kalerkantho

রবিবার । ২৬ বৈশাখ ১৪২৮। ৯ মে ২০২১। ২৬ রমজান ১৪৪২

[ আমরা একাত্তর ]

বিপ্লব আমার নাম

আল সানি   

৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিপ্লব আমার নাম

সপরিবারে বিপ্লব (সবার বামে)

কালরাত তত দিনে ১৫ দিনে পড়েছে। শহর ছাড়ছে অনেকে, কেউ কেউ যাচ্ছে যুদ্ধে। আমার বাবা দ্বিতীয় দলে ছিলেন। একাত্তরের ১০ এপ্রিল। বাবা ঘর ছাড়লেন। চললেন যুদ্ধে। মুক্তির যুদ্ধ। দুই মেয়ে আর আমার মাকে বলে গেলেন, ‘ফিরে আসব দেখো। দেশ স্বাধীন করে।’ আমি তখনো পৃথিবীর আলোয় আসিনি। মায়ের জঠরে পরম নির্ভয়ে ছিলাম। বাবা মুক্তিদের একটি দল নিয়ে পাবনা থেকে সোজা ভারত চলে গেলেন। তিনি যুদ্ধে যাওয়ার তিন মাস পর আমার জন্ম; ৮ জুলাই ১৯৭১। মা পড়ে গেলেন উভয় সংকটে—একদিকে যুদ্ধ, অন্যদিকে আমি। তিনি একবার দাদাবাড়ি, আরেকবার নানাবাড়ি। এভাবেই ছুটে বেড়াতে লাগলেন আমাকে নিয়ে। তখন তো যোগাযোগব্যবস্থা এতটা ভালো ছিল না। বাবা লড়ছেন ময়দানে, মায়ের ওপর দায়িত্ব পড়ল আমার নাম রাখার। আমার নাম বিপ্লব রাখলেন মা।

ওই নাম তখন সময়ের দাবি। চারদিকে বিদ্রোহ আর বিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছে। আমার নাম আর একাত্তর তাই সমার্থক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জন্ম নিলে হয়তো রাখা হতো জয়, বিজয়, নয়তো মুক্তি। কিন্তু একাত্তরের জুলাই মাস। মানুষ ছুটছে, মরছে, লড়ছে—তাই বিপ্লবই ঠিক। আমার নিজেরও খুব প্রিয় নাম বিপ্লব। একাত্তরে মা আমাকে নিয়ে কত জায়গায় আত্মগোপন করেছেন, কত যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, ভাবলেই শিউরে উঠি। মনে হয় আমার নাম বিপ্লব না হয়ে অন্য কিছু হওয়ার ছিল না।

 

আমরা যারা একাত্তরের

আমরা যারা একাত্তরে জন্ম নিয়েছি, আমাদের বেশির ভাগেরই নাম জয় অথবা বিপ্লব কিংবা সূর্য। আমি যখন পাবনা জিলা স্কুলে ছিলাম, বিপ্লব নামেরই এক বন্ধু পেয়েছিলাম। সম্ভবত ওর মা-বাবাও মুক্তিযুদ্ধকেই ধরতে চেয়েছিলেন নামটি রেখে। চিনতে গিয়ে অন্য বন্ধুরা আমাদের মোটা আর চিকন বিপ্লব নামে ফারাক করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাহাঙ্গীরনগর) এসে তা দেখি বিপ্লবের ছড়াছড়ি। এমন ডিপার্টমেন্ট ছিল না, যেখানে বিপ্লব নামের কেউ ছিল না। আমি ছিলাম বাংলার বিপ্লব, নাট্যতত্ত্বে ছিল দুরন্ত বিপ্লব, অর্থনীতিতেও ছিল আরেক বিপ্লব। এমনও হয়েছে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে ডেকেছে অর্থ বিপ্লবকে, হাজির হয়েছে দুরন্ত। একটা ব্যাপার কিন্তু খেয়াল করার মতো, একাত্তরের আগে এমন নাম রাখার খুব চল ছিল না; কিন্তু একাত্তর ও তার পরের সময়গুলোতে এমন নামের আদর বাড়ে অনেক গুণে। মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়রদের মধ্যে স্বাধীন, মুক্তি, বিদ্রোহ, সূর্য বেশি পাইনি। তুলনায় জুনিয়রদের অনেকেরই এমন নাম ছিল।

 

নামটা পছন্দ করেছিলেন বাবাও

আমার বাবার নাম আমিনুল ইসলাম বাদশা। বাবাও নামটি পছন্দ করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ভাষাসংগ্রামেও যুক্ত ছিলেন। আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে মুক্তি, সংগ্রামও আছে। বলা চলে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে এমন প্রায় সব নাম আমাদের পরিবারে আছে। আমার চাকরির বয়স ২৬ বছরের বেশি। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে নামটিও অনেক রকম প্রভাব ফেলেছে। স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষের রোষানলেও পড়তে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত জীবন যারা মিলিয়ে চলে, তাদের মধ্যে যুদ্ধটা সব সময় জারি থাকে। এখন শত্রু হলো ঘুষ, দুর্নীতি বা স্বজনপ্রীতি। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে আমি ছিলাম সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক। সে সময় ৩০টিরও বেশি ইউনিয়নে আমি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছি। পুরোটা জুড়ে মুক্তি, সংগ্রাম আর ৯ মাসের বিপ্লবকে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল। আরো যেখানে যেখানে কাজ করেছি সবখানেই মুক্তিযুদ্ধ আমার সঙ্গেই ছিল। সুনামগঞ্জে আমরা মাত্র দুই মাসে একটা বাঁধ তৈরি করেছি। তার দৈর্ঘ্য ১৪০ কিলোমিটার। এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল ১৮০ কোটি টাকা। আমরা শেষ করেছিলাম ১৫০ কোটি টাকায়। প্রায় দেড়গুণ ধান বেশি উৎপন্ন হয়েছিল ওই বাঁধের কল্যাণে। এটাও বিপ্লব। স্বাধীন দেশে অর্থনৈতিক বিপ্লব। কম বয়সীদের অনেকরেই আফসোস করতে শুনি, যদি একাত্তরের যুদ্ধে অংশ নিতে পারতাম! তারা ভুলে যায় দেশের জন্য অনেক বিপ্লব এখনো বাকি আছে। সবারই তাতে অংশ নেওয়া জরুরি। বিপ্লব একটি চলমান প্রক্রিয়া। সব সময় আমরা

বিপ্লবের মধ্যেই থাকি। আমরা যদি শুধু নিজের দায়িত্বটুকুই পালন করি—তা হোক গাছ লাগিয়ে বা মাছ ফলিয়ে অথবা প্রতিবেশীকে ভালোবেসে, তাহলেও মুক্তি আসবে।