kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

মক্কার তিন পাহাড়

মক্কায় মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত তিনটি পাহাড় বেড়িয়ে এসেছেন মাসুম সায়ীদ। এ নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ আয়োজন

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মক্কার তিন পাহাড়

সওর পাহাড়। ছবি : মাসুম সায়ীদ

আরাফাতের পাহাড়

আরাফাতের এই ছোট্ট পাহাড়টিরই নাম জাবালে রহমত বা দয়ার পাহাড়। এর পাদদেশেই আরাফাতের বিশাল ময়দান। বলা হয়ে থাকে, বেহেশত থেকে নির্বাসিত হয়ে আদম (আ.) আর বিবি হাওয়া এখানেই খুঁজে পেয়েছিলেন পরস্পরকে। এখানেই পেয়েছিলেন ক্ষমা। সেই থেকে এই নাম। জিলহজ মাসের নবম দিনে এখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করা হজের অপরিহার্য কর্তব্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণটি দিয়েছিলেন এখানে দাঁড়িয়েই। আর মানবজাতির জীবন বিধান হিসেবে ইসলামকে মনোনয়নের ঘোষণাটি নাজিল হয় এখানেই—‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মবিধানকে পূর্ণাঙ্গ করলাম। তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ৩)

 

 

পাহাড় চূড়ায়

এগিয়ে গেলাম পাহাড়ের কাছে। আশপাশের সব পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন এটি। মাত্র ৭০ মিটার (২১০ ফুট) উঁচু। হাত রাখলাম পাথরের গায়ে। পশ্চিম পাশে পাথর কেটে বানানো হয়েছে সিঁড়ি। সেটি ধরে ওপরে উঠে যাচ্ছে শত শত মানুষ। নামছেও। আমিও উঠলাম। পাথরের গায়ে কতজনে লিখে গেছে নাম। আদম-হাওয়ার মিলনের পাহাড়ে এসে ভালোবাসার মানুষটিকে মনে পড়বে এটাই তো স্বাভাবিক। খোদার দয়া আর ক্ষমা কি আমি পাব না এখানে এসে? ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি নিজের ওপর অনেক জুলুম করে ফেলেছি, তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না করো, দয়া না করো আমি তো ধ্বংস হয়ে যাব।’ লোকারণ্যে একা হয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। তারপর নেমে এলাম নিচে।

জাবাল আল-নূর

এই সেই পাহাড়! এখানেই হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রথম দেখা দিয়েছিলেন জিবরাইল (আ.)! পাহাড়টির আদি নাম ফারান। কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর নাম হয়েছে জাবাল আল-নূর, মানে আলোর পাহাড়। নিরেট পাথরের জোড় পাহাড়। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা। যেন মস্ত একটা সিংহ শুয়ে আছে দুই পা সামনে বাড়িয়ে। এ পাহাড়টাও বিচ্ছিন্ন চারদিক থেকে। দুই হাজার ১০৬ ফুট উঁচু। মক্কা থেকে দূরত্ব প্রায় তিন মাইল।

গুহার পথে

লোকজন সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে। সিঁড়িটা পাহাড়ের মাঝ বরাবর। আমি সিঁড়ি বাদ দিয়ে উঠতে শুরু করলাম দক্ষিণ-পূর্ব পাশ দিয়ে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ছোট-বড়-মাঝারি অনেক আলগা পাথর পাহাড়ের গায়ে। সেগুলো এড়িয়ে ওঠা যাচ্ছিল সহজেই। এখানে-ওখানে গজিয়ে উঠেছে ঘাস। আধা ঘণ্টার মধ্যে উঠে এলাম পূর্ব অংশের চূড়ায়—মানে সিংহটার পিঠে। এরই মধ্যে সূর্য পূর্ব দিকের পাহাড় ছাড়িয়ে উঠে গেছে ওপরে। আলোয় ঝকঝক করছে আলোর পাহাড়! চলে এলাম মূল পাহাড়টিতে। বাকি পথ উঠতে হবে সিঁড়ি বেয়ে।

চূড়া পেরিয়ে গুহা

সিঁড়ির ধাপগুলো নিচু। পথটা আঁকবাঁকা। মাঝে মাঝে বিশ্রামের জায়গা আছে। অল্প-বৃদ্ধ-মধ্য সব বয়সী নারী-পুরুষ সিঁড়ি ভেঙে উঠছে। উঠতে কষ্ট হচ্ছে, তবু প্রশান্তির একটা ছায়া সবার চোখে-মুখে। বেশির ভাগ লোকই এশিয়া আর আফ্রিকার। আরো প্রায় আধা ঘণ্টা পর পা রাখলাম চূড়ায়। চূড়ার সামনের দিকে দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এখান থেকে চোখে পড়ল মাসজিদুল হারামসংলগ্ন ক্লক টাওয়ার। পশ্চিম-দক্ষিণ কোনে। পাহাড়ের এ দিকটা যেন সত্যি ঝুঁকে আছে বায়তুল্লাহর দিকে। খানিকটা জায়গা ঝুলে আছে বারান্দার মতো। এর কিনারে রেলিং দেওয়া হয়েছে। লোকজন নামাজ পড়ছে সেখানে। চূড়ার পশ্চিম-উত্তর কিনারে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল হেরা গুহা। বেশ খানিকটা নিচে। পর্বতের পশ্চিম-উত্তর ঢাল ঘেঁষে। গুহামুখে লোকজনের ঠাসাঠাসি।

মন তখন অতীতমুখো

হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৩৫ বছর অতিক্রম করেছেন তখন। প্রায়ই একা একা বসে ভাবতেন তিনি। নির্জনে ধ্যান করাকে আরবি ভাষায় বলে তাহন্নুস। আর এর জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পান ফারান পর্বতের এই হেরা গুহায়। গুহাটা ঠিক কাবামুখী। প্রতিবছর রমজান মাসটা তিনি কাটিয়ে দিতেন এই গুহায়। খাদিজা (রা.) খাবার আর পানি পাঠিয়ে দিতেন। এক রাতে জিবরাইল (আ.) এলেন। তাঁর হাতে এক খণ্ড রেশমি কাপড়। তাতে কিছু লেখা। জিবরাইল (আ.) বললেন, ‘পড়ুন।’ মুহাম্মদ (সা.)-এর জবাব—‘আমি পড়তে পারি না।’ এরপর জিবরাইল (আ.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে চাপ দিলেন। পর পর তিনবার। এবার তিনি পড়তে পারলেন—‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন...। ’ নাজিল হলো সুরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত।

গুহার ভেতর

ভিড় বাড়ার আগেই ভেতরটা দেখে নেওয়া ভালো। পা বাড়ালাম গুহার পথে। ওপর থেকে গুহা সমান্তরালে নিচে নামতে হয় পর্বতের দক্ষিণ পাশ দিয়ে। আর গুহাটা উত্তর পাশে। মাঝখানে চেপে বসে আছে বিশাল একটা পাথর। গুহার পথটা এই পাথরের নিচ দিয়ে। পথটা খুবই সরু। যেতে হয় উবু হয়ে। গুহার সামনে সংকীর্ণ জায়গাটায় প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর যেতে পারলাম ভেতরে। লম্বায় ১০-১২ ফুট আর পাশে পাঁচ ফুটের মতো। একজন মানুষ অনায়াসে দাঁড়াতে পারে ভেতরে। লোকের ভিড়ে গুহায় প্রবেশ করা যেমন কষ্টকর, তেমন বের হওয়াটাও।

সওর পর্বত

ঝকঝকে সকাল। চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে সকালের নাশতা সেরে নিচ্ছিলাম। এটা একটা ছোট্ট মহল্লা। মক্কা থেকে পাঁচ মাইল দক্ষিণে। ইয়েমেনে যাওয়ার প্রাচীন সেই পথের ওপর। আর পর্বতটা উঠে গেছে সোজা চার হাজার ৬১০ ফুট উচ্চতায়। চূড়ার একটা গুহা আমার গন্তব্য।

যাত্রা শুরু

চা শেষ করার আগেই সামনের চত্বরে একটা বাস এসে থামল।

এক দল লোক বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল পর্বতের দিকে মুখ করে। আর গাইড উর্দুু ভাষায় বয়ান শুরু করল।

‘গারে সওর’ শব্দটা কানে আসতেই ইতিহাসটা ভেসে উঠল

মনের পর্দায়।

গুহামুখে মাকড়সার জাল

হিজরতের সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) আবু বকর (রা.)-কে নিয়ে রাতের বেলায় আশ্রয় নেন পর্বত চূড়ার গুহায়। তিন দিন পর এখানে থেকে বেরিয়ে পড়েন মদিনার উদ্দেশে। অভিজ্ঞ মরুচারী আব্দুল্লাহ ইবন আরকাদ তাঁদের দুর্গম আর অপ্রচলিত পথে পৌঁছে দেন মদিনায়। মক্কার এক দল দুর্বৃত্ত তাঁদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল গিরিগুহার মুখে। কিন্তু গুহামুখের মাকড়সার জাল আর বাসায় ডিমে তা দিতে থাকা কবুতর দেখে তারা বিভ্রান্ত হয়েছিল। এখনো অনেক কবুতর আছে এখানে। চূড়া থেকে সাঁই করে নেমে আসে তীরের মতো। আবার উঠে যায় উজান বাতাস ঠেলে। রাসুল (সা.) ভেতর থেকে শুনতে পাচ্ছিলেন তাদের কথাবার্তা। তিনি অভয় দিচ্ছিলেন তাঁর সঙ্গীকে—‘ভয় কোরো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’

চূড়ার পথে

পর্বতটার বিস্তার পূর্ব-পশ্চিমে। শক্ত গ্রানাইটের পাশাপাশি আছে নরম বেলে পাথরও। সাপের মতো একটা সরু পথ পর্বতের গা বেয়ে উঠে গেছে চূড়ায়। সে পথে না গিয়ে ওঠা শুরু করলাম পূর্ব দিক থেকে আড়াআড়ি। পাতাশূন্য একটা কাঁটাগাছে চড়ুই পাখির মতো কয়েকটা পাখি। ছোট একটা বাবলাগাছ। ক্যাকটাসের ঝোপ। তাতে নাক ফুলের মতো নীল ফুল। পাথরের একটা কার্নিশে গাঢ় কমলা রঙের তিনটা ফুল। সূর্যমুখীর মতো। পাথরের বুকেও ফুল ফোটে! অবাক আমি। মাঝে মাঝে পানির ঢল নামার চিহ্ন। পানির তোড়ে ক্ষয়ে যাওয়া পাথরের কঙ্কাল। আর অসংখ্য গুহা। এখানে-ওখানে। সওর পর্বতটা আসলে গুহারই পর্বত। বেলে পাথরগুলো ক্ষয় হয়ে তৈরি হয়েছে এসব গুহা। পর্বতের কোমর বরাবর একটা চাতাল। তার আগেই আমাকে উঠে আসতে হলো মূল পথে। এখান থেকে ঢাল এত খাড়া যে পথ ছাড়া ওঠার কোনো উপায়ই নেই। চাতালে এক পাকিস্তানি দোকান সাজিয়েছেন। একজন মহিলা বেশ ভারী শরীর। এক পা নেই। এক পা নিয়েই ক্র্যাচে ভর করে উঠে যাচ্ছেন ওপরে। চূড়ার কাছাকাছি পথের ধারে একটা পাথর দেখে থমকে দাঁড়ালাম। বিরাট রুই মাছ যেন পানি থেকে মাথা তুলেছে ঘাই দেওয়ার জন্য। আবার অবাক হলাম।

গুহা

পৌনে ১১টার দিকে পৌঁছলাম চূড়ায়। কয়েক একর জায়গাজুড়ে চূড়াটা। মাঝ বরাবর মাথা উঁচু করে আছে কয়েকটা পাথরে চাই। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে। তার ওপর চেপে বসে আছে কয়েকটা বিরাট বিরাট পাথর। এরই নিচে গুহাটা। তাতে দাঁড়ানো যায় না। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে বসে থাকতে হয়। সিরিয়ান তরুণদের একটা দল গুহামুখের বড় পাথরটার ওপর বসে দফ বাজিয়ে গান গাইছে। মদিনার বালক-বালিকারা যেটা গেয়ে স্বাগত জানিয়েছিল প্রিয় রাসুলকে—‘তালা আ’ল বদরু আ’লইনা মিন সানিয়াতুল বিদা/ ওয়া জাবাশশুকরু আ’লাইনা মা’দাআ’লিললাহি দায়ই।’ আরো কয়েকটা নাতে রাসুলের পর তাদের মধ্যে থাকা একমাত্র প্রবীণ ব্যক্তি বক্তৃতা শুরু করলেন। চলে এলাম পর্বতের পশ্চিম প্রান্তের শেষ মাথায়। দক্ষিণ-পশ্চিমে যত দূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বেলা সাড়ে ১১টা বেজে গেছে। আমি নামার পথ ধরলাম। ছবি : লেখক

মন্তব্য