kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এইতো জীবন

রাজ্জাক হার মানছেন না

অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ ছোটবেলায়ই শুরু। জীবিকার তাগিদে কাজে নামতে হয়েছে ওই ছোটবেলায়ই; কিন্তু পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল প্রবল। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেলে ইচ্ছাটা আরো বড় হয়। আব্দুর রাজ্জাক শেখের গল্প বলছেন মোস্তাফিজ নোমান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজ্জাক হার মানছেন না

নাইট গার্ডের ডিউটিতে

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার আনছার শেখের ছেলে রাজ্জাক। বয়স তখনো ১০ হয়নি। দিনমজুর বাবার সঙ্গে নিজেও কাজে লেগে যান রাজ্জাক। তবে স্কুল কামাই করে না। এর মধ্যেই পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পেয়ে যান। পড়াশোনা তাঁর এখানেই শেষ হওয়ার কথা। কারণ বড় দুই বোনের লেখাপড়ার খরচ জোগানো, তার ওপর আছে মায়ের চিকিৎসার খরচ। বাবা আনছার শেখ কোনোভাবে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তখন এক হোমিও ডাক্তারের ফার্মেসিতে চাকরি নেন রাজ্জাক; কিন্তু পড়ালেখা করার স্বপ্ন দেখা ছাড়েন না।

 

এইচএসসিতেও ‘এ’ গ্রেড

অন্য আট-দশজনের মতো খেলার মাঠে ছোটাছুটি করে কৈশোর কাটানোর সুযোগ পাননি রাজ্জাক। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সম্বল ছিল না। পুঁজি না থাকায় ব্যবসার কথা চিন্তাও করেননি। বোনদের পড়াশোনার খরচ না জোগাড় করতে পেরে দরিদ্র পিতা তাদের বিয়ে দিয়ে দেন। বার্ধক্যের কারণে বাবা নিজে কাজ থেকেও হাত গুটিয়ে নেন। দায়িত্ব এসে পড়ে রাজ্জাকের ওপরই। এসবের মধ্যে রাজ্জাক ‘এ’ গ্রেডে এসএসসি পাস করেন। এবার এইচএসসিতে ভর্তি হতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে সংসার—সব খরচও। রাজ্জাক গণমিলন ফাউন্ডেশন নামের এক এনজিওতে চার হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন; কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার, মায়ের চিকিৎসা আর পড়াশোনার খরচ চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই রাতে দুটি টিউশনিও করতে থাকেন। একপর্যায়ে এইচএসসিও পাস করেন ‘এ’ গ্রেডে।

এখানে-সেখানে

কাজের খোঁজে বাগেরহাট থেকে রাজ্জাক চলে আসেন ঢাকায়। অনেক কষ্টে আট হাজার টাকা বেতনে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ নেন। এর মধ্যে ভর্তি হন টঙ্গী সরকারি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগে। চাকরির কারণে নিয়মিত ক্লাস করার সুযোগ পান না রাজ্জাক। একসময় নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তাঁকে বদলি করে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। এর মধ্যে মা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে বাগেরহাট হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ জোগাতে গিয়ে প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় বসা হয়নি রাজ্জাকের। শিক্ষকরা সামনের বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। নাইট গার্ডের ডিউটি শেষ করে সকালে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে সপ্তাহে তিন দিন কলেজে ক্লাস করেন।  অনেক দুপুরেই রাজ্জাক পণ্যবাহী গাড়ির মাল খালাসের কাজে লাগেন। এতে তিন থেকে পাঁচ শ টাকা আয় হয়। পাহারায় থাকার সময় রাজ্জাকের হাতে দু-একটা বই দেখা যায়। বাজারের বাতির আলোতেই বইয়ে মনোযোগ দেন।

রাজ্জাকের স্বপ্ন

পড়াশোনা শেষ করে তিনি বিসিএস কর্মকর্তা হতে চান। অসহায় দরিদ্র শিশুদের জন্য তৈরি করতে চান শিক্ষার সুন্দর পরিবেশ। অভাব-অনটনে যেন কারোরই পড়াশোনা আটকে না যায় সে চেষ্টা রাখবেন রাজ্জাক। রাজ্জাক বলছিলেন, ‘সমাজের জন্য কিছু করতে চাইলে আগে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তাই আমি শত সমস্যায়ও পড়াশোনা বাদ দিইনি। লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারায় জীবনসংগ্রামের কষ্টকে আমার কষ্টই মনে হয় না। আর মা-বাবার সেবা করতে পেরেও ভালো লাগে। এটা আমার দায়িত্ব।’

তাঁকে নিয়ে

‘রাজ্জাক অনেক মেধাবী ছেলে। তিনি তাঁর মা-বাবা ও পরিবারকে অনেক ভালোবাসেন। আর তাই এত পরিশ্রম করার পরও তাঁর মধ্যে কোন ক্লান্তি বা কষ্টের ছাপ পাওয়া যায় না। সারা রাত নাইট গার্ডের ডিউটি করে সকালে একটু ঘুমিয়ে কখনো কলেজে, আবার কখনো বাজারে কুলির কাজ করে জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।’ দায়িত্বের ব্যাপারেও তিনি অনেক সচেতন। এরই মধ্যে বাজারের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ত্রিশাল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা সরকার আরো বলেন, রাজ্জাক অনেক মেধাবী আর নম্র-ভদ্র। নিজের সংসার পরিচালনা আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে তিনি জীবনের সঙ্গে যে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়।

 

মন্তব্য