kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

ভিনদেশে বাংলাদেশি

আকলু মিয়া একাই জমিয়ে দিয়েছেন

পূর্ব লন্ডনের শ্যাডোয়েল এলাকার চ্যাপমেন স্ট্রিট। হঠাৎ গিয়ে হাজির হলে অবাক হতে পারেন। কারণ চলতে চলতে দেখবেন মাছের বাজার, কাঁচাবাজার বা মাংসের বাজার। এর জন্য আকলু মিয়ার নাম করতে হয়। জেনে এসেছেন জুয়েল রাজ

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আকলু মিয়া একাই জমিয়ে দিয়েছেন

চ্যাপমেন স্ট্রিটে প্রথম বসেছিল মাছের বাজার। দিনে দিনে ১৬টি দোকান বসে, যার সবগুলোর সঙ্গেই বাজারজুড়ে দেওয়া। আকলু মিয়া পাঁচ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে লন্ডনে যান। ১৯৯০ সালে তাঁর বাবা নাজির মিয়া শ্যাডোয়েলে একটি মুদির দোকান দেন। নাম ছিল শ্যাডোয়েল গ্রসারি। একটু বড় হয়ে আকলু বাবার ব্যবসায় যুক্ত হন। তারপর ১৯৯৭ সালে তিনি ভাবতে থাকেন শুধু মাছের একটা দোকান করলে কেমন হয়, যেখানে শুধুই মাছ থাকবে। বাংলাদেশের মাছ। মানুষ দেখে-শুনে পছন্দ করে মাছ কিনতে পারবে। যদিও আগে থেকেই লন্ডনের গ্রসারি শপগুলোতে মাছ বিক্রি হয়; কিন্তু পছন্দ করার সুযোগ বেশি নেই। আর শুধু মাছের দোকান তো নেই। কিন্তু চাইলেই তো সম্ভব নয়। বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে ভাবনা বিনিময় করতে থাকলেন আকলু। বেশির ভাগই ব্যাপারটাকে পাগলামি মনে করল। কেউ কেউ বকাঝকাও দিল। প্রায় সবারই ধারণা, শুধু মাছের দোকান চলবে না লন্ডনে।

 

কিন্তু ভাবনাটা গেল না

আকলু মিয়া নাছোড়বান্দাগোছের মানুষ। মাথা থেকে ভাবনাটা তাড়াতেই পারছিলেন না। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ২০০৪ সালে এক বন্ধুকে সঙ্গী করে ছোট একটা মাছের দোকান দিলেন। নাম দিলেন মাছ বাজার। দোকানের সাজসজ্জায় খরচ করেছিলেন ১০ হাজার পাউন্ড। তবে মাছ কিনতে নগদ টাকা গুনতে হয়নি। মাছ সরবরাহকারীদের সঙ্গে আগে থেকেই সুসম্পর্ক ছিল, তারা বাকিতে মাছ দিয়েছিল। কিন্তু বড়সড় রেফ্রিজারেটর ছিল না তাদের। তাই কিছু মাছ মেঝেতেও রাখতে হয়েছিল। স্থানীয় স্বাস্থ্য দপ্তর এ কারণে জরিমানাও করেছিল। কিন্তু সুখের ব্যাপার হলো, ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিল ভালো। বলছিলেন আকলু মিয়া, ‘আমরা বিভিন্ন আকারের মাছ রাখছিলাম। অনেক রকমের মাছ। লন্ডনের বাঙালিরা বুঝি এত দিন এরই অপেক্ষায় ছিল। তাই শুরু থেকেই ক্রেতা পাচ্ছিলাম ভালো।’

 

জমে উঠল

বছর তিনেক বাদে পাশেই বড় একটা জায়গা পেয়ে যান আকলু মিয়া। কিন্তু পার্টনার বন্ধু কোনোভাবেই ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তাঁর ধারণা ছিল, জায়গা বদলালে ব্যবসা মার খাবে। তিনি ব্যবসা ছেড়ে চলে গেলেন। আকলু মিয়া শুরু করলেন নতুন করে। বেশ বড়সড় জায়গা। পুরো ব্রিটেনেই বুঝি খবর ছড়িয়ে গেল। কয়েক শ মাইল দূরের শহর থেকেও লোকে মাছের বাজার দেখতে এলো; যেমন—বার্মিংহাম, লুটন বা নিউক্যাসেল থেকে। কেউ কেউ লন্ডনে বেড়াতে এসেও এক পাক ঘুরে যেত। বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি। মানুষের মুখে মুখেই ছড়িয়ে যায় মাছ বাজারের গল্প।

 

পাশে কাঁচাবাজার

মাছ কেনার পর ক্রেতাদের শাকসবজি কেনার জন্য গ্রসারিতে যেতে হতো। তাই পাশেই একটা দোকান খুললেন আকলু মিয়া, নাম দিলেন কাঁচাবাজার। বাংলাদেশি শাকসবজির দোকান। কিছুদিন পর তার পাশেই করলেন মিট বাজার। সব ধরনের হালাল মাংসের দোকান। আর মিট বাজারের পাশে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকান দিলেন। নাম ফ্যামিলি বাজার। এরপর দেখাদেখি অনেকেই দোকান দিলেন। কোনোটার নাম লাল বাজার, কোনোটার বন্দর বাজার। এ ছাড়া আছে বাংলা বাজার, কার্পেট বাজার ইত্যাদি। সব মিলিয়ে এ ধরনের ১৬টি দোকান এক সারিতে।

 

জিজ্ঞেস করলাম

কাঁচাবাজারে কথা হয় আকলু মিয়ার সঙ্গে। জানতে চাইলাম, এ সাফল্য তো অপ্রত্যাশিত? আকলু মিয়া বললেন, ‘আমি ক্রেতাদের পছন্দ করার সুযোগ করে দিয়েছি। এটা ক্রেতাদের ভালো লেগেছে। এখন ব্রিটেনের অনেক শহরেই মাছ বাজার নামে দোকান খোলা হচ্ছে। আমাদের নিজেদেরই বার্মিংহামে মাছ বাজার আছে। হোয়াইট চ্যাপেল আর ব্যাকটনেও মাছ বাজার নামে বেশ বড় দোকান আছে। আমাদের ১০ হাজার পাউন্ড আজ ১০ মিলিয়ন পাউন্ডে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।’ অবাক করা বিষয়, দামও খুব বেশি নয়।

 

কালীজুরী থেকে

সিলেটের গোলাপগঞ্জের কালীজুরী থেকে এসেছেন আকলু মিয়ার বাবা নজির আলী ও মা ফয়জুন্নেছা বেগম। সব বাজারের কাজ একা সামলানো কঠিন হচ্ছে আকলু মিয়ার। বড় ভাই হারুন মিয়া, ছোট ভাই হাসান মিয়াও দেখাশোনা করছেন বাজারগুলো।

ফরিদ আহমেদ নামে এক ক্রেতা মাছ কিনছিলেন। তিনি বললেন, মাছ বাজারের বিশাল পরিসর আসলে মূল আকর্ষণ। এত বেশি মাছ গ্রসারি শপগুলোতে পাওয়া যায় না। আর মাছ দেখতেও ভালো লাগে। আমরা বাংলাদেশিরা অনেক রকম মাছ দেখে ও কিনে অভ্যস্ত। আমাদের জন্য জায়গাটা আকর্ষণীয়। আর চ্যাপমেন স্ট্রিটে এলে এখন মনে হয় বাংলাদেশেই কেনাকাটা করছি।   

ছবি : লেখক

মন্তব্য