kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ মাঘ ১৪২৮। ২৮ জানুয়ারি ২০২২। ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

[ অবাক পৃথিবী ]

ব্রুস বিচের বিশাল বাংকার

আর্ক-২। ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মিত উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র। চার দশক ধরে এটি আগলে রেখেছিলেন ব্রুস বিচ। লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্রুস বিচের বিশাল বাংকার

ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রের ভেতরে ব্রুস বিচ

হর্নিংস মিলস। কানাডার অন্টারিওর একটি গ্রাম। প্রদেশের সবচেয়ে কম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। ১৯৭৮ সালে সেখানেই যাত্রা শুরু করে আর্ক-২।

বিজ্ঞাপন

বিশাল এই আশ্রয়কেন্দ্রের মূল কারিগর ব্রুস বিচ। তিনি যখন এর কাজ শুরু করেন, তখন বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। মার্কিন ও রুশদের মধ্যে। বেশ কয়েকবার পারমাণবিক যুদ্ধ শুরুর উপক্রম হয়। যা হোক, পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা দুনিয়া দেখেছে একবারই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হামলা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলোর ভয়াবহতা পুরো পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। শহর দুটি এখনো বয়ে চলেছে সেই চিহ্ন। আর তাই স্নায়ুযুদ্ধে যখন আবার পারমাণবিক আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিল, অনেকেই ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ভীতি ছড়িয়েছিল বেশি। তখন এই দুই অঞ্চলে বেশ কিছু ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র বানানো শুরু হয় মাটির অনেকখানি নিচে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামরিক বাংকার যেভাবে বানানো হতো। যেন পারমাণবিক হামলার সময় সেখানে আশ্রয় নেওয়া যায়। যেমন এই আর্ক-২। ব্রুসের মাথায় প্রথম এই চিন্তা আসে কিউবা সংকটের সময়। তিনি বলেন, ‘সে দিনগুলোতে দুশ্চিন্তা হতো যদি সত্যিই পারমাণবিক হামলা হয়, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব?’ তখন থেকেই সেই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু করেন।

আর্ক-২ এর ভেতরের চিত্র

 

আর কাজে হাত দেন ১৯৭৮ সালে। জোগাড় করেন ৪২টি স্কুলবাস। তারপর বিশাল গর্ত খুঁড়ে সেগুলো বসানো শুরু করেন। তার ওপরে কংক্রিটের ঢালাই। আর সবার ওপরে ১৪ ফুট মাটির স্তর। স্ত্রী-সন্তানরা অবশ্য তাঁর খ্যাপাটে স্বভাবের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত। বড় মেয়ে স্টুয়ার্ট বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম এটা বাবার আরেকটা পাগলামি। ’ স্ত্রী জিন অবশ্য প্রথমে ব্যাপারটা পছন্দ করেননি। ‘প্রথমে শুধু পরিষ্কার করার কাজে সাহায্য করতাম। কিন্তু পরে আমার মধ্যেও ভাবনাটা ঢুকে গেল,’ বলেন তিনি। সবাই মিলে ১৯৮০ সালেই আশ্রয়কেন্দ্রটি থাকার উপযোগী করে ফেলেন। শেষ বাসটি বসানো হয় ১৯৮৫ সালে। কিন্তু সেখানেই থামেননি ব্রুস; বরং প্রতিনিয়ত এর সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে চলেছেন। সে জন্য শ্রম দেওয়ার লোকের অভাব হয়নি কখনো। এ ধরনের প্রায় সব আশ্রয়কেন্দ্রেই জায়গা করে নিতে খরচ করতে হয় প্রচুর টাকা। কিন্তু আর্ক-২-এ তা নয়। বিনিময়ে দিতে হয় শ্রম। মানে নিজে হাত লাগাতে হয় এর কাজে। ফলে শুধু নির্মাণকাজেই নয়, ব্রুস নিয়মিত সাহায্যের হাত পান রক্ষণাবেক্ষণেও। আশপাশের অঞ্চল থেকে তো বটেই, এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দূর থেকেও অনেকে ছুটে আসেন। যেমন—মারিয়া কর্টেস। আসেন ১২০ মাইল পাড়ি দিয়ে। বলেন, ‘আমিও বিশ্বাস করি, যেকোনো দিন বড় কোনো দুর্যোগ আসতে পারে। তাই নিজের ও পরিবারের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে রাখছি। ’ তাঁরা সবাই মিলে একটু একটু করে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছেন আশ্রয়কেন্দ্রটি। সেখানে যেকোনো মুহূর্তে আশ্রয় নিতে পারে শপাঁচেক মানুষ। আছে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত। পানির কুয়া, রান্নাঘর, বাথরুম। ওখান থেকে করা যায় বেতার সম্প্রচারও! আশ্রয়কেন্দ্রটি বানাতে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে আনুমানিক ১০ লাখ মার্কিন ডলার। এত আয়োজন শুধু নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নয়, যেকোনো দুর্যোগ থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচানোও অন্যতম উদ্দেশ্য। “আমরা মাঝে মাঝে এটাকে ‘ভূগর্ভস্থ এতিমখানা’ও বলি। কারণ যদি সত্যিই বড় কোনো দুর্যোগ আসে, আমাদের এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতেও পারে। যারা আসবে, জায়গার অভাবে শুধু তাদের সন্তানদের রাখতে হবে। ” সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন ব্রুস। তবে গোল বাধে করোনায়। এর মধ্যেই নীরবে চলে গেছেন ব্রুস। ১০ মে। ৮৭ বছর বয়সে। এখন আর্ক-২-এর দায়িত্ব নিয়েছেন তাঁর স্ত্রী-কন্যারা। করোনা মহামারি বুঝিয়ে দিয়ে গেছে, বিপর্যয় কখনো বলেকয়ে আসে না। তার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকা কতটা জরুরি। কাজেই তারা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—দুর্যোগের মুখে আশ্রয়কেন্দ্রটিকে প্রস্তুত রাখতে। তথ্যসূত্র : নিউ ইয়র্ক পোস্ট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডটকম, ইয়াহু নিউজ।