kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

বিশাল বাংলা

কবর খননকারীরা

সংগঠনের নাম ‘আমার ঠিকানা কবর’। চার দশকেরও বেশি বয়স স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির। বিনা পারিশ্রমিকে কবর খনন, লাশ দাফনসহ মৃত্যু-পরবর্তী সব কাজ করে থাকেন এর সদস্যরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন এম আর মাসুদ

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



কবর খননকারীরা

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদের গেটের সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সেটি ধরে কিছুদূর এগোলে কৃষ্ণনগর পৌরসভা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। এখানেই সাইনবোর্ডটি দেখতে পাবেন। লেখা আছে ‘আমার ঠিকানা কবর’। টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট অস্থায়ী ঘর। কবর খননের কারিগরদের ঠিকানা। সব সদস্য সারা দিন এখানে বসে থাকেন না, তবে কারো মারা যাওয়ার খবর পেলে প্রায় সবাই হাজির হন। আর শেষ না-হওয়া পর্যন্ত থাকেনও।

 

যেভাবে শুরু

সংগঠনটির যাত্রা শুরু ১৯৭৬ সালে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফিরোজ মাসুদ। তখন তিনি ছিলেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ফিরোজের মনে হয়েছিল, ‘মানুষ মারা গেলে মৃত ব্যক্তির পরিবার শোকগ্রস্ত থাকে। তাই মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন, দাফন-কাফনের কাজটা করতে পারলে কিছুটা উপকার হবে।’ বিষয়টি তিনি গ্রামের ইসমাইল হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করেন। এর ফলেই যাত্রা শুরু হয় আমার ঠিকানা কবরের। শুরুতে সদস্য ছিলেন ছয়জন। এখন ১৬ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। তাঁরা শুধু লাশ দাফনই করেন না, কল্যাণ তহবিলে প্রতি মাসে জমা দেন ২০ টাকা করে। রয়েছে ৯ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। ২০০৯ সালে ফিরোজ মাসুদের জমির ওপর টিনের ছাউনি দিয়ে এক কামরার একটি পাকা ঘর করেছে সংগঠনটি। খুব সাজানো-গোছানো।

 

দাফন-কাফন

আমার ঠিকানা কবর সংগঠনটির সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা জড়িত। কেউ কৃষক, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মৃত ব্যক্তির খবর পেলেই কাজকর্ম ফেলে কবর খননের সরঞ্জামাদি নিয়ে হাজির হন মৃতের বাড়ি। ঝড়-বৃষ্টি তাঁদের দমাতে পারে না। কোদাল, কাস্তেসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণই তাঁদের আছে। আছে বিশেষ পোশাক। একটি জেনারেটরও আছে। লাশ বেওয়ারিশ হলে সংগঠনের কল্যাণ তহবিল যাবতীয় খরচ জোগান দেয়। এক দিনে একাধিক লাশও দাফন করেছেন তাঁরা। যেমন ২০১৭ সালের ১৭ জুন দাফন করেছেন চারটি লাশ। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত এক হাজার ২৭৯টি লাশ দাফন করেছে ‘আমার ঠিকানা কবর’। জানালেন সংগঠনের সভাপতি ফিরোজ মাসুদ।

 

সদস্য ও এলাকাবাসীর কথা

আমার ঠিকানা কবরের কোষাধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী (ইদুল)। পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি। বললেন, ‘আর্থিকভাবে মানুষের উপকার করার সামর্থ্য আমার নেই, তবে এই সংগঠনের সঙ্গে থেকে কিছুটা সেবা করতে পারছি বলে আনন্দ লাগে।’ সদস্য ইসমাইল হোসেন পেশায় ভ্যানচালক। ভূমিহীন ইসমাইল প্রায় ২০ বছর ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে আছেন। আরো আছেন হান্নান হোসেন। তিনি কলেজপড়ুয়া। স্থানীয় সাহিত্যিক হোসেনউদ্দীন হোসেন বলেন, ‘আমার ঠিকানা কবরের বেশির ভাগ সদস্য খেটে খাওয়া মানুষ, তবে তাঁরা এ কাজের মাধ্যমে নিজেদের উঁচুস্তরে নিয়ে গেছেন।’

মন্তব্য