kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

[নারী দিবস ছিল কাল]

ফাতেমা ও তাঁর সতীর্থরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ১১ জন সরকারি কর্মকর্তাই নারী। তাঁদের মধ্যে ফাতেমা নূর কৃষি কর্মকর্তা। শাহাদাত হোসেন আলোচনা শুরু করেছেন তাঁকে নিয়েই। পরে অন্যরাও এসেছেন

৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফাতেমা ও তাঁর সতীর্থরা

ফাতেমার বাবা আব্দুল মালেক ভূইয়া কাজ করতেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে। বাড়ি নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। ফাতেমারা পাঁচ বোন। বোনদের মধ্যে সে তৃতীয়। সাতপাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর পড়ালেখা শুরু। পড়েছেন নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়েও। এইচএসসি পাস করেছেন নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে। তারপর ভর্তি হন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। আরো পরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস করেন। বিষয় ছিল জৈবপ্রযুক্তি। ফাতেমা এখনো ভাবেন, আমাদের কৃষিপ্রধান দেশ। উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে এখানে কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তার জন্য কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

 

কর্মজীবন শুরু

২০১১ সাল। ঝিনাইগাতি উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। সেখানে এক বছর কাজ করার পর ২০১২ সালে গাজীপুরে কাজ শুরু করেন সিড অ্যানালিস্ট হিসেবে। আরো পরে অতিরিক্ত উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। ২০১৮ সালে অতিরিক্ত কৃষি অফিসার হয়ে যান রূপগঞ্জে। পুরো দুই বছর কৃষকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করে পদোন্নতি পান ২০২০ সালে। হন কৃষি কর্মকর্তা।

 

ছোটবেলায় ফেরা

খুব পরিশ্রমী ফাতেমা ছোটবেলা থেকেই। খেলাধুলায়ও ছিলেন তুখোড়। বাবার দেখাদেখি বোনদের সবাই চাইত সরকারি কর্মকর্তা হতে। তবে বাবা বেশি দূর লেখাপড়া করাতে চাননি মেয়েদের। মা বেগম রোকেয়া অবশ্য চাইতেন। আর তাঁর চেষ্টায়ই মেয়েরা শিক্ষিত হয়েছে। ফাতেমা বলছিলেন, ‘স্কুল থেকে বাসায় ফিরে পুকুরে নেমে পড়তাম। ওড়না দিয়ে ধরতাম চিংড়ি মাছ। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। দৌড়, লং জাম্প—সব খেলায়ই আমি প্রথম হতাম। ঘুরে বেড়াতেও পছন্দ করতাম। আমাদের বাড়িতে কাজ করত মঞ্জুরা। মা একা ছাড়তে চাইত না বলে মঞ্জুরাকে নিতাম সঙ্গে। ঘুরতাম এ বাড়ি-ও বাড়ি। বাড়ির ধারে বকুলগাছ। কুড়াতাম শিউলি ফুলও। পাশের বাড়িতে আমার সহপাঠীরা ছিল। তাদের বাড়ির বড়রা বিড়ি বানাত। আমিও অনেক বানিয়েছি। আরেকবার আমার ছোট বোন শিরিনার সঙ্গে গাঁয়ের এক ছেলে দুষ্টামি করেছিল। আমি তার কলার ধরে বিচার করতে বসেছিলাম।’

 

রূপগঞ্জ এসে

খাতা-কলমে ২২ হাজার কৃষক রূপগঞ্জে। ফাতেমা যোগ দেওয়ার আগেই সংখ্যাটি জেনে নিয়েছিলেন। তাঁদের সবার কাছে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে চাইলেন ফাতেমা। প্রথমে প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু। তারপর প্রণোদনা। এরপর পুনর্বাসন। সার, বীজের সুষম ব্যবহারও জানালেন। ‘আমি সব সময় মনে রাখি কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। অথচ আমরা কৃষকদের সম্মান করি না, তাঁদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য দিই না। ধরুন, ইটভাটা নেই দেশে অথবা চকোলেট ফ্যাক্টরি—কেউ কি না খেয়ে মারা যাবে? কিন্তু কৃষক যদি চাষবাস ছেড়ে দেয়, তবে বাঁচা কঠিন হবে।’ 

 

ফল মিলছে

শষ্যের ফলন বাড়াতে নতুন জাতের বীজ ফাতেমা সরবরাহ করেছেন।  রাসায়নিক সার ও কীটনাশক অধিক ব্যবহারের কুফল জানিয়েছেন। পরিবেশবান্ধব ফসল উৎপাদনকে উৎসাহিত করেছেন। এখন তাঁরই উৎসাহে রূপগঞ্জ ও দাউদপুরের রোহিলা গ্রামের অনেক কৃষক  কীটনাশকমুক্ত ফসল ফলাচ্ছেন। ফসল রক্ষায় আলোক ফাঁদ, ফেরোমন ফাঁদ ইত্যাদির ব্যবহারে ফাতেমা সিদ্ধহস্ত। তিনি কৃষকদের  জন্য নবান্ন উৎসবের আয়োজন করেন। মাঠ দিবস, কৃষি মেলারও ব্যবস্থাপক তিনি। আগে রূপগঞ্জে মূলত ধান, পাট, সরিষার আবাদ হতো। এখন পেঁয়াজ, চীনাবাদাম, মসুর ডাল, টেমেটো, মরিচ আর আখের চাষও হচ্ছে। সরিষায়ও বারি ১৪, বারি ১৭, বারি ১৮, বীনা ৯ জাত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আগে বারি ৭ সরিষায় ফলন হতো কম। এক মণ সরিষা থেকে তেল পাওয়া যেত ১২ বা ১৩ লিটার। এখন নতুন নতুন জাতের সরিষা থেকে ১৬ লিটার তেলও পাওয়া যাচ্ছে।

 

বলার মতো কথা

উপজেলার উন্নয়ন তদারকিতে সরকারি যে ৩৭ জন কর্মকর্তা আছেন রূপগঞ্জে তার মধ্যে ১১ জনই নারী। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসি ল্যান্ড, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, শিক্ষা কর্মকর্তা, উপসহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা, ইউআরসি ইনস্ট্রাক্টর, তথ্য সেবা কর্মকর্তা ইত্যাদি সব পদেই নারীর অধিষ্ঠান। নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান রূপগঞ্জে যোগ দেন ভর করোনাকালে। মাস্ক বিতরণ, খাদ্য সরবরাহ, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা ইত্যাদি কাজে নিজে মাঠে থেকে মানুষের মন জয় করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। ভেজাল ও মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। নুসরাত বলেন, ‘কাজই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমি ভালো করলে প্রশংসিত হবো, মন্দ করলে ঘৃণিত হবো। আমি একজন নারী। রূপগঞ্জবাসী আমাকে ভিন্ন চোখে দেখেনি। তাদের বড় গুণ হলো, কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ আলাদা করে দেখে না।’

 

আরো কয়জনা

সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড কর্মকর্তা রূপগঞ্জে আফিফা খান। ঢাকার একেবার লাগোয়া হওয়ায় রূপগঞ্জের জমিজমা সামলানো দুরূহ কাজ। সরকারি খাস খতিয়ান রক্ষা আর জমির মালিকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে তিনি সাফল্য পেয়েছেন।  সমধিক আলোচিত হয়েছেন বাল্যবিয়ে বন্ধে ভূমিকা রেখে। বলছিলেন,  ‘নারী কর্মকর্তা হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে কাজ করছি। নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই সর্বোচ্চ সেবা দিতে আগ্রহী থাকি। এখানে আমার আরো নারী সহকর্মী আছেন, সবাই দায়িত্ব পালনে দারুণ ভূমিকা রাখছেন।’ প্রায় ছয় লাখ মানুষ রূপগঞ্জে। ৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল আছে এখানে। প্রথমবারের মতো নারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পেয়েছে রূপগঞ্জ। ডাক্তার নূরজাহান আরা খাতুন তাঁর নাম। একটি হাসপাতাল ভর করে ছয় লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বিষয়টি খুব কঠিন। কিন্তু নূরজাহান আন্তরিকতা দিয়ে সীমাবদ্ধতা দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। রোগী ও তাদের স্বজনদের তিনি আপনজন। বললেন, ‘আমরা মানুষ। মানুষের জন্য কিছু করতে পারলে জীবন সার্থক হবে। নারী হিসেবে নিজেকে আলাদা করে ভাবি না। কাজের বেলায় নারী-পুরুষ নেই। কাজকে কাজ হিসেবেই দেখি।’ লুৎফুন্নাহার বেগম আছেন এখানে পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা। তিনি স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালনা করেন। প্রসূতি সেবায় প্রস্তুত থাকেন ২৪ ঘণ্টাই। ভর করোনাকালেও প্রসূতি মায়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নারীকে ভয় পেলে চলবে না। আমাদের জন্য পরিবেশ আরো প্রতিকূল। তাই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হয়।’  

উপজেলার নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য টিউবয়েল স্থাপন, স্যানিটেশন প্রগ্রাম পরিচালনার কাজ সহজ নয়। এ দায়িত্ব নিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আয়েশা খাতুন মুন্নি। রূপগঞ্জ তাঁর প্রথম কর্মস্থল। বললেন, ‘এসব কাজ নারীর জন্য কঠিন করে রাখা হয়েছে। তবে আমার সিনিয়রদের দারুণ সহযোগিতা পাচ্ছি। এলাকার মানুষও নারী বলে দূরে ঠেলে না।’ 

উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা হিসেবে আছেন ফারজানা সুলতানা। বললেন, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে সরকারের নানা কর্মসূচি আছে। এমন সেবা দিতে এখানে কাজ করছি স্বাধীনভাবে। বেগম রোকেয়া ভেবেছিলেন, নারী ঘরে বসে হলেও শিক্ষার আলো পাক। নারী-পুরুষ সবাই মিলে গড়ুক দেশ।  আমরা আজ তাঁর সে চাওয়ার সুফল পাচ্ছি।’

 

বেসরকারিভাবেও

রূপগঞ্জের বরপায় লাইফ এইড নামের একটি বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন নাসরীন আলীম। তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। রূপগঞ্জে এমন উদ্যোগ এটাই প্রথম। বললেন, ‘সরকারি পদে বা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সামগ্রিকভাবে নারী নিরাপদ নয়। এখনো ঘর থেকে বের হলে অভিভাবক দুশ্চিন্তায় থাকেন—কখন কোন অঘটন ঘটে যায়। আমি ভাবি, নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব নারীকেই নিতে হবে। তবে পুরুষদের সঙ্গে রেখেই।’