kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বাংলা ভাষার বিপদ ও করণীয়

ড. মো. সাহেদুজ্জামান

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পার্থিব আর সব কিছুর মতোই ভাষাও জন্ম-মৃত্যুর প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন। তত্ত্বগতভাবে কোনো ভাষাই তাই অমর নয়। তবে আর সব কিছুর মতোই ভাষারও অকালমৃত্যু হতে পারে এবং তা হতে পারে সেই সব মানুষের কারণেই, যারা সেই ভাষায় কথা বলে। আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ-সবল একটা ভাষাও ভেতরে ভেতরে আসন্ন মৃত্যু কিংবা কঠিন রুগ্ণতার কারণগুলো বহন করতে পারে।

মরণশীল জীবজগতের মতোই ভাষার নাজুক অস্তিত্বের ব্যাপারটি স্পষ্ট করতে কিছু উপাত্ত তুলে ধরা যায়। টঘঊঝঈঙ অফ ঐড়প ঊীঢ়বত্ঃ ত্ড়েঁঢ় ড়হ ঊহফধহমবত্বফ খধহমঁধমবং ২০০৩ সালের মার্চ মাসে UNESCO Ad Hoc Expert Group on Endangered Languages-এর কাছে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল তাতে উদ্ধৃত পরিসংখ্যান আমি প্রায় আক্ষরিকভাবে নিচে অনুবাদ করে দিচ্ছি :

সারা পৃথিবীর প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ মাত্র ৪ শতাংশ ভাষায় কথা বলে। অন্যদিকে, সারা পৃথিবীর প্রায় ৯৬ শতাংশ ভাষায় মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ কথা বলে।...পৃথিবীর ছয় হাজারের মতো ভাষার প্রায় ৫০ শতাংশ ভাষী (speaker) হারাচ্ছে। একুশ শতকের শেষ নাগাদ পৃথিবীর বেশির ভাগ এলাকায় ৯০ শতাংশ ভাষাই অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাবান ভাষাগুলোর অধিকারে চলে যেতে পারে।

যতটা না আতঙ্ক, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়ের কথা এই যে, বাংলার মতো পৃথিবীর প্রধান একটি ভাষার মধ্যে আসন্ন মৃত্যু না হোক, রুগ্ণতার লক্ষণগুলো দিনে দিনে আরো বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে আশঙ্কা জাগে, বাংলাও কি ওই ৯০ শতাংশ ভাষার একটি হয়ে উঠবে? আশঙ্কার কারণগুলো কিন্তু অমূলক কিংবা আবেগসঞ্জাত নয়। আসুন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে ফেলে বাংলা ভাষার অবস্থাটা একটু দেখে নিই।

ওপরে যে প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়েছি সেই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে : ভাষার বিপন্নতা বহির্গত ও অন্তর্গত—দুই কারণে হতে পারে। বহির্গত কারণগুলোর মধ্যে আছে সামরিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক অথবা শিক্ষাগত আধিপত্য। আমরা সবাই জানি, এই কারণগুলোর বেশির ভাগই বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল ছিল। সামরিক ও ধর্মীয় (কিংবা ধর্মের নামে সামরিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত) আধিপত্যের অভিজ্ঞতা তো বাংলাদেশের মানুষের তথা বাংলা ভাষার জন্য আর কোনো জাতিকে জীবন দিতে হয়নি। (বলাবাহুল্য, সেই অভিজ্ঞতার সদর্থক পরিণতিই—শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—আজকের এই ক্ষুদ্র রচনার উপলক্ষ)। আশঙ্কা থেকেই যায়, যে প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাৎপদ মনস্তত্ত্ব ও দুরভিসন্ধি আরবি হরফে বাংলা লেখার পরিকল্পনা কিংবা তথাকথিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর জন্ম দিয়েছিল সেই মনস্তত্ত্ব কি আজও সক্রিয়?

এরই উল্টো দিকে আছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত আধিপত্য—বিশেষত হিন্দি আর ইংরেজি ভাষার। এই বিনোদন বিপণনের স্বর্ণযুগে টেলিভিশনের ‘সিরিয়াল’, বোম্বাইয়া (নাকি মুম্বাইয়া) সংস্কৃতি, এফএম রেডিওর অদ্ভুতুড়ে বাংলা—এসবের পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

কিন্তু কোন মনস্তত্ত্ব এভাবে বারবার, যুগে যুগে নিজেকে অস্বীকার করার পেছনে কাজ করে? বিশেষ করে যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দেয়, কোনো দ্বৈত অস্তিত্ব তাকে সেই ভাষার প্রতিই বিদ্বিষ্ট করে তোলে। আমি ‘বিদ্বেষ’ কথাটিই ব্যবহার করছি, সচেতনভাবেই। বাংলা ভাষার ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে এই বিদ্বেষের বহু রূপ আমি দেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে পড়াটাই তো অপরাধ—দারিদ্র্যের মতোই অপরাধ; বাংলা বিষয়ের শিক্ষকতাও তাই—অন্তত অনেক বিজ্ঞান ও ইংরেজি পড়ুয়া বিদ্বজ্জনের কাছে। বাংলায় এতগুলো ‘ন’ (ণ-সহ), ‘র’ (ড, ঢ়-সহ) আর ‘স’ (শ, ষ-সহ) কেন, হ্রস্ব-উকার আর দীর্ঘ উ-কার নিয়ে এত কচকচানির দরকার কীন্এসব প্রশ্নে এতবার এমন প্রবলভাবে আক্রান্ত হয়েছি যে একেকবার মনে হয় এসব দুর্ঘটনা বোধ হয় আমার কারণেই ঘটেছে! দৈনন্দিন জীবনের ভাষা ব্যবহারে, শ্রেণি-পেশা-শিক্ষা-নির্বিশেষে ভাষামিশ্রণ তো আশঙ্কাজনকভাবে প্রবল; দিন দিন প্রবলতর হয়ে উঠছে। দোকানপাটের ইংরেজি-বাংলা খিচুড়ি নামফলক (নাকি ‘সাইনবোর্ড’) তো কিছুতেই সরানো গেল না।

বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা। তবে এই লক্ষ্য তখনই পূরণ হবে, যখন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি এবং কার্যক্রমের সঙ্গে একাত্ম হবে। বাংলা ভাষার প্রতি বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি, যা এই নিবন্ধের শুরুতেই আলোচিত হয়েছে। বস্তুত এই অনুঘটকটিই (factor) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশয়ের প্রধান কারণ। এর সমাধান পেতে হবে ভাষা নিয়ে আমাদের গৌরবময় ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে। আর সেই আবেগের সঙ্গে থাকতে হবে বাস্তব, যৌক্তিক ও সক্ষম প্রচেষ্টা ও চর্চা।

বাংলা এখনো বিপন্ন ভাষা নয় বলে এর জরুরি প্রয়োজন এখনো হয়নি। সার্বিকভাবে বাংলা ভাষা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যায়তনিক গবেষণা, বিশেষত বাংলাদেশে একান্তই সীমিত। যেমনটা দেখতে পাচ্ছি, বাংলা ভাষার বিপন্নতার আশু আশঙ্কা না থাকলেও তার ভেতরে সেই বিপন্নতার বীজ রয়েছে। এই বীজকে আমাদের ধ্বংস করতে হবে অঙ্কুরোদ্গমের আগেই।

মন্তব্য