kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

লিটনের প্রত্যয়

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার মিফতাহ আহমেদ লিটন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে গড়ে তুলেছেন প্রত্যয় ফাউন্ডেশন। পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়া, বাল্যবিয়ে ও মাদকের বিস্তার রোধে কাজ করে সংগঠনটি। লিটন ও প্রত্যয়ের গল্প বলছেন মাহফুজ শাকিল

১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লিটনের প্রত্যয়

দেশ-বিদেশে প্রত্যয়ের প্রায় ৬০০ স্বেচ্ছাসেবী। এখন ৭০ জন শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় সহযোগিতা দিচ্ছে প্রত্যয়। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের বিনা মূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রত্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম। মোট ৩৮৫ জন চা শ্রমিক ও তাদের সন্তানেরা এখন পর্যন্ত কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এখন তিনটি ব্যাচে ৬০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ ছাড়া প্রত্যয় বন্যা মোকাবেলা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিস্তার, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, বাল্যবিয়েবিরোধী সচেতনতা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল, মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার কাজও করে।

 

ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল

২০১৭ সালে চা শ্রমিক বাবুলাল দাসের বারান্দায় গড়ে তোলা হয় প্রত্যয় শেখ রাসেল ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল। যেসব শিশু শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত হয়ে চা শ্রমিকের কাজ করত তাদের বেশির ভাগই এখন এই স্কুলের শিক্ষার্থী। স্কুলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলে। শুরুতে শিশুদের স্কুলমুখী করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে এখন অভিভাবক, শিক্ষার্থী—সবাই উৎসাহী। গত দুই বছরে প্রায় এক হাজার জনকে বিনা মূল্যে পাঠ দেওয়া হয়েছে এই স্কুল থেকে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্ক, কুইজ, তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, মাদকবিরোধী ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ট্রেনিং প্রদানসহ বছরব্যাপী শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা ও ঝরে পড়া রোধে কাজ করছে স্কুলটি। এখন লিটনের নিজস্ব পাঁচ শতক জায়গায় স্কুলটি স্থানান্তরিত হয়েছে। স্কুলে শিক্ষক আছেন পাঁচজন।

বিশ্বকে জানছে চা শ্রমিকের সন্তানরা

প্রযুক্তিকে, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতেই কাজ করছে প্রত্যয়। ‘টেকনোলজি ফর টি’ নামের এ কার্যক্রমের মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। শুরুর দিকে তিনটি কম্পিউটার নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে প্রণোদনা পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন। এই অর্থ দিয়ে সাতটি কম্পিউটার কিনে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ‘প্রযুক্তি এখন সবার দোরগোড়ায়’—এ স্লোগান নিয়ে ইউনিয়নভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চালু করেছে প্রত্যয়। আগামী তিন বছর এটি চলবে। সাগরনাল চা বাগানের বাসিন্দা শ্রেয়া কানু ফুলতলা বশির উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। কম্পিউটার শিখে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মারফত এখন গোটা বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। একই বাগানের অঞ্জলি অলমিক, বিনা কানু, বেবকি শুণ্ডি—সবাই কম্পিউটার শিখছে। শ্রেয়া, অঞ্জলি ও বীণা বলল, ‘এখানে না এলে কম্পিউটারও জানতাম না, বিশ্বকেও চিনতাম না।’

 

লিটনের পুরস্কার

২০১৭ সালে লিটন জয় বাংলা ইয়থ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তিনি বললেন, ‘পুরস্কার ও যেকোনো অর্জন সব সময়ই অনুপ্রেরণার। তখন এক হাজারেরও বেশি তরুণ মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তার মধ্যে আমিও একজন। এই পুরস্কার পেয়ে সংগঠনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি।’

সামনের দিনগুলো

‘ভ্রাম্যমাণ কম্পিউটার স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্স এবং টেকনোলজি ফর অল’ নামের আরেকটি প্রজেক্ট চালু, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন, শ্রমিকদের সন্তানদের নিয়মিত বিনা মূল্যে পাঠদান, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করাসহ আরো কিছু প্রকল্প হাতে নিচ্ছে প্রত্যয় ফাউন্ডেশন। প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে সহায়তা ও সেবাকেন্দ্র। সেখান থেকে তাদের কয়েকজন সেবা গ্রহণ ও পড়াশোনায় সহযোগিতা পাচ্ছে।

 

প্রত্যয়ের প্রাপ্তি

ইয়থ অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও ইয়থ আইকন-২০১৮, সোনার বাংলা সমাজকল্যাণ সংস্থার সমাজসেবা সম্মাননা-২০১৮ এবং আমি ঠিক, দেশ ঠিক সম্মাননা-২০১৮ অর্জন করে প্রত্যয়। ইয়াং বাংলার মতো একটি বড় প্ল্যাটফর্মে স্বীকৃতি অর্জন করায় তাঁদের দায়িত্ব আরো বেড়েছে বলেই সংগঠনের কর্মীদের বিশ্বাস।

 

লিটনের ভাবনা

লিটন বললেন, ‘আমাদের এলাকাটি দেশের এক প্রান্তে। পিছিয়ে পড়া নারীদের আমরা তথ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নত ও টেকসই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে চাই; বিশেষ করে বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সচেতন করা, অক্ষরজ্ঞানহীন নারীদের শিক্ষিত করে তোলা, স্বাস্থ্যসচেতন করা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করা, ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলা এবং স্কুল-কলেজে পড়া মেয়েদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে আমরা কাজ করছি।’

ছবি : লেখক

মন্তব্য