশনে আমরা যেটা দেখছি, নাটকের ক্ষেত্রে সেটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে সস্তা বিনোদন দেওয়ার নিমিত্তে। আর রেডিওর কথা নাই বা বললাম, এফএম রেডিওগুলোতে তো ওরা বাংলাটাই ঠিকমতো বলতে পারে না। বাংলা নাটকের পাশাপাশি সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার। তাই আমি মনে করি আমাদের সবার কথা বলা দরকার, কথা বললেই শুধু হবে না। তা শুরু হতে হবে প্রতিষ্ঠান থেকে, রাষ্ট্রের মালিকানা যাঁদের কাছে আছে, তাঁদের কাছ থেকে এবং সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।  একই সঙ্গে সেটা হতে হবে কার্যকরী এবং প্রমাণ হবে কাজের মধ্য দিয়ে, ফাঁকা বুলি আউড়িয়ে নয়। তাহলেই শুধু আমরা পাব সর্বত্র বাংলাভাষার ব্যবহার।

মন্তব্য