kalerkantho

শনিবার । ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৪ ডিসেম্বর ২০২১। ২৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

ও আমার দেশ

নদীর জন্য ভালোবাসা

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। কিছুদিন একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় বিভাগেও কাজ করেছেন। তারপর সব ছেড়ে দিয়ে নদী গবেষণায় নেমে গেলেন নিজের জমানো টাকা নিয়ে। তিনি ভাবেন, নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। নদীপ্রেমিক মোহাম্মদ এজাজের সঙ্গে গল্প করে এসেছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

২৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নদীর জন্য ভালোবাসা

তুরাগের পানি পাইকপাড়া পর্যন্ত আসত। এজাজের বাসা থেকেই পানি দেখা যেত। আগারগাঁওয়ে বংশপরম্পরায় এজাজরা আছেন ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। গবেষণামূলক কাজই এজাজের বেশি পছন্দ। বন্ধু রোকন নদী নিয়ে কাজ করার কথা বললেন। এজাজ দেখলেন, নদী নিয়ে সেভাবে কোনো গবেষণামূলক কাজ হয়নি। অথচ বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃৃক দেশ। এজাজ মনে করেন, নদী সেবা মানে মায়ের সেবা করা।

 

নদীর সুখ-দুঃখ

ঢাকার নদী নিয়েই প্রথম গবেষণা শুরু করলেন এজাজ। বুড়িগঙ্গার কিছু উন্নতি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। কারণ ট্যানারি সরানো হয়েছে, মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। মিডিয়ায় নদী দেখানোও হচ্ছে বারবার। কিছুদিন আগে কবি নির্মলেন্দু গুণ বুড়িগঙ্গা থেকে বোয়াল মাছ ধরেছেন। বর্ষায় মানুষজন নদীতে গোসল করে। বুড়িগঙ্গার পানি বর্ষায় ডেভেলপ করেছে। তাই বুড়িগঙ্গার কিছু উন্নতি হয়েছে ধরা যায়। তবে সমস্যা হলো নদীর মালিকদের মধ্যে বনিবনা নেই। নদী নিয়ে সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করে। এদের মধ্যে আন্ত সমন্বয় নেই। এজাজ বলছিলেন, যত্রতত্র স্লুইস গেট নির্মাণ নদীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এর ওপর আছে প্রভাবশালীদের নদীদখল, স্যুয়ারেজ দূষণ, কলকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা ইত্যাদি। বুড়িগঙ্গার ২২ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ২০০ স্যুয়ারেজ লাইন আছে বলে জানা যায়।

নদীর জীবন

নদীর বাত্সরিক জীবনচক্রে দেখা যায় মার্চে জন্ম হয়। এপ্রিল, মে হলো নদীর শৈশব। জুন হলো কৈশোর। নদী যৌবনপ্রাপ্ত হয় জুলাই-আগস্ট মাসে। অক্টোবরে নদীর যৌবনে ভাটা পড়ে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারিতে পানি কমে শুকিয়ে নদী প্রাণহীন হয়ে পড়ে। এটাই হলো নদীর লাইফ সাইকেল।

 

নদী নিয়ে সুখস্মৃতি

একবার ইছামতী নদীর গবেষণার কাজে যান এজাজ। ওখানকার মানুষ দিনে পাঁচবার নদীতে আসে। এজাজ বলছিলেন, এক নারীর সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি তিথি ধরে নদীর গতিবিধির সব তথ্য হুড়মুড় করে বলে দিলেন। নদী যেন তাঁর পরিবারের একটা অংশ। নদীর সঙ্গে নারীর এই আত্মিক সম্পর্কে মুগ্ধ হন এজাজ।

 

প্রথম বেসলাইন সমীক্ষা

বাংলাদেশের নদী নিয়ে এর আগে বেসলাইন সমীক্ষা হয়নি। এজাজ বলছিলেন, ‘বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে কয়টি নদী আছে সে তথ্যও ঠিক ঠিক পাওয়া যায় না। নদীর শুরু থেকে শেষ, হাইড্রোলজিক্যাল সীমানা, নদীপারের হাট-বাজার, নদীপারের বাণিজ্যিক কেন্দ্র, কতগুলো খাল আছে, নৌকা চলাচল করে কতগুলো, নদীপারের মানুষের জীবনালেখ্য ইত্যাদি আরো অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করাই হলো বেসলাইন সমীক্ষা।’ এজাজ আরো জানালেন, তাঁদের এই সমীক্ষা ভবিষ্যতে অন্য গবেষণার কাজেও লাগানো যাবে। এজাজের সঙ্গে ড. ইমন তানজির, শেখ রোকনসহ বেশ কয়েকজন কাজ করেন।

 

তাড়াও খেয়েছেন

এজাজ জানালেন, অনেকবার এমন হয়েছে, মানুষ ভেবেছে, আমরা নদী দখল করতে এসেছি। লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসেছে। ধলেশ্বরীতে একবার ঝড়ে পড়ে বোট প্রায় ডুবেই যাচ্ছিল। কোনো রকমে বড় ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে সে যাত্রায় তাঁরা রক্ষা পান।

 

আরো কিছু কথা

অনেকেই নদীকে দেখে থাকেন রোমান্টিকতা আর নস্টালজিয়ার জায়গা থেকে। উন্নয়নে নদী মেইন স্ট্রিমে নেই। এজাজের মতে, নদী বাঁচাতে প্রথমেই চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দ্বিতীয়ত, নদীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা উচিত। যে দৃষ্টিতেই আমরা দেখি না কেন, নদীগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি নদীগুলোকে শুধু পানির প্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে এটি একটি বড় দুর্যোগ হবে।

 

রিভারাইন পিপল

রিভারাইন পিপল একটি নদী সংরক্ষণ সংগঠন। এর পরিচালক হলেন মোহাম্মদ এজাজ। সংগঠনটি বেঙ্গল বদ্বীপে নদী, জল ও জলাভূমির সমস্যা নিয়ে কাজ করে। এজাজ যে গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার নাম ‘ঢাকা রিভার্স’। এটি ঢাকা বিভাগের নদীগুলোর একটি বেসলাইন সমীক্ষা। প্রায় ১৫০টি নদীর বায়োফিজিক্যাল ও সামাজিক উপাদান সম্পর্কে উপলব্ধি করতে, বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ বাস্তবায়নে এবং এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে এ প্রকল্প। ঢাকায় ১৩টি জেলা রয়েছে। এজাজ বললেন, ‘প্রথম পর্যায়ে আমরা ঢাকা বিভাগের নদীগুলোর তালিকা তৈরি করছি। আমরা এই সমীক্ষায় ১৫০টি নদী খুঁজে পেয়েছি এবং এ সংখ্যা সামনে ২০০ হয়ে যেতে পারে। তবে সরকারি হিসাবে (বিডাব্লিউডিবি) তালিকায় শুধু ৬৩ নদীর কথা উল্লেখ রয়েছে।’

 

গরিবের পেটে লাথি

মাছ উত্পাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন তৃতীয়। মজার বিষয় এই তথ্যের কোনো বেসলাইন সমীক্ষা নেই। নেই গ্রহণযোগ্য কোনো গবেষণা। মোহাম্মদ এজাজ বললেন, কারখানার বর্জ্যে আর কৃষিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাধারের ৪০ শতাংশ মাছ উত্পাদন কমেছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত  শ্রেণির লোকরা এই মাছ বিনা মূল্যে খেতে পারত, যা এখন কিনে খেতে হচ্ছে। কম্পানি কর্তৃক তৈরি কৃষিব্যবস্থায় কৃষক বড় অসহায় হয়ে পড়েছে। কৃষক দিন দিন শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। জমি, নদীর ওপর মানুষের অধিকার কমছে।

 

সুখ-দুঃখের সঙ্গী নদী

এজাজ বললেন, নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন। আরো বললেন, নদীতে যখন ভাটা শুরু হয় আপনি গভীরভাবে কিছুটা সময় দেখলে টের পাবেন, মনের সব দুঃখ ভাটার টানে চলে গেছে। আবার নদীর জোয়ার দেখলে আনন্দ লাগে। জোয়ারে স্রোতে মনের মধ্যে আনন্দধারা বয়।

ছবি : সংগ্রহ