kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

অনুষ্ঠান উপস্থাপনা

দুই নৌকায় পা

রুদ্র আরিফ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দেশে টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর সংখ্যা নেহাত কম নয়। আর সেগুলোতে নিয়মিতই প্রচার হতে থাকে নানা অনুষ্ঠান। উপস্থাপনায় যাঁরা থাকেন, সহজ বাংলায় তাঁদের অনুষ্ঠান উপস্থাপক বলে ডাকা গেলেও, এই নতুন সহস্রাব্দে, বিশ্বায়নের বাতাসে যথাক্রমে ভিজে (ভিডিও জকি) ও আরজে (রেডিও জকি) নামেই তাঁরা অধিক পরিচিত। যে পরিচয় কাঙ্ক্ষিত দর্শক ও শ্রোতার কাছে অপেক্ষাকৃত অধিক বোধগম্য, সেটি ব্যবহার করা বোধ করি দোষের নয়। দোষের নয়—সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, তরতাজা নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে চেয়ে তাঁদের আধুনিক উপস্থাপনা-ঢঙও। কেননা সময় তো চিরকাল প্রবাহমান। আর সেই প্রবাহেই ক্রমপরিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায় মানবসমাজ। ফলে ভিজে ও আরজের ভাষা-ভঙ্গিমায়ও সময়ের স্বরের ঘটে প্রকাশ। কিন্তু এ জায়গাটি নিয়েই আপত্তি অনেকের। দুর্ভাগ্যক্রমে আরো অনেক কিছুর মতোই এ বেলায়ও স্পষ্টত দুই পরস্পর বিপরীত ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে দর্শক-শ্রোতা। এক দল ভাবে, শিকড়চ্ছিন্ন একটি অন্তঃসারশূন্য প্রজন্ম তৈরি করার অপচেষ্টায় সামনে থেকে মত্ত এসব ভিজে-আরজে; অন্য দল ভাবে, এই সমালোচকের দল নেহাতই প্রাচীনপন্থী! মোটা দাগে পরস্পর পরস্পরকে খারিজ করে দেওয়ার একটা প্রবণতা আরো অনেক কিছুর মতোই অনুষ্ঠান উপস্থাপনাকে ঘিরেও সদা প্রতীয়মান।

ধরা যাক, প্রথম দলের কথাই ঠিক। একটি জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তো হাজার বছরের। এ ভূখণ্ডের আলো-হাওয়ায়, এই জনপদের মানুষের সুদীর্ঘকালের পরিচর্যার ভেতর দিয়ে বিন্দু বিন্দু বালুকণার মতোই গড়ে উঠেছে এর সংস্কৃতি। আর পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে ভাষা যেহেতু পালন করে সেতুর ভূমিকা, ফলে নিজের ভাষার বিশুদ্ধ চর্চার দাবি জানানো মোটেও অমূলক নয়। তা ছাড়া মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার যে বিরল ও গৌরবের ইতিহাস রয়েছে আমাদের, সেদিকে নজর রেখে এর কোনো রকম অমর্যাদা কোনো যুক্তিতেই সমর্থন নিশ্চয়ই করা যায় না? তাহলে এ সময়ের বেশির ভাগ অনুষ্ঠান উপস্থাপকের হলোটা কী? কেন তাঁরা যতটা সম্ভব ভিনদেশি ভাষা, বিশেষত ইংরেজি জুড়ে দেন কথায় কথায়? আর বাংলাটাও ঠিকঠাক বলতে পারেন না? এই যে ইংরেজি জুড়ে দেওয়া, এই যে ঠিকঠাক বাংলা বলতে না পারা—এ নিয়ে বেশির ভাগ টেলিভিশন ও রেডিও কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ফলে এসব দেখেশুনে কোনো ভাষা ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ যদি কবি আব্দুল হাকিমের পঙক্তির কাছে হাত পেতে উচ্চারণ করেন—‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’, এর সদুত্তর দেওয়া দুরূহই বটে। আবার ধরা যাক, দ্বিতীয় দলটির কথাই ঠিক। যেহেতু ভাষা চিরন্তন পরিবর্তনশীল, সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত খাপ খাইয়ে নেওয়া নতুন প্রজন্মের জন্য অর্থবহ, ফলে ভিনদেশি ভাষার সঙ্গে দেশি ভাষার সংমিশ্রণ এবং মাতৃভাষার ভিন্ন ভিন্ন বা অনেকটা বিদেশি ঢঙে উচ্চারণকে ছাড় তো দেওয়াই যায়! আব্দুল হাকিমের পঙক্তিগুলোকেই যদি উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়, ষোড়শ শতকের এ কবির ব্যবহার করা বাংলা ভাষাটি এই একুশ শতকের বাংলা থেকে স্পষ্টতই আলাদা।

এ রকম অসংখ্য যুক্তি-খোঁড়া যুক্তি হাজির করা সম্ভব অনুষ্ঠান উপস্থাপনার অতি সাম্প্রতিক ভাষাভঙ্গির পক্ষে ও বিপক্ষে। তবু যেহেতু সুনিপুণ কারিগর না হলে ভাঙা-গড়ার খেলা শিল্প না হয়ে বস্তুত জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়, ফলে নিজ ভাষা তো বটেই, প্রয়োগের প্রয়োজনে ভিনদেশি ভাষাও যদি ঠিকঠাক জানা না থাকে, আধুনিকতা কিংবা সময়ের চাহিদার দোহাইয়ে ব্যবহৃত ভাষা ও ভাষাভঙ্গি যে স্পষ্টতই বিকৃতি হয়ে উঠবে—সেই উদাহরণের প্রাবল্য টেলিভিশন ও রেডিও অনুষ্ঠানগুলোতে ভুরি ভুরি ছড়ানো রয়েছে। এর ঠিক মাঝখানে পড়ে যাওয়া সাধারণ দর্শক ও শ্রোতার দুই পা রয়েছে দুই নৌকায়—এক নৌকার মুখ থমথমে প্রাচীন পন্থার, আরেক নৌকা বিকৃতিবাদী কথিত আধুনিকতার। আর নৌকা দুটির নিচে প্রবল স্রোতে বহমান যে নদী, তাকে আমরা ‘সময়’ হিসেবে যদি ধরে নিই, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না! কেননা এর পরিণাম নিশ্চিত সলীল সমাধি। এ থেকে বাঁচতে চাইলে আধুনিকতাকে যেমন অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি সমর্থন দেওয়া যাবে না কোনো বিকৃতিকে। ভাষা ও সংস্কৃতির বিকৃতিতে তো নয়ই।

মন্তব্য