kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

অদম্য মানুষ

অন্তরা পেরেছেন

বয়স তখন আড়াই বছর। প্রচণ্ড জ্বর হলো। চিকিৎসক বললেন, পোলিও হয়েছে। এর পর থেকে হুইলচেয়ার সঙ্গী। তাই বলে হুইলচেয়ারে আটকে রাখেননি জীবন। এবি ব্যাংকে চাকরি করেছেন ২৯ বছর। মানুষটির নাম অন্তরা আহমেদ। তাঁর গল্প বলছেন মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অন্তরা পেরেছেন

ব্যাংকে অন্তরার শুরুটা ছিল জুনিয়র অফিসার হিসেবে। ২৯ বছর পর যখন অবসর নিলেন, তখন তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এর আগে ১৯৮৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর হন। এতটা পথ তিনি কিভাবে পাড়ি দিলেন? অন্তরা বললেন, ‘নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল। মনোবল ছিল যে আমি পারব। শত বাধা এলেও ভেঙে পড়িনি। জয়েন করেছিলাম হেড অফিসে। তারপর কারওয়ান বাজার শাখার ক্লায়েন্ট সার্ভিসে কাজ করেছি। ইন্টারভিউ বোর্ডে আমাকে দেখে কর্মকর্তারা অবাক হয়েছিলেন। শেষ প্রশ্নটা ছিল, তুমি পারবে তো?  বলেছিলাম, পারব।’

চাকরিটা হয়ে যায়। তবে তিনি নিয়োগপত্র পান না। সময় বয়ে যায়। শেষে আবার বোর্ড মিটিং বসে। আবার সেই প্রশ্ন, ‘তুমি পারবে তো?’ উত্তরে বলেছি, ‘কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করেছি। পায়ের ওপর ভর দিয়ে যদিও বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারি না; কিন্তু কাজ সবই করতে পারি।’

 

তিনি পেরেছেন

অন্তরার অবসরে যাওয়া উপলক্ষে ব্যাংকের সহকর্মীরা একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন। সেখানে ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) তারিক আফজাল বলেছিলেন, ‘তিনি (অন্তরা) একজন বিশেষ মানুষ। তাঁকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই। দীর্ঘ ২৯ বছরের চাকরিজীবনে তিনি কখনো অফিসে দেরি করে আসেননি। জুনিয়র থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন। মানসিক শক্তি দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন। শুরুর দিকে কখনো বোনের বাসা, কখনো হোস্টেলে থেকেছেন। ভাবা যায়? তার পরও সময়মতো অফিসে পৌঁছেছেন তিনি।’

 

বড় দুলাভাই পৌঁছে দিয়েছিলেন

১৯৯০ সালে মতিঝিলে এবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এইচআর বিভাগে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। প্রথম দিন বড় দুলাভাই তাঁকে অফিসে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের একটি ঘটনা আজও অন্তরার মনে পড়ে। দেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থির ছিল তখন। মতিঝিলে সহকর্মীর বাসায় রাতে থেকে যান। সকালে অফিসে যাওয়ার পথে রিকশা থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেদিন হরতাল ছিল। মহাবিপদে পড়লেন তিনি। হেঁটে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। একটু হেঁটেই বসে পড়লেন। কোথা থেকে যেন অন্য এক সহকর্মী ছুটে এলেন। তাঁকে পৌঁছে দিয়েছিলেন অফিসে। পরে এসব জেনে হরতালে অন্তরাকে অফিস আসতে নিষেধ করলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

 

অন্তরার কথা

জন্ম ১৯৬৪ সালের পহেলা জানুয়ারি। ছয় বোন-এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। অন্তরার বাবা মোহাম্মদ আনসার আলী। চাকরিসূত্রে সিরাজগঞ্জ থাকতেন। তবে অন্তরা বেড়ে ওঠেন রাজশাহীতে। পোলিও ধরা পড়লে তাঁকে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করা হয়। তারপর ১৯৭৫ সালে আমেরিকার একজন ফিজিওথেরাপিস্ট ঢাকায় আসেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা দিতে এসেছিলেন তিনি। কয়েকবারই অন্তরার পায়ে অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পর কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। যে অন্তরা একেবারেই দাঁড়াতে পারতেন না, তিনি ক্র্যাচে ভর দিয়ে দাঁড়াতে শিখলেন।

 

তবে থেমে যাননি

মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন সবাই ছিল অন্তরার পাশে। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় বিভাগে রাজশাহী সরকারি পিএন হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৮১ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি। অন্তরা বললেন, ‘স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সহযোগিতা কখনোই ভুলবার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস হতো ভবনের তিনতলায়। বন্ধুরা কেউ ব্যাগ হাতে নিত, কেউ বা ক্র্যাচে ভর দিতে সাহায্য করত। কর্মক্ষেত্রেও অবহেলার শিকার হইনি। ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরাও খুব আন্তরিক ছিলেন। প্রতিবন্ধী বলে কেউ আমাকে আলাদা করে দেখেননি। সহকর্মীদের সঙ্গে দল বেঁধে বিদেশেও বেড়াতে গেছি। সহকর্মীদের সহযোগিতা না পেলে হয়তো চাকরি করা হয়ে উঠত না।’ প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্তরার খুব মায়া। প্রায় ৫০ জন প্রতিবন্ধীকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তিনি। প্রতিবন্ধীদের জন্য একটা ট্রাস্ট গড়তে চাইছেন এখন। সেখান থেকে প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনায় সহযোগিতা দেওয়া হবে। তিনি চান, অর্থাভাবে তাদের জীবন যেন থেমে না যায়।

মন্তব্য