kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

জাতীয় রূপান্তর ও মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা

ফিরোজ আহমেদ

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জাতীয় রূপান্তর ও মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা

চিনুয়া আচেবে তাঁর ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসটি কোনো আফ্রিকান ভাষায় অনুবাদের অনুমতি দেননি; তাঁর বিশ্বাস ছিল ইংরেজি বা ফরাসির মতো ‘অগ্রসর’ ভাষাকেই হতে হবে আফ্রিকায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। ১৯৮১ সালে তিনি জাপান গিয়ে রীতিমতো ধাক্কা খেলেন, সেখানকার সবাই দিব্যি জাপানি ভাষায় দর্শন, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা আর সব উচ্চতর বিদ্যাচর্চা করছে। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে ওয়াজেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক কিনিচিরো তোবা বললেন, কিভাবে বিষয়টা সম্ভব হলো : ‘আমার দাদা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮৮০ দশকের শুরুর দিককার স্নাতক। তাঁর খেরোখাতা ভর্তি ছিল ইংরেজিতে। আমার পিতা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯২০-এর দশকের স্নাতক, আর তাঁর খেরোখাতার আধাআধি ছিল ইংরেজিতে, বাকি আধখানা জাপানি ভাষায়। এক প্রজন্ম পর আমি যখন স্নাতক হই, আমার সবটা টোকাটুকি হয়েছিল জাপানি ভাষায়। এভাবে আমাদের নিজেদের ভাষার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতাকে পুরোটা আত্মস্থ করতে লেগেছিল তিনটি প্রজন্ম।’

আসলে এই সারসংকলনটুকুর মধ্যেই আছে সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কিভাবে নতুন নতুন ভাষায় জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে তার মর্মবস্তুটুকু। শর্ত একটাই, নতুন ভাষাটিতে যাঁরা কথা বলেন, উচ্চতর জ্ঞানে তাঁদের আগ্রহ আর প্রয়োজন থাকতে হবে।

দুই.

বিশ্বজ্ঞানকে মাতৃভাষায় রূপান্তরের মধ্য দিয়েই দেশে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে, এর ব্যতিক্রম হলে উচ্চশিক্ষা শুধু পরিণত হয়েছে দেশীয় অভিজাতদের বৈশ্বিক অভিজাতের সঙ্গে গা ঘষাঘষির খাতির জমানো আর দেশের আমজনতার ওপর ক্ষমতার ছড়ি ঘোরাবার মাধ্যম। সত্যেন বোস এই বিষয়টা খেয়াল করেছিলেন ভারত আর চীনের পার্থক্যের মধ্যে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির রূপান্তরে চীন সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেছিলেন ভারত (একই যুক্তিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) পারবে না, কারণ তখনো অনগ্রসর চীন মাতৃভাষায় দুনিয়াটাকে নিয়ে এসেছে প্রাণপণ শক্তিতে, ভারত জাতিসমূহের মাতৃভাষাকে উচ্চশিক্ষায় উপেক্ষা করেছে।

প্রথম অভিজ্ঞতায় চীনের দুর্দশায় মায়া আর করুণাই জেগেছিল বোসের, ১৯৪৪ সালের এক ঘটনার স্মৃতিচারণা করছিলেন তিনি। চীনে তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আর জাপানি দখলদারির করাল থাবা। বিশ্বযুদ্ধও চলছে। খাদ্যের অভাবে চীনা শিশুদের বিপর্যস্ত দশা। মন্বন্তর আমাদের দেশেও। তখন সত্যেন বোসের এক ছাত্র সালফোনামাইড নিয়ে নানা গবেষণায় ব্যস্ত। ওদিকে জৈব রসায়নের গবেষণাকেন্দ্রে ডা. কালীপদ বসু নানা প্রকার চাল ও অন্য খাদ্যদ্রব্যের বিশ্লেষণ করে চলেছেন...সেই সময়ে খবর এলো চীন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জৈব রসায়নে অভিজ্ঞ পর্যটক এসেছেন ভারত ভ্রমণে। দক্ষিণ আফ্রিকায় তিনি শিখে এসেছেন মাছের তেল থেকে ও লাল চাল থেকে নানা খাদ্যপ্রাণ সংগ্রহের উপায়; রাজপুতনা, বোম্বাই, পাঞ্জাব, দিল্লি বেড়ানো শেষ হলো, সব শেষে পূর্বপ্রান্তের শহর ঢাকায় তিনি উপস্থিত হলেন।

বোস আরো জানাচ্ছেন, চীন দেশে আধুনিক রসায়নের তখন সবে পত্তন হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে, যন্ত্রপাতি কিংবা ওষুধপত্র সব আসছে বিদেশ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজেই সালফোনামাইড ও তার নানা যৌগিকের প্রস্তুতি চলছে শুনে চীনা বিজ্ঞানী চ্যাঙের প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায় না! তারপর আমাদের নিমন্ত্রণে এসে স্বচক্ষে প্রক্রিয়ার সব ধাপ অতিক্রম করে শুদ্ধবস্তুতে উপনীত হতে দেখলেন। এই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের পরিবর্তে আমরা চাইলাম তাঁর কাছে সয়াবিন থেকে কিভাবে চীন দেশে দুধ তৈরি হয় তার সন্ধান। কাশ্মীর থেকে আনা অনেক সয়াবিন শ্রীমান কালীপদ যত্ন করে রেখেছিলেন। তা থেকে যথানিয়মে দুধ তৈরি হলো, দুধ থেকে ছানা। চীনা হালুইকরেরা নাকি নানা ধরনের মিষ্টান্ন এই ছানা থেকেই তৈরি করে। এই প্রথম সাক্ষাতে সত্যেন বোসের সেদিন মনে হয়েছিল, ‘চীন আর ভারত দুটি জাতিই বিরাট প্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী এবং হয়তো প্রাচীনপন্থী, তবে অগ্রগতিতে চীনারা আমাদের চেয়ে একটু পিছিয়ে রয়েছে।’

চীনারা ভারতবর্ষের চেয়ে বিজ্ঞানে পিছিয়ে আছে, এটিই মনে হয়েছিল তখন বোসের। ভারতবর্ষ তখনো ব্রিটিশের অধীন। এর মাত্র কয়েক বছর বাদে দুটি দেশই স্বাধীন হলো। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধে তিক্ত ফলাফলের মুখে সেই পুরনো ঘটনার স্মৃতিচারণা করেন তিনি; লেখেন, ‘শত্রুকে অশ্রদ্ধা করলেই বিজয়লক্ষ্মী অঙ্কগত হন না। আমাদের ২৪ বছরের অগ্রগতির ছবির সঙ্গে চীনের তুলনা করে গর্ব করার মতো কিছু খুঁজে পাই না। এর জন্য ভারতের বিজ্ঞানীরা কতটুকু দায়ী?’ ভারতের বিজ্ঞানের পশ্চাৎপদতার প্রধান কারণ হিসেবে সত্যেন বোস পুরোপুরি দায়ী করতেন বিশ্বজ্ঞানকে মাতৃভাষায় রূপান্তর করায় ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যর্থতাকে। কারণ ভারতীয় অভিজাতরা ইংরেজিকেই তাদের ক্ষমতার মাধ্যম হিসেবে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী।

তিন.

বাংলায় উচ্চশিক্ষা দেওয়ার বিরুদ্ধে আপাতদৃষ্টে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি হলো পরিভাষার অভাবে মনের ভাব যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় না। আসলে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকেই বিকাশের একটা পর্বে এই সংকট অতিক্রম করতে হয়েছে। কোনো ভাষাভাষী মানুষেরা যখনই নতুন অভিজ্ঞতার (রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-দার্শনিক-নৈতিক কিংবা অন্য কোনো ধরনের) সম্মুখীন হয়েছেন, তার সমাধান হবে হুবহু বিদেশি পরিভাষায় তা প্রকাশ করা কিংবা মাতৃভাষাকে তার সঙ্গে ধাতস্থ করা।

এভাবে কোনো আদিবাসী গোত্রে যদি ‘চুরি’ শব্দটি না থেকে থাকে, তার কারণ নিতান্তই সেখানে চুরির অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় না থাকা। মন্দির ভাবটির অনুপস্থিতি হবে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের অনুপস্থিতি থাকলে; যেমন মুদ্রা অর্থনীতি না থাকলে ‘বাজার’ শব্দটির প্রচলন হবে সীমিত কিংবা ‘অণুবীক্ষণ’ থাকবে না বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট একটি বিকাশের অভাবে। মাতৃভাষার এই দারিদ্র্য যদি কোনো কারণে থাকে, ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেকের এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের কর্তব্য হলো সেই অভাব নিরসনে লেগে পড়া, আমজনতার ভাষাকে উপেক্ষা করা নয়।

বাংলায় পরিভাষার অভাবের এই অভিযোগটি সর্বাংশে সত্য নয়। বহু ক্ষেত্রে পরিভাষার অভাব আসলে মাতৃভাষা চর্চার অভাবে ইতিমধ্যে সৃষ্ট পরিভাষাগুলোর প্রচলন না হওয়ার সংকট; কিন্তু যদি ধরেও নেই বাংলা গরিব, এই গরিবি একদা সব গুরুত্বপূর্ণ ভাষারই ছিল। চীনারা এই গরিবি সদ্য অতিক্রম করেছে, আরো অনেকেই এখনই করছে। সবচেয়ে ধ্রুপদি উদাহরণটিই সামনে হাজির করি। সাম্রাজ্যবিস্তারী রোমানরা যখন গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান-দর্শন-প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিপুল ভাণ্ডারের সন্ধান পেল, তাদের হুবহু এই অভিজ্ঞতাটিই হয়েছিল। এপিকুরসের গ্রিক লেখার অনুবাদ করতে গিয়ে যেমন লুক্রিশাস বিপদে পড়েছিলেন :

মাঝে মাঝে লুক্রিশাস গ্রিক বৈজ্ঞানিক পরিভাষাকে লাতিনে স্থানান্তর করার সমস্যায় পড়ে যান, আর তা নিয়ে অভিযোগও করেন। একপর্যায়ে তিনি আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভাষার দারিদ্র্য নিয়ে কথা বলেন। (জি এইচ হাবীবের অনুবাদে ‘লাতিন ভাষার কথা’ বইটি থেকে উদ্ধৃত) কিন্তু লুক্রিশাসরা এই প্রাণান্তকর চেষ্টাটা চালিয়েই মহত্ত্ব অর্জন করেছিলেন, লাতিন নামের সেই দরিদ্র ভাষাটি পুরো মধ্য যুগের বিপুল সময়জুড়ে বিজ্ঞান-দর্শন-রাষ্ট্রনীতি শিক্ষা ও চর্চার বাহন হয়েছিল ইউরোপজুড়ে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদের এই যজ্ঞ ছাড়া শিক্ষাকে মাতৃভাষায় ছড়িয়ে দেওয়ার প্রণোদনা ছাড়া আরবি, ইংরেজি, জার্মান—কোনো ভাষাই জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে এই উদ্যোগটি চালানো হলে বাংলা ভাষাকে নিয়ে এ কথাটি কেউ বলার সাহস করবে না।

মন্তব্য