kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

ফেসবুক থেকে পাওয়া

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ফেসবুক থেকে পাওয়া

বাবা, তুমি ক্ষমা করো

বাবা প্যারালিসিসের রোগী। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাবাকে নিয়ে মা থাকতেন মামার বাড়িতে। আমি সেখানেই বড় হয়েছি। মা-বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই শিখেছি দায়িত্ব নিতে। মামারা তেমন অবস্থাসম্পন্ন না হওয়ায় এইচএসসি পাস করে চলে আসি ঢাকায়। বছরখানেক কয়েকটি শোরুমে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করেছি। এখন চাকরি করছি একটি ম্যানুফ্যাকচার কম্পানিতে। বেতন যা পাই তা দিয়ে ঢাকায় থাকার খরচ, বাড়িতে মা-বাবার খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকা জমা করছি ব্যাংকে। উদ্দেশ্য বাবাকে বড় কোনো ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ করে তোলা।

বছরখানেক আগে একজন ভালো ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি বাবাকে দেখে বলেছেন, অপারেশন করলে ভালো হয়ে যাবে। শুনে মায়ের চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। আবার পরক্ষণেই সেই উজ্জ্বল মুখটি মিইয়ে গেল অর্থের সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে। তা দেখে ছ্যাঁৎ করে উঠল আমার বুক। মনে মনে পণ করলাম, যেভাবেই হোক বাবাকে অপারেশন করিয়ে সুস্থ করে তুলবই। এতে বাবা ও মা দুজনের মুখে হাসি ফুটবে। একজন সন্তানের জন্য এর চেয়ে পরম তৃপ্তির আর কী হতে পারে!

কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যার দিকে হাঁটতে বের হলাম। লেকের পারে আছে বন্ধু রঞ্জু ও আশফাক। তাদের  সঙ্গে বেশ ভালো সময় কাটে। ওদের কাছাকাছি পৌঁছার আগেই আম্মার ফোন। ফোনের ওপাশ থেকে যা শুনলাম তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আম্মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, চিন্তা করো না; সব ব্যবস্থা করছি। বিষয়টি নিয়ে যার সঙ্গেই পরামর্শ করেছি সবাই বলেছে জায়গা-সম্পত্তির ব্যাপার। একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে ফিরে পাওয়া কঠিন। তিল তিল করে বাবার চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা দিয়ে চাচার কাছ থেকে ভিটেমাটি দখলমুক্ত করলাম। ফের দীর্ঘ হলো বাবার চিকিৎসাপ্রক্রিয়া! সেদিন বাবার অসহায় মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। বুক ফেটে কান্না এলো। চেপে থাকা যন্ত্রণা নীরবে হজম করলাম। চোখ মুছে হাসিমুখ নিয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বাবাও এক গাল চওড়া হাসি উপহার দিলেন। জানি, এ হাসিতে তিনি লুকাতে চান মনের আকুতি, সুস্থ হওয়ার সুপ্ত ব্যাকুলতা। ঝরঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বাবার হাত ধরে বললাম, ‘বাবা, তুমি আমায় ক্ষমা করো, প্লিজ’।

ঢাকায় এসে সন্ধ্যায় হাঁটতে যাওয়ার বিলাসিতা ছেড়ে দিলাম! তার বদলে জোগাড় করলাম দুটি টিউশনি। মাসে মাসে বাড়তে থাকল জমানো টাকার পরিমাণ। তবে সেই সঙ্গে বাড়তে লাগল শঙ্কা, আবার যদি নতুন কোনো সমস্যা বা প্রয়োজন দেখা দেয়। বাড়তে থাকল স্বপ্নের পিছে ছুটে চলার অনিশ্চয়তা।

তন্ময় আলমগীর

জঙ্গলবাড়ী, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।

 

হারানো পে-ইন স্লিপ ও ক্ষমতার বিড়াল

তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ২০০৪ সাল। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির ডেট দিয়েছে। কাগজপত্র নিয়ে গিয়ে ভর্তি হব, এমন সময় একটি ছোট সমস্যায় পড়লাম। প্রথম বর্ষের পে-ইন স্লিপ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার একটা বদভ্যাস এই যে পরীক্ষা, ফরম জমা এবং ভর্তির ক্ষেত্রে লাস্ট ডেটে কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়া। এ জন্য অবশ্য কখনো সমস্যায় পড়িনি। কিন্তু সেবার আটকে গেলাম। মহাবিপদ। কী করা যায়?

শহীদুল্লাহ কলাভবনে গিয়ে ডিপার্টমেন্টের সেকশন ইনচার্জের সঙ্গে দেখা করলাম। বিনয় মেশানো গলায় বললাম, ‘রহমান ভাই, ভর্তির লাস্ট ডেট তো আগামীকাল। কাগজপত্র ও ছবি সত্যায়িত করা হয়েছে, টাকাও রেডি। কিন্তু প্রথম বর্ষের পে-ইন স্লিপটা খুঁজে পাচ্ছি না।’

রহমান ভাই অত্যন্ত ভদ্রলোক। হেল্পফুল। কিন্তু তিনি আমাকে ভয় পাইয়ে দিলেন। কোনো মানুষের ক্যান্সার হলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ডাক্তার কি রোগীকে মুখের ওপর বলে দেয় : আপনার তো ক্যান্সার। আপনি মারা যাচ্ছেন...। রহমান ভাই বললেন, ‘পে-ইন স্লিপ ছাড়া তো ভর্তি হতে পারবেন না।’

তাহলে উপায়? আমার গলা তখন শুকিয়ে আসছে। তিনি বললেন, ‘বাসায় গিয়ে ভালো করে খুঁজে দেখেন।’

আমি সরল মনে বললাম, ‘অনেক খুঁজেছি। পাওয়া যাচ্ছে না।’

রহমান ভাই নির্দয় ভঙ্গিতে বললেন, ‘তাহলে তো আপনার ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। কোনোভাবেই আর ভর্তি হতে পারবেন না। কেউ সুপারিশ করলেও কাজ হবে না।’ এরপর কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না দিয়ে অন্যদিকে চলে গেলেন। ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গিয়ে বসলাম। ভাবছি, কী করা যায়?

মন টিকল না। বেরিয়ে এলাম। একটু পর, আমতলায় গিয়ে বসলাম। অস্থির লাগছে। কী করা যায়? কী করব? ভেবে আর কূল পাই না।

তখন, হঠাৎ কী মনে হলো বা কেউ একজন হয়তো বুদ্ধি দিল, প্রশাসন ভবনে যেতে, যেখানে কাগজপত্র জমা নেয় এবং পে-ইন স্লিপ যেখান থেকে দিয়েছিল। ছুটে গেলাম তখনকার পুরনো প্রশাসন ভবনের দোতলায়, পশ্চিম দিকের একটি ঘরে। কালো ও মোটা করে একজন বসে আছেন। মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। চোখে কালো চশমা। গম্ভীর। এই মুহূর্তে তাঁর নামটা মনে পড়ছে না। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। নীরবতা ভেঙে একসময় তিনিই বললেন, ‘কী চাই?’

বিষণ্ন মুখে বললাম, ‘একটা ঝামেলায় পড়েছি।’

তিনি জানতে চাইলেন, ‘কী ঝামেলা?’ তাঁকে বিস্তারিত বললাম। তিনি চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রহমান এটা বলেছে?’

‘জি।’

তিনি আর কোনো কথা বললেন না। কিছু জিজ্ঞেসও নয়। টেবিলের একপাশে রাখা টেলিফোনটা টেনে নিয়ে তিনি কোথাও ফোন করলেন : রহমান সাহেব বলছেন?

ওপাশে কী কথা হলো, বোঝা গেল না।

‘আপনি প্রথম বর্ষের মাসউদকে বলেছেন, যে তার ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে?’

ওপাশে হয়তো যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা হলো। তিনি তাকে থামিয়ে দিলেন, ‘আমি ছেলেটাকে পাঠাচ্ছি। আপনি এখন, এই মুহূর্তে ভর্তি করে নেবেন।’ টেলিফোনে হয়তো কোনো কথা বা যুক্তি আসতে চায়, তিনি কড়া করে বললেন, ‘একজন ছাত্রের ভর্তি যদি বাতিল হয়ে যায়, আমরা কী করতে বসে আছি এখানে? কাল যেহেতু লাস্ট ডেট, আপনি এখনই ওকে ভর্তি করিয়ে নিন। আর মাসউদের পে-ইন স্লিপের একটি কপি তো আমাদের এখানে সংরক্ষিত আছে।’

টেলিফোন রেখে তিনি বললেন, ‘আপনি সোজা ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ভর্তি হয়ে যান। কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবেন।’ আমি মাথা নেড়ে সায় দিই। মনে পড়েছে, এমন ভঙিতে তিনি বললেন, আর হ্যাঁ, ভর্তির কাজ শেষ হলে মতিহার থানায় যাবেন। সেখানে গিয়ে ‘পে-ইন স্লিপ হারিয়েছে’ মর্মে একটি জিডি করবেন। জিডির একটি কপি নিজের কাছে রাখবেন, আর এক কপি এখানে জমা দেবেন। ঠিক আছে?’

‘জি।’

‘এখন আসুন।’ আমি সোজা ডিপার্টমেন্টে চলে যাই। রহমান সাহেব নীরবে ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দেন।

২.

আমাদের বিভাগে একজন অদ্ভুত শিক্ষক ছিলেন। অদ্ভুত এবং অন্য রকম। ক্লাসে কেউ দেরি করে এলে ঢুকতে দিতেন না। কেউ চুপ করে ঢুকে পড়েছে আর তিনি পরে টের পেয়েছেন, সে ক্ষেত্রেও তাকে বের করে দিতেন। অনেক সময় বের করে দিয়েও হা-হা-হা করে হেসে আবার বলতেন, আসো। হাজিরা নিতেন ক্লাস শেষ হলে, যাতে উপস্থিতি দিয়েই কেউ পালাতে না পারে। তাঁর স্টাইলে ছিল এমন :

ক্লাসে ঢুকেই বলবেন, রোল নম্বর ১৫৩৯?

জি, স্যার।

দাঁড়াও।

ছাত্র বা ছাত্রীটি দাঁড়িয়েছে।

স্যার বললেন, গত ক্লাসে কী আলোচনা করেছিলাম, একটু বলো?

সে যদি উত্তর বলতে না পারে, বা যদি বলে—স্যার, গত দিন আসিনি।

এতে তিনি খুব রাগ করতেন। বলতেন, দাঁড়িয়ে থাকো।

আসলে তিনি পড়াতেই পারতেন না। প্রচুর হোমওয়ার্ক করে কিছু নোট নিয়ে আসতেন। দেখে দেখে পড়াতেন। ক্লাসে কোনো শব্দ, হাসি বা হঠাৎ প্রশ্ন করা একেবারে পছন্দ করতেন না। আর বলতেন, কোনো প্রয়োজনেই শিক্ষকের বাসায় কখনো যাওয়া যাবে না। আমরা যেতাম না। কিন্তু ভীষণ মন খারাপ করতাম, যখন আমতলায় বা ডিন ভবনের পেছনে চা খেতে গেলে দেখতাম, অন্য বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ ও আড্ডা। খুব মন খারাপ লাগত।

৩.

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এমন দুই ধরনের ক্ষমতাবান, ঘাউড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তার কথা মনে পড়ে। আর মন পোড়ে। আর মন বিষণ্ন হয়। কিছুতেই ভুলতে পারি না।

মাসউদ আহমাদ

মগবাজার, ঢাকা।

মন্তব্য