kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

হাওরের দিনরাত্রি

আগের যাত্রায় জয়শ্রীর জামরুল আর মওলা ভাইকে বন্ধু পাতিয়ে এসেছিলেন মাসুম সায়ীদ। এবার বর্ষার শুরুতেই তাঁদের দাওয়াতে আবার হাওরে বেড়াতে গিয়েছিলেন

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



হাওরের দিনরাত্রি

ঘুম ভাঙতেই হুড়মুড় করে উঠে বসি ট্রেনের বিছানায়। খোলা জানালায় মুখ বাড়ালে হিমেল হাওয়া আছড়ে পড়ে চোখে-মুখে। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে ভোর। ট্রেনের গতি এখন মন্থর। সামনে কোনো একটি স্টেশন। খানিক বাদেই চোখে পড়ল নামফলক—বারহাট্টা। পরের স্টেশনেই পথের শেষ। মোহনগঞ্জ এসে ট্রেন ধরবে ফিরতি পথ। আবার দুলে উঠল ট্রেন। কিন্তু গতি তীব্র হলো না। বাইরে বৃষ্টিস্নাত ভোর। ধানের মাঠ রূপ নিচ্ছে সরোবরে। বিল হাওর গুটি গুটি পায়ে উঠে আসছে দোরগোড়ায়। জবুথবু খড়ের গাদা। ভেজা উঠান। দারুণ সজীব সব গাছপালা। ডোবায় শিশুর হাসির মতো শালুক ফুল। এসব পেরিয়ে ট্রেন থামে। ক্লান্তিহীন মুগ্ধ চোখে আমরা নামি। আমি আর সাইফি আবাবিল।

 

মোহনগঞ্জ থেকে জয়শ্রী

একটা অটোরিকশায় উঠলাম। রিকশাটা নতুন। চালক একে পঙ্খিরাজ বানিয়ে তুলল। আমরা চলছি ধর্মপাশার দিকে। ধর্মপাশা বাজারে এসে পথ গেছে দুই দিকে। একটা বাদশাগঞ্জ, অন্যটা জয়শ্রী। কান্দাপাড়ায় রিকশা থামল। জয়শ্রী এখনো দুই কিলোমিটার। বাকি পথ যেতে হবে নৌকায়। ঘাটে একটা চায়ের দোকান। কেটলি দেখেই চায়ের তেষ্টা চাগিয়ে উঠল। চারপাশে চারটি লম্বা কাঠের বেঞ্চ। কয়েকজন লোক বসে আছে। লোকগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা বলছিল। ধারণা হলো, তারা দালাল অথবা ফড়িয়া। চা শেষ করে বাইরে এলাম। একটা জেলে নৌকা এসে ভিড়ল। মাছের খাঁচি হাতে নেমে এলো একজন। কৌতূহলে এগিয়ে গেলাম। ছোট ছোট টেংরা আর পুঁটি কিলবিল করছে। বড় মাছ একটাও নেই। জয়শ্রীর নৌকা ছেড়ে যাচ্ছে—কে একজন ডেকে উঠল। তাড়াহুড়া করে নৌকায় উঠলাম। দমকা হাওয়া ভেজা মেঘটাকে নিয়ে গেল অন্যদিকে। মাথার ওপর হেসে উঠল আকাশ। সকালের নরম রোদ আর হিমেল হাওয়ায় অভিষিক্ত হলো আমাদের হাওর ভ্রমণ।

 

বিল-হাওয়ের দেশে

হাওরের জন্য বিখ্যাত সুনামগঞ্জ জেলা। জেলার ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ আর তাহিরপুর উপজেলার মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত হাওর টাঙ্গুয়া আর পাসনা। বিলও অসংখ্য। বিল-হাওরের মধ্যে আছে বিস্তর জমি। কিন্তু এখন তার কোনো অস্তিত্ব নেই কোথাও। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আধা ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম জয়শ্রী বাজারে। নৌকা ভিড়ল পশ্চিমের ঘাটে। জয়শ্রী ধর্মপাশা উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বাউলাই নদীর তীরে। বাজারটি বেশ বড়। সব ধরনের দোকান আছে। এখানে একটা চায়ের দোকানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মওলা ভাই আর জামরুল ভাই। এই ঘাটের সবচেয়ে বড় আর সুন্দর ট্রলারটি তাঁদের। দোকানটা লোকজনে ঠাসা। নদীর ধারে জানালার পাশে আমাদের বসার জায়গা করে দিলেন মওলা ভাই। কড়া লাল চা। চায়ে চুমুক দিয়ে একনজর দেখে নিলাম সবাইকে। বৈচিত্র্যহীন গ্রাম্য সহজ-সরল মানুষ এরা। কৃষিই এদের মূল পেশা। ধান একমাত্র ফসল। কেউ কেউ মাছও ধরে। ইঞ্জিন বসানো বড় নৌকাকে এরা বলে ট্রলার। ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকার নাম টেম্পো। মওলা ভাইদের ট্রলারটি যাত্রীবাহী। নাম ‘মায়ের দোওয়া পরিবহন’। জয়শ্রী থেকে একটি করে ট্রলার প্রতিদিন দুপুর ১২টায় ছেড়ে যায় দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত তাহিরপুরের টেকেরঘাটের উদ্দেশে। আমরা এই পথের পথিক হতেই এসেছি।

 

স্বভাব কবি জিতেন

বাজারে বেশ জনপ্রিয় জামরুল ভাই আর মওলা ভাই। চায়ের দোকানে নতুন লোক আসে আর তাদের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে হয় চা পর্ব। ঘন ঘন চা খাওয়া এদের অভ্যাস। মধ্য দুপুর। চায়ের দোকানে ঢুকল এক লোক। দীর্ঘ দেহ। একহারা গড়ন। গায়ে ঢোলা শার্ট। মাথার লম্বা চুলে ঝুঁটি বাঁধা। এক গ্লাস পানি হাতে বসলেন পাশের বেঞ্চিটায়। আলাপ-পরিচয় জমে উঠল। ‘আমি পেশায় রাজমিস্ত্রি আর শখে বাউল’—বললেন লাজুক হাসিতে। আমাদের অনুরোধে গান ধরলেন। মুখে মুখে গান বানিয়ে ফেলতে পারেন যেকোনো মুহূর্তে। ডাকও আসে মাঝেমধ্যে। বেশ কয়েকটি গান গাইলেন পরপর। তাঁর সম্মানে চা হলো আবার। তারপর যেমন এসেছিলেন চলে গেলেন তেমনি।

 

মহাজনি নাও

বাজারের দক্ষিণ প্রান্তে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন। পাশেই একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তারই ছায়ায় বসে আছি। সামনের ঘাটে একটি রঙিন মহাজনি নাও এসে ভিড়ল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে এরা ধান কেনে। মনের পর্দায় ভেসে উঠল শৈশবে দেখা সেই পালখাটানো জলফাটানো দাড়ের নৌকার ছবি। এমন সময় চায়ের দোকানি এক গামলা সদ্য ভাজা মুড়ি নিয়ে হাজির। সঙ্গে পেঁয়াজ আর কাঁচা মরিচ। আর চাপকলের এক জগ ঠাণ্ডা পানি।

 

সৌরবিদ্যুতের আলোয়

দিন শেষে আমরা পড়লাম বৃষ্টির মুখে। তখন শুধু সন্ধ্যা। চারদিক কালো করে বৃষ্টি নামল। হাওরে এই প্রথম প্রবল বৃষ্টি দেখলাম। মনে হলো পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়বে মাথার ওপর। বাজার থেকে উত্তরে এক কিলোমিটার গেলেই জামরুল ভাইদের গ্রাম। রাত ৯টার পর আমরা গিয়ে উঠলাম জামরুল ভাইয়ের ঘরে। রঙিন চাদর বিছানো একটা খাট। মাথার ওপর রঙিন চাদোয়া ঝালরওয়ালা। একটা ছোট্ট টেবিল। কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার। আর এক পাশে ড্রাম আর বস্তাভর্তি ধান। এরপর বাঁশের সুন্দর পার্টিশন। তাতে একটা জরির কাজ করা পর্দা। নিকানো কাঁচা মেঝে। আর মোমের আলোর মতো মৃদু নিরুত্তাপ সৌরবিদ্যুতের আলো। জামরুল ভাইয়ের একটাই মেয়ে। বছর তিন-চারেক বয়স। আর ভাবি—হালকা-পাতলা গড়ন। গাঁয়ের পরিশ্রমী মহিলারা যেমন হয়। পাটশাক, ডিম ভুনা আর হাঁসের মাংসে চমৎকার ভূরিভোজ হলো। তারপর নৌকায় এসে পিঠ পাতলাম। মৃদু দুলুনি আর ঝিরিঝিরি বাতাসে রাতটা কাটল জমাট।

 

পাড়া বেড়ানো

সকালে শুরু হলো বেড়ানো। প্রথমে মওলা ভাইয়ের ঘরে।  বিছানায় দস্তরখান পেতে নাশতা। পরপর আরো দুই বাড়ি যেতে হলো। এ পাড়ার নাম বাদে হরিপুর। পাড়ার বেশির ভাগই মওলা ভাই আর জামরুল ভাইদের জ্ঞাতিগোষ্ঠী। গাঁয়ে বিদ্যুতের খুঁটি পোতা শেষ। এখন শুধু সংযোগের অপেক্ষা। একটি খাল পার হয়ে আমরা চলে এলাম মসজিদের কাছে, সঙ্গে বড় ঈদগাহ মাঠ আর মাদরাসা। মসজিদটি পাকা। প্রায় শত বছরের পুরনো। নোনা ধরে গেছে পলেস্তারায়। আমারা ফিরতি পথ ধরলাম। খালের স্রোতে এক ঝাঁক হাঁসের বাচ্চা পিলপিল করছে। বড় হাঁসেরা তীরে দাঁড়িয়ে নির্বিকার। 

টেকেরঘাটের পথে

জয়শ্রী থেকে টেকেরঘাটের যাত্রাটা দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বে। ‘মায়ের দোওয়া পরিবহনের’ পালা আরো একদিন পর। আমাদের উঠতে হলো জিয়া ভাইয়ের ট্রলারে। বাজার ছাড়ার পর আমরা নজর দিলাম পথের দিকে। নদী-হাওর-বিল আর ধানি জমি সব মিলেমিশে একাকার। গ্রামগুলো যেন এক-একটি দ্বীপ। পানির তোড় থেকে বাড়ি ভিটা টিকিয়ে রাখতে খাটতে হয় প্রচুর। এই পথটা সংযুক্ত করেছে ধর্মপাশা আর তাহিরপুর উপজেলাকে। অবশ্য জামালগঞ্জকে একটুখানি ছুঁয়ে। বাউলাই নদী এই সংযোগের সূত্র। কিন্তু তা শুধু বোঝা যায় হেমন্তকালেই। বাকি সময়টা বিল, হাওর আর নদী থাকে একাকার। মাঝে আছে অসংখ্য বাঁধ। ভাঙা আর গড়াই হচ্ছে বাঁধগুলোর নিয়তি। হেমন্তকালে মেরামত করা হয়, যাতে মেঘালয়ের পাহাড়ের ঢল অসময়ে ডুবিয়ে না দেয় ক্ষেতের ধান। ঢল নামা শুরু হলে গাঁয়ের মানুষ পাহারা বসায় বাঁধগুলোতে। ধান কাটা শেষ হলে বাঁধ ভেঙে যায় যাক। বাঁধ এখনো অক্ষত রয়ে গেছে কোথাও কোথাও।

 

প্রথম ঘাট সানবাড়ি

দেখতে দেখতে আমরা চলে এলাম সানবাড়ি। এটা ধর্মপাশায়। এখানে একটা পুলিশ ফাঁড়ি আছে। ঘাটে নৌকা ভিড়ল। দু-একজন নামল। কিন্তু উঠল তার চেয়েও বেশি। সানবাড়ির পর পড়ল পাসনার হাওর। এলাকার মানুষ ডাকে পাঁচ শ হাওর। এখানে একটা হিজল বন আছে। গাছের কাণ্ডগুলো সব পানির নিচে। শুধু মগডাল ভেসে আছে পানির ওপর। এটা পেরিয়ে যেতেই আহসানপুর। এই আহসানপুর পড়েছে জামালগঞ্জের ভেতর।

 

সোলায়মানপুরের মিনার

এদিকের বাঁধগুলোর অনেকখানি টিকে আছে এখনো। ট্রলার চলছে বাঁধের পাশ ঘেঁষে। এরই মধ্যে সূর্য ঢলে পড়তে শুরু করেছে। মেঘহীন আকাশের পটে ভেসে উঠল মেঘালয়ের পাহাড় সারি। পাহাড় সারির বুকে একটি মিনার ভেসে উঠল। উজ্জ্বল রোদে চকচক করছে চূড়া। পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল ওটাই সোলায়মানপুর। লেকেরা বলে সোলেমনপুর। সোলায়মানপুর নেমে টেম্পোতে (ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকা) ১০ টাকায় চলে যাওয়া যায় তাহিরপুর। নৌকা ঘাটে ভিড়লে বেশির ভাগ লোক নেমে গেল এখানে। জিয়া ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানলাম আর একটি মাত্র ঘাট। তার পরই টেকেরঘাট।

 

শ্রীপুরে বিরতি

৪টার দিকে ট্রলার ভিড়ল উত্তর শ্রীপুর বাজারে। এখানে আধা ঘণ্টা বিরতি। নেমে গেল সবাই। আমরা নেমে শিঙাড়া-পুরির দোকানে ঢুকলাম। জিয়া ভাই বিলটা মিটিয়ে দিলেন। এখানে তাঁর বাড়ি। এখন আমরা তাঁর মেহমান। আবার ট্রলারে উঠলাম। এবার যাত্রী মাত্র পাঁচজন। চলছি মেঘালয়েরর পাহাড়কে বাঁয়ে রেখে। পর্যটকদের ট্রলারের আনাগোনা এখানে বেশি। কাছেই টাঙ্গুয়ার হাওর। টাঙ্গুয়ায় এলে সবাই ঘুরে যায় টেকেরঘাট।

 

টাঙ্গুয়ার হাওর

সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা আর তাহিরপুর উপজেলায় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এর বিস্তৃতি। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি এটা। স্থানীয় লোকের কাছে এটি ‘নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল’ নামেও পরিচিত। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার। বাকি অংশ গ্রামগঞ্জ আর কৃষিজমি। ঢাকা থেকে টাঙ্গুয়ায় যাওয়ার সহজ পথ তাহিরপুর অথবা মধ্যনগরের বংশীকুণ্ড থেকে। কিছুক্ষণ আগে আমরা এসেছি হাওরের পাশ ঘেঁষেই।

 

ডাম্পের বাজার

মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে নদীর তীরে ডাম্পের বাজার। টেকেরঘাটের চুনাপাথরের খনির যুগে ডাম্পের বাজার ছিল জমজমাট। এখন জেল্লা হারিয়েছে। এর অপর পাড়ে শ্রীপুরের নতুন বাজার। নতুন বাজারের অনেক মাল আছে নামানোর। তারপর ট্রলার যাবে টেকেরঘাট। দেরি হবে। তাই ডাম্পের বাজারেই আমরা নামলাম।

 

রংধনু বিকেল

দূরে মেঘালয়ের পাহাড়চূড়ায় মেঘের আনাগোনা। কিন্তু এখানে আকাশ নীল। হাওরের পানির মতো টলটলে। উজ্জ্বল রোদ মাখা বিকেলে সমাপ্তি ঘটল আমাদের জলযাত্রার। ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে মাটিতে পা রাখলাম। জিয়া ভাইকে ধন্যবাদ দিতে যেই পেছন ফিরেছি, অমনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল আমার চোখ। দিগন্তে ভেসে উঠেছে রংধনু। আহ! কী অপূর্ব।

ছবি : লেখক

মন্তব্য