kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

আমরা তো অল্পে খুশি

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমরা তো অল্পে খুশি

কলেজে পড়ার সময় থেকেই বাড়ির আর্থিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হারে খারাপ হতে থাকে। তখন এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে আমাকে টিউশনি করতেই হবে। এ কারণেই সাবজেক্ট হিসেবে MATHEMATICS-কে বেছে নিতে হয়েছিল।

যাহোক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরপরই টিউশনি পেয়ে গেছি টাইপের একটা ভাব ছিল। ক্যাম্পাসে এসে দেখি উল্টোটা। কোনোমতে একটা টিউশনি লাগবেই লাগবে। কিন্তু পাচ্ছি না। বাড়ি থেকে জিজ্ঞেস করে—‘কিছু করতে পারলি?’ কখনো লজ্জিত হয়ে, আবার কখনো রেগেমেগে বলি—‘পারিনি এখনো।’ আমাদের পরিবারের অবস্থা যে খুব খারাপ তা নয়। শুধু নগদ টাকা নেই। দুটি গাছ বিক্রি করে দিলে বা গোয়ালঘরের একটা গরু কিংবা খাসি বিক্রি করে দিলেই টাকার বন্দোবস্ত হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে আর কয় মাস? সেইবার ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে দেখি, আগের মাসে আমাকে টাকা দেওয়ার জন্য পুরনো একটা আমগাছ আর একটা কামরাঙাগাছ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তখন পর্যন্ত ফল হিসেবে কামরাঙা আমার খুব প্রিয় ছিল। গাছের জায়গা দুটি ফাঁকা দেখে আমি তো হতভম্ব!

খুব খারাপ লেগেছিল সেইবার। হলে আসার পর চেষ্টা-তদবির আরো বাড়িয়ে দিলাম—যে করেই হোক টিউশনি আমার লাগবেই। অবশেষে প্রথম টিউশনি পেলাম। উত্তরায়। রাত ১০টার দিকে হলের পুকুরপারে যখন রুমের এক বড়ভাই আরেক ভাইকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন টিউশনির জন্য, আমি তখন আনন্দে আত্মহারা। একবারের জন্যও না করিনি। একবারের জন্যও ভাবিনি এতটা দূরে টিউশনি করব কী করে। শুধু মাথায় ছিল আমাকে যে করেই হোক টিউশনিটা করতে হবে। ভার্সিটির বাসে যেতাম। লোকাল বাসে করে হলে ফিরতাম। রাজলক্ষ্মীতে বাস থেকে নেমে টানা ২০ মিনিট হাঁটলে সেই বাসায় যাওয়া যেত। টিউশনি শেষে ফেরার পর এত ক্লান্ত লাগত তা বলে বোঝানো যাবে না।

সেই টিউশনিটা তিন মাস করেছিলাম। এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। অক্টোবরে পেয়েছি, জানুয়ারিতে আবার নেই! এদিকে বাড়িতে টাকা চাওয়া—সে তো নিদারুণ কষ্টের ব্যাপার। অবশেষে মার্চে আরেকটি টিউশনি পেলাম। দৈনিক বাংলা মোড়ে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত অবশ্য ভালো-মন্দে টিউশনি করে যাচ্ছি।

প্রতিবার ঈদের আগে ফেসবুকে একটা কমন স্ট্যাটাস দেখা যায়—স্টুডেন্টের গার্ডিয়ান ঈদের বোনাস দিচ্ছে বা টিউশনির টাকাটা আগে আগে দিয়ে দিচ্ছে। আসলে দু-চারজন বাদে বাকিদের কপাল এতটা ভালো হয় না। কখনো আমার এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। আমার স্টুডেন্ট এখন মেডিক্যালে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সেটাই বড় তৃপ্তিদায়ক।

তবে একটা বিরূপ অভিজ্ঞতা আমার অনেকবারই হয়েছে। সেটা হলো—শেষ মাসের বেতন না পাওয়ার অভিজ্ঞতা।

শেষ মাসের বেতন পাইনি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার বাসা থেকে, বেতন পাইনি ঢাকার বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে; এমনকি দুজন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বাসা থেকেও। শেষ দুটিই প্রায় বছর তিনেক করে পড়িয়েছি। শেষ মাসে টিউশনি করার সময় প্রথম বাসায় বলেছিল—‘তোমার স্যার এই মাসে ফ্ল্যাট কিনেছেন তো! তোমার বেতনটা সামনের মাসে দেব। একদিন কল দিলে আইসো।’ সেই কল আর আসেনি। আমিও আর কল দিইনি। শুধু স্টুডেন্টের রেজাল্টের দিন ফোন দিয়ে রেজাল্ট জিজ্ঞেস করেছিলাম। এ পর্যন্তই। ম্যাডামও আমাকে যেতে বলেননি, আর আমিও যাইনি। দ্বিতীয়টায় ম্যাডাম বলেছিলেন, ‘তোমার তো মাস শেষ হয়নি। তা-ও কিছু টাকা দেওয়া দরকার। আচ্ছা টাকা পাঠিয়ে দেব।’ আসলেই মাস শেষ হয়নি। মাসে ১২ দিন করে পড়াতাম। সেই মাসে গিয়েছিলাম ৯ দিন। সেই ম্যাডামও আমাকে আর কখনো ফোন দেননি। আমিও না। এ ছাড়া আরো কয়েকটায় প্রতি মাসে বেতন দিত পাঁচ-সাত দিন করে পিছিয়ে পিছিয়ে। ফলাফল ১০ মাসে বছর। সব সময় যে আমিও মাসে ১২ দিন পড়াতে পেরেছি তা-ও না। নিজের পরীক্ষা ও ব্যস্ততার কারণে কখনো হয়তো যেতে পারিনি। চেষ্টা করেছি পুষিয়ে দিতে। আমার চেষ্টায় হয়তো গার্ডিয়ানের মন ভরেনি। প্রত্যাশার অতিরিক্ত পাইনি বলে আমি অবশ্য মন খারাপ করিনি। তবে প্রাপ্য টাকাটা না পাওয়ায় খুব খারাপ লাগত।

মানুষের মুখে টিউশনিবিষয়ক মুখরোচক যে গল্পগুলো শুনি সেগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে সবচেয়ে ভালো যে টিউশনিটা করেছি সেটাকে ‘মোটামুটি চলে’ ক্যাটাগরিতে রাখা যাবে। তার পরও পরম করুণাময়ের কাছে কৃতজ্ঞ। প্রার্থনা করি, আমাদের মতো অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা প্রত্যেক ছেলে-মেয়ের প্রতি তিনি যেন সদয় হন। লাগবে না আমাদের ঈদের বোনাস। প্রাপ্যটা পেলেই আমরা খুশি।

মিঠুন রঞ্জন কর

জগন্নাথ হল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য