kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

[ সাক্ষাৎকার ]

এই আগুন একদিন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে

বাংলাদেশের কোনো নারী বডিবিল্ডার হিসেবে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন মাকসুদা আক্তার। মুম্বাইয়ে আইএইচএফএফ অলিম্পিয়া অ্যামেচার বডিবিল্ডিংয়ে অংশ নিয়ে জিতেছেন পদক। মুঠোফোনে মুম্বাইয়ে থাকা মাকসুদার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল সানি

৭ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এই আগুন একদিন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে

মাকসুদা আক্তার

আপনাকে অভিনন্দন! অভিষেকেই বাজিমাত করলেন! কেমন লাগছে?

খুবই ভালো লাগছে! পদক জিতেছি, শুধু সে জন্য নয়, বাংলাদেশের নারীরা যেকোনো ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম, সেটা প্রমাণিত হলো—ভালো লাগাটা বেশি এ কারণেই।

 

মুম্বাইয়ের প্রতিযোগিতাটি সম্পর্কে বলুন।

মুম্বাইয়ে ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে আইএইচএফএফ অলিম্পিয়া অ্যামেচার বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপ। আমি অংশ নিয়েছি ‘উইমেন ফিজিক’ শ্রেণিতে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০ জন বডিবিল্ডার নাম লিখিয়েছিলেন সেখানে। প্রাথমিক বাছাই থেকে সেরা আটে উঠেছিলাম। এরপর ফাইনালে বিচারকদের রায়ে তৃতীয় রানার আপ হয়েছি।

 

আমাদের দেশের অনেকের ধারণা, বডিবিল্ডিং শুধু ছেলেদের ব্যাপার। আপনি সেই ধারণা ভেঙেছেন। এত দূর কিভাবে এলেন?

আমি আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের মুভির ভক্ত ছিলাম ছোটবেলা থেকেই। তাঁর অ্যাকশন, বডি, মাসল সবই আমাকে টানত। তবে কখনো ভাবিনি বডিবিল্ডার হব। শুধু আমি নই, বাংলাদেশের কোনো মেয়ের চিন্তায়ই থাকে না যে সে ভবিষ্যতে বডিবিল্ডিংকে তার নেশা বা পেশা হিসেবে বেছে নেবে। আমিও ২০১৯ সালের আগে এটা চিন্তা করিনি। জিমে যেতাম, শরীরচর্চা করতাম। জীবনটা এর ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। পতেঙ্গা নৌবাহিনী স্কুল ও কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ২০১৭ সালে টেক্সটাইল ডিজাইনের ওপর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন করতে আসি ভারতের পাঞ্জাবে। ভারতে পড়াশোনা করার সময়ই নিজেকে ফিট রাখার চিন্তা প্রথম মাথায় আসে।

 

তারপর?

ফিট রাখার প্রথম ধাপ থেকে শুরু করি ডায়েট। আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের বিভিন্ন ভিডিও দেখে নিজের মানসিকতা শক্ত করতে থাকি, তাঁকে সামনে রেখেই নিজের শরীর গঠন করতে শুরু করি। প্রথমে নিজে নিজেই শারীরিক পরিচর্যা শুরু করলেও কিছুদিন পর একজন ট্রেনারের অধীনে বডিবিল্ডিং শুরু করি। এটা শুরু করার পর থেকে অনেকের কটু কথা শুনতে হয়েছে। তবে আমার কাছে যেকোনো অর্জন এসব কথার চেয়ে বেশি মূল্যবান।

 

আমাদের মেয়েরা তো এসব পেশায় আসতে ভয় পায়। তাদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

আমাদের দেশের মেয়েদের ভেতর একটা ভয় কাজ করে। তারা ক্রিকেট, ফুটবলে টুকটাক আসতে চাইলেও বডিবিল্ডিং, ভারোত্তোলনের মতো খেলায় আসতে ভয় পায়। এটা অনেক বড় একটা ট্যাবু। যদি কারো এই ধরনের খেলায় আসার ইচ্ছা বা প্যাশন থাকে, অন্য কোনো কিছু না ভেবেই এই পেশায় আসা উচিত। কারণ, বাংলাদেশে থেকে এসব খেলায় উন্নতি করার এখনো অনেক সুযোগ আছে। দেখুন, প্রতিষ্ঠিত খেলা হিসেবে আমরা ক্রিকেট, ফুটবলকে ধরি। এসব খেলায়ও অভিভাবকরা তাঁদের মেয়েদের দিতে চান না। অথচ ছেলেসন্তান এসব খেলায় পদক পেলে গর্ব করেন। মেয়েদের ক্ষেত্রেও এটা হওয়া উচিত। এ রকম অনেক দিন গেছে, সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা একটানা নিজে ট্রেনিং করেছি আবার ছেলেমেয়ে উভয়কেই ট্রেনিং দিয়েছি। বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যদি বডিবিল্ডিংয়ের স্বপ্নটা জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে এই আগুন একদিন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবেই। শুধু পদক জয়ের জন্যই বডিবিল্ডিং করতে হবে—এ রকম নয়। বডিবিল্ডিং এখন আত্মরক্ষারও অনেক বড় হাতিয়ার। আত্মরক্ষার এই হাতিয়ার বাংলাদেশের মেয়েদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

 

বডিবিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে কাকে আদর্শ মানেন?

হলিউডের অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। যদিও তাঁর সঙ্গে এখন পর্যন্ত দেখা হয়নি। তবে মুম্বাইয়ে এসে বিগ র‌্যামি (মিসরের বডিবিল্ডার মামদো এলসবিয়াই), সের্গেই কনস্টানসসহ (স্পেনের বডিবিল্ডার) অনেকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে।

 

এ বছর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসের নারী ইভেন্টের উন্মুক্ত শ্রেণিতেও শিরোপা জিতেছেন। আগামী দিনে আপনার লক্ষ্য?

আমি ঢাকার একটি জিমে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। এই মাসের ১৫ তারিখে ফ্রান্সে বডিবিল্ডিং চ্যাম্পিয়নশিপের প্রাক-বাছাইয়ে অংশ নিতে যাচ্ছি। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফেরাটাই এখন আমার একমাত্র উদ্দেশ্য।