kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ভাষার বোধন

মেহেদী উল্লাহ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার’ নিয়ে স্বল্প পরিসরে বা অল্প সময়ে আলোচনা মোটেও সোজা কাজ নয়। পুরনো ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও পুনর্গঠন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যায়তনিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাংলার কথ্য ও লেখ্য রূপের চর্চা, বিভাগ ও ছাত্রাবাসে কথ্যরূপের ভিন্নতা, বিদ্যায়তনে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ভাষাকাঠামোসহ নানা পর্যায়ে বাংলা ভাষার উপযোগিতা বিচিত্র। সে কারণেই আলোচনার ডালপালা নানাভাবেই বিস্তৃত করা সম্ভব। তা না করে বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষার ব্যবহারের মোটাদাগের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলাই এখানে শ্রেয়।

পুরনো চারটি বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; এগুলোর বয়স, অবস্থান, অবকাঠামোগত দিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে যে ধরনের বাংলা ভাষার প্রয়োগ ও পুনর্গঠন প্রাপ্ত হয়েছে, সে দিক থেকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রই লক্ষণীয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে দেখেছি, এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গড়ে উঠেছে কথ্য বাংলার ভিন্ন ভাষারীতি, যাকে বলা হয় ‘ল্যাঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ অর্থাৎ ৬৪ জেলার শিক্ষার্থী সমাগমের কারণে একটি মিশ্র ভাষা তৈরি হয়েছে এখানে। যে ভাষারীতির সঙ্গে অন্য কোনো পুরনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষার সাদৃশ্য নেই। একই সঙ্গে এই অমিল প্রমিত বাংলার সঙ্গে তো অবশ্যই। পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক, বিদ্যায়তনিক পরিসরে শ্রেণি ও পরীক্ষায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলার ব্যবহার দেখা গেলেও হলে কিংবা বিভাগ-অনুষদের বাইরে শিক্ষার্থীরা কথা বলায় প্রমিত বাংলা প্রাধান্য দেয় না। এবার আসা যাক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। যেমন ধরা যাক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় বা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। এ ধরনের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসা ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের। অর্থাৎ কুমিল্লা বা বরিশালের আশপাশের জেলাগুলো থেকে আগতই বেশি। কোন জেলার শিক্ষার্থী কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি বা কম, তা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। বরং বলতে চাচ্ছি, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মিশ্র ভাষা তৈরির সম্ভাবনা কম। যেহেতু আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীই বেশি, কাজেই এসব ক্যাম্পাসে ডায়ালেক্ট বা উপভাষাই প্রচলিত বা ব্যবহৃত। কখনো কখনো উপভাষা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চিত প্রমিত বাংলাকেও প্রভাবিত করে। যেমন—ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সময় পর্যন্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহের শিক্ষার্থীই বেশি ভর্তি হতো। তাতে অসুবিধা নেই, মেধাবী মেধাবীই, সে যে জেলারই হোক। শিক্ষক হিসেবে কয়েক বছর আগেও আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, পরীক্ষার খাতায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে ‘তোমার’ শব্দটিকে ‘তুমার’, ‘চোর’ শব্দটিকে ‘চুর’, ‘শোক’কে ‘শুক’ লিখতে দেখেছি। এর কারণ হচ্ছে, ময়মনসিংহ অঞ্চলের কথ্যরীতিতে ও-কারকে উ-কার উচ্চারণ করা হয়। সেই কথ্যরীতির প্রভাব এসে পড়েছে লেখ্যরীতিতে। পাল্টে দিয়েছে প্রমিত বা মান বাংলাকেই। যেহেতু এই শব্দগুলো একটি অঞ্চলে ব্যবহৃত বাংলা ভাষারই রূপ, ফলে একে ভাষাবিকৃতি কোনোমতেই বলা যাবে না, বরং একে বলা ভালো কথ্যরীতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ। ময়মনসিংহে এসে বাংলা ভাষার অভিধানে ‘তোমার’ যা, ‘তুমার’ও তা। একে শব্দবৈচিত্র্য ধরে ভাষার সম্ভাবনা হিসেবেই চিহ্নিত করি আমি। কেউ ‘চোর’ না লিখে ‘চুর’ লিখলে নম্বর কাটি না। অভিধানে একটি নতুন শব্দরূপের আবির্ভাব সাধারণ কথা নয়। অন্যদিকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক নথিতে বাংলা শব্দের ভুল বানানের প্রয়োগ নিত্য-সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনও হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে আমি চিঠি নির্দিষ্ট দপ্তরে ফেরত পাঠিয়েছি গ্রহণ না করে। অনুরোধ করেছি, বানান ঠিক করে আবার পাঠাতে। যা-ই হোক, বাংলা ভাষার প্রতি এমন দরদের মূল্য অবশ্যই আমি বা আমাদের পরিশোধ করতে হয় কারো না কারো রোষানলে পড়ে। অনেকেই ব্যাপারটিকে ভালোভাবে নেন না। বানান ভুল একটি অন্যায়, তাঁরা মানতে নারাজ। মনে রাখতে হবে, শব্দের প্রয়োগের ফলে পরিবর্তন আর ইচ্ছা করে বানান ভুল করা এক জিনিস নয়। ‘হসপিটাল’ মুখে মুখে উচ্চারণের কারণে স্বাভাবিক উপায়ে হাসপাতাল শব্দরূপ লাভ করেছে। এটি অবশ্যই বিকৃতি নয়। এক ধরনের বাংলায়ন।

কোনো কোনো বিভাগ বাংলা মাধ্যমে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রাখলেও শ্রেণি-বক্তৃতা, বইপত্র ও প্রাসঙ্গিক গবেষণাকর্ম ইংরেজিতে থাকায় বাংলার চেয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পরীক্ষা দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে শিক্ষার্থীরা। এই প্রবণতা ইংরেজি ভাষায় গবেষণা সম্পন্ন করার বেলায়ও চোখে পড়ে, একই কারণে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা বিভাগ থাকলেও বিভিন্ন সময়ই ভুল বাক্য ও বানানের ছড়াছড়ি থাকে অনেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পোস্টার-ব্যানার, একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে; সে ক্ষেত্রে বাংলা বিভাগের সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে উদাসীনতার অভিযোগ প্রায়ই চোখে পড়ে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় পাঠদানের ব্যবস্থা থাকলেও প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ে বাংলার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কোনো বিভাগে বাংলায় হলে খুব একটা অসুবিধা বোধ হবে না—এমন পাঠক্রমও প্রণীত হচ্ছে ইংরেজিতে। কোনো কোনো বিভাগের প্রশ্নপত্র বাংলায় হলেও সঙ্গে বন্ধনীতে শোভা পায় ইংরেজি অনুবাদ। কিন্তু প্রশ্নপত্র ইংরেজিতে প্রণীত হলে কখনোই বন্ধনীতে বাংলা শোভা পায় না। এই মানসিকতা অবশ্যই ঔপনিবেশিক। বিভিন্ন প্রশাসনিক পদের বাংলায়ন আজও সম্ভব হয়নি। যেমন—প্রক্টর, ডিন, রেজিস্ট্রার। উল্টো যেসব পদের প্রচলিত বাংলা শব্দ আছে, সেগুলো ব্যবহার না করে আমরা বলতে ভালোবাসি ভাইস চ্যান্সেলর (উপাচার্য), প্রফেসর (অধ্যাপক), ট্রেজারার (কোষাধ্যক্ষ), ডিপার্টমেন্ট (বিভাগ), ফ্যাকাল্টি (অনুষদ), রেজাল্ট (ফল) ইত্যাদি। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনা আজও আমরা গ্রহণ করে চলেছি। ভিন ভাষার রাজনীতি আর সাংস্কৃতিক আধিপত্যে বাংলা বিষণ্ন। আমরা তৈরি করতে পারিনি বিদ্যায়তনিক পরিভাষা। অথবা থাকলেও নিজেরাই সচেতনভাবে ব্যবহার করছি না। এ ক্ষেত্রে আমাদের যুক্তিও তৈরি থাকে, ‘বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বেশির ভাগ শব্দই বিদেশি। খাঁটি বাংলা শব্দ হাতে গোনা। এভাবেই ভাষা প্রাণ পায়, এক ভাষার শব্দ আরেক ভাষায় মিশে আত্মীয়তা করে। বিদেশি শব্দ (আরবি, ফারসি, চীনা, পর্তুগিজ ইত্যাদি) বাদ দিলে এখানকার মানুষের কথা বলাই বন্ধ হয়ে যাবে।’ তা সত্ত্বেও পাবলিক ভার্সিটি, ক্যাম্পাস, ক্যারিয়ার, সেশন-জ্যাম, একাডেমি, সিলেবাস, সেমিস্টার, সাপ্লিমেন্ট, প্রপ, ক্লাস, ভাইভা, ট্যুর, শিডিউল, রিহার্সাল, ডিউটি, রুটিন, মিটিং, লাউঞ্জ, কোয়ার্টার, বিল্ডিং, ল্যাব, ওয়াশরুম, ডায়েরি, লাইব্রেরি, সেমিনার, ট্রান্সপোর্ট, ভ্যাকেশন, প্ল্যানিং, কমিটি, মেডিক্যাল, রেজিস্ট্রার অফিস, প্রক্টর অফিস, পোস্ট-অফিস, ভিসি-বাংলো ইত্যাদি শব্দ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ‘বাংলা’ বলতে দিচ্ছে না!

মন্তব্য