kalerkantho

সোমবার । ২২ আষাঢ় ১৪২৭। ৬ জুলাই ২০২০। ১৪ জিলকদ  ১৪৪১

[ আরো জীবন ]

ময়লাওয়ালা

গ্রামে থাকত এমাদুল। দিনমজুর ছিল। কিন্তু তাতে সংসার চলত না। পরে সাভারে এসে ময়লাওয়ালার কাজ নেয়। মাসুম সায়ীদ জানতে চেয়েছিলেন কেমন যায় তার দিন

৭ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ময়লাওয়ালা

অসংখ্য মাছি ঘিরে ধরেছে ভ্যানটাকে। উৎকট দুর্গন্ধ। এর মধ্যেই লোকটি ময়লাভর্তি আরো একটা ড্রাম এনে উপুড় করে ধরলেন ভ্যানটার ওপর। তাঁর মুখে সাধারণ কাপড়ের একটা মাস্ক, হাত-পা খালি আর পরনের লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর থেকে ভাঁজ করে কোমরের সঙ্গে বাঁধা। ভ্যান উপচে বেশ কিছু ময়লা পড়ে গেল রাস্তায়। ড্রামটা মাটিতে রেখে হাত দিয়েই মাটিতে পড়ে থাকা ময়লাগুলো তুলে ঠেলেঠুলে গাদার ওপর রেখে এগিয়ে গেল ভ্যানের হ্যান্ডেলের দিকে। জিজ্ঞেস করে জানলাম—এ কাজে এসেছেন বছর দুই হলো। নাম মোহাম্মদ এমাদুল।

 

গ্রাম ছেড়ে শহরে

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবার বাড়িভিটা ছাড়া আর তেমন কোনো জমিজিরাত ছিল না। গায়ে খেটে এমাদুলকে বড় করেছেন কিন্তু লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নিতে পরেননি। তাই প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি এমাদুল। পেটের দায়ে করতে হতো দিনমজুরের কাজ। বিয়ের পর সন্তান জন্ম নেয়। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজেই যখন সামলে উঠতে পারছিলেন না তখন মা-বাবাকে দেখবে কিভাবে? গ্রাম ছেড়ে তারা চলে আসে সাভারে। মা শুরু করেন বাসাবাড়ির কাজ। একসময় কাজ পান ভাটপাড়ায় জাহাঙ্গীরনগর হাউজিং সোসাইটির অফিস ঝাড়ু দেওয়ার। তখন হাউজিং সোসাইটির প্লটগুলোতে উঠতে শুরু করেছে বহুতল ভবন। বাড়তে শুরু করেছে বসবাসকারীর সংখ্যাও। ময়লাগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলার জন্য সোসাইটির নিজস্ব লোক দরকার। ওদিকে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন এমাদুল। মায়ের অনুরোধেই এমাদুলকে নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ। তবে শর্ত হলো ময়লা ফেলার ভ্যানটা আনতে হবে নিজের।     

 

দ্বিধাদ্বন্দ্বের টানাপড়েন

নামেই চাকরি। কিন্তু কাজটা তো তত সুবিধার নয়। নয় সম্মানেরও। মা তা মানতে রাজি নন। কাজ তো কাজই। লোকে তো করছেও। বাসাবাড়ির জমে থাকা ময়লা ভ্যানে করে নিয়ে ফেলে আসা। এ আর কী এমন কাজ? স্ত্রীর মতও তাই। দিনমজুরের কাজে যখন আর সংসার চলছে না তখন দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ময়লা ফেলার কাজেই যোগ দেন এমাদুল। হয়ে যান ময়লাওয়ালা।

 

প্রথম দিনের ধাক্কা

গামছায় মুখ বেঁধে প্রথম ময়লার ড্রামটা ভ্যানের ওপর ঢালতেই উৎকট গন্ধ এসে ধাক্কা দেয় নাকে। গুলিয়ে ওঠে পেটের ভেতরটা। কষ্ট করে সামলে নেন নিজেকে। কোনোমতে কাজ শেষ করে ফিরে যান ঘরে। সাবান দিয়ে গোসল সেরে নেন। বারবার ধুয়েও যেন গন্ধ সরতে চায় না। খেতে বসে খাওয়াও হয় না ঠিকমতো। পেটা গুলিয়ে উঠতে চায়। বমি ভাবটা আটকাতে পারলেও পেয়ে বসে পেটের পীড়ায়। তবে ব্যাপারটা ছিল সাময়িক। ঠিক হয়ে যায় পরদিনই।

 

শরীরের নাম মহাশয়

কথায় বলে শরীরের নাম মহাশয়, যা সহাবেন তায় সয়—প্রবাদটি ফলে যায় এমাদুলের। ধীরে ধীরে দুর্গন্ধ সহনীয় হয়ে ওঠে তার কাছে। অত খারাপ লাগে না মাছির ভনভনানিও। গা গুলিয়ে উঠে না ময়লা ঘাঁটতে গিয়ে। সকাল সকাল এসে কাজ শুরু করেন। আর কাজ শেষ করে ঘরে ফেরেন দুপুর নাগাদ। তারপর ঘরে ফিরে সাবান দিয়ে গোসল সেরে খেয়েদেয়ে গা গড়ানি সেই বিকেল অবধি।

 

সব কিন্তু ফেলনা নয়

ময়লা ঘাঁটাঘাঁটির অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর এমাদুল দেখে ময়লার সবটাই ফেলনা নয়। এমন কিছু জিনিস আছে, যা বাজারে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করা যায়। ভ্যানের সঙ্গে একটা বস্তুা ঝুলিয়ে রাখেন। তাতে তুলে রাখেন প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা লোহালক্কড়, বস্তা, শ্যাম্পুর ক্যান, টিনের কৌটা ইত্যাদি। প্রতিদিন একটু একটু করে যা জমা হয় মাস শেষে তার মূল্য প্রায় হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। এমাদুলের টানাটানির সংসারে এটারও মূল্য অনেক।

 

রোজ আসতে হয় কাজে

আট হাজার টাকায় শুরু হয়ে দুই বছর পর বেতন দাঁড়িয়েছে বারো হাজারে। কিন্তু কাজ বেড়েছে দ্বিগুণ। আগে ছিল ১৮টা ভবন। এখন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৬টা বাড়ি। একাই টানতে হয় সব ময়লা। সপ্তাহে সাত দিনই। বন্ধ নেই। অসুখ করলেও ঘরে থাকার উপায় নেই। চাইলেও ছুটি কাটানো যায় না। দিন দিন না ফেললে ময়লা পচেগলে পোকা জন্মে। পরের দিন টানতে হয় দ্বিগুণ ময়লা। তাতে কষ্ট হয় আরো বেশি। সোসাইটির আয়তনও কম নয়। দুটো ব্লক। ময়লা পোঁতার জায়গাটা বি-ব্লকের একদম উত্তর প্রান্তে বিলের ধারে। ভেজা স্যাঁতসেঁতে ময়লা ওজনেও ভারী। ভারী ভ্যান টেনে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর।

 

লোকের তাচ্ছিল্যে ব্যথিত হন

ভারী আর দুর্গন্ধময় ভ্যানটা বয়ে নিয়ে যাওয়া যত না কষ্টের তার চেয়েও বড় কষ্টের লোকজনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। ‘বেশির ভাগ লোকে ময়লার চেয়েও বেশি অবহেলা করে আমাকে।’ কথাটা বলার সময় গলাটা ধরে এলো তার। মেয়েটা এখন বড় হয়েছে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। সে চায় না তার বাবা আর এ কাজ করুক। কিন্তু লেখাপড়া জানে না বলে এর চেয়ে ভালো কাজ জোটানোও সম্ভব হচ্ছে না এমাদুলের পক্ষে।

 

বেতনটা যদি আর একটু বাড়ত

‘স্বীকার করি বারো হাজার টাকা বেতন কম না হলেও এতে মাস পার হতে চায় না। একটা মাত্র রুম নিয়ে থাকতে হয়। জিনিসপত্রের দাম বাড়তি। আপাতত পনেরো হাজার টাকা হলেও চলত। আর সেটা যখন হবে তখন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে আরো।’ কথা বলতে বলতে এসে গেলাম ডামিপংয়ের জায়গায়। ময়লা ফেলার জন্য ভ্যান নিয়ে পেছন ফিরে খানিকটা ঢাল বেয়ে নেমে আবার উঠতে হলো উজান ঠেলে। তারপর সামনের চাকা উঁচু করে ঢেলে দিল ময়লা।

 

অভ্যাস বদলানো সহজ নয়

ঢেলে দেওয়া ময়লা থেকে কিছু বোতল আর ভাঙাচোরা এটা-ওটা বস্তায় ভরে ভ্যান নিয়ে তিনি উঠে এলেন রাস্তায়। একটা গাছের ছায়ায় আমরা দাঁড়ালাম। জিজ্ঞেস করি—করোনাভাইরাস নিয়ে সবাই আতঙ্কে আছে আপনার ভয় লাগে না? আমার কথায় মৃদু একটা হাসি দেখা দিল তার মুখে। সরল আর বোকা বোকা হাসি। বললেন, ‘হাত মোজা কিনেছি। প্লাস্টিকের জুতা আছে ব্যাগে ভ্যানের ওপর। বোঝা গেল খালি হাত-পায়ে কাজ করাই তার অভ্যেস। বদলাতে সময় লাগবে।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য