kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

বিশ্ববিচিত্রা

ব্ল্যাকবিয়ার্ডের সাগরেদের বাড়ি

বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ওকরাকোক। ছিল জলদস্যুদের লুকিয়ে থাকার জায়গা। উইলিয়াম হাওয়ার্ড নামের এক জলদস্যুর হাত ধরেই এখানে গড়ে ওঠে বসতি। তিনি ছিলেন আবার ব্ল্যাকবিয়ার্ডের সাগরেদ। বিবিসি ট্রাভেলে খোঁজ পেয়েছেন আহনাফ সালেহীন

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্ল্যাকবিয়ার্ডের সাগরেদের বাড়ি

এমি হাওয়ার্ড

উত্তর ক্যারোলাইনার মূল ভূখণ্ড থেকে ওকরাকোক ৩৪ মাইল দূরে। বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ ওকরাকোক। গাড়ি চালিয়ে সেখানে আপনি যেতে পারবেন না, আকাশপথেও যেতে পারবেন না। শুধু নৌযানই সম্বল। সতেরো শতকে এটি ছিল জলদস্যুদের লুকিয়ে থাকার একটি আদর্শ জায়গা। পুরোটাই ছিল বনজঙ্গল। উইলিয়াম হাওয়ার্ড নামের এক জলদস্যু ছিল। নামকরা জলদস্যু ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজ ‘কুইন অ্যান্স রিভেঞ্জ’-এর একজন সদস্য ছিল সে। ১৭১৮ সালে ব্ল্যাকবিয়ার্ডের শেষ লড়াইয়ের আগে সে জাহাজটি ছেড়ে যায়। পা বাড়ায় ভার্জিনিয়ার পথে। জলদস্যুদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন রাজা প্রথম জর্জ। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেন। হাওয়ার্ড সে সুযোগ নেয়। হাওয়ার্ড কয়েক দশক লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। তাকে আবার দেখা যায় ১৭৫৯ সালে। রিচার্ড অ্যান্ডারসন নামের এক বিচারপতির কাছ থেকে ১০৫ পাউন্ডের বিনিময়ে সে ওকরাকোক দ্বীপ কিনে নেয়।

হাওয়ার্ড আরো কয়েকজন সাবেক দস্যুকে আহ্বান জানায় দ্বীপটিতে বসবাসের জন্য। তারা বাণিজ্য জাহাজগুলোকে পথ দেখানোর কাজ বেছে নেয়। দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ওকোকদের সঙ্গে হাওয়ার্ডদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তারা মিলেমিশে মাছ ধরত বা শিকার করত। ওকোকদের নামটাই নানা পথঘাট ঘুরে মধ্য সত্তরে ওকরাকোকে এসে থামে। ওকরাকোকে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্রিটিশ নাবিক আর জলদস্যুরা একসঙ্গে বসবাস করতে থাকে। মিলেমিশে এক ভাষাও তৈরি হতে থাকে। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ওয়াল্ট ওলফ্রাম বলেন, ‘ওকরাকোকের ভাষা আমেরিকার কোনো এলাকার সঙ্গেই মেলে না। উচ্চারণ, ব্যাকরণ বা বাচনভঙ্গি কোনোটায়ই মিল নেই।’

হাওয়ার্ডের লোকজন প্রায় দুই শতাব্দী মূল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্নই ছিল। ১৯৩৮ সালের আগে সেখানে বিদ্যুৎ ছিল না। ফেরি সার্ভিস চালু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে।

চিপ স্টিভেন্স বলছিলেন, এখানকার জীবনধারা আলাদা। কেউ যদি এখানে এসে থাকতে চায়, তবে তাকে এখানকার মতো হয়ে উঠতে হবে। ওকরাকোকের বাসিন্দা চিপের বয়স ৫৬।  ব্ল্যাকবিয়ার্ডস লজ নামে তাঁর একটি হোটেল আছে। তিনি হাওয়ার্ডের উত্তরপুরুষ।

দ্বীপটি ১৬ মাইল দীর্ঘ। দ্বীপে স্কুল মাত্র একটি। বেশির ভাগ লোক মাছ ধরার কাজ করে, কাঠের কাজও করে অনেকে। এখানে মঞ্চনাটকের একটি দল আছে, মসলার বাজার আছে, কিছু মুদি দোকান আছে। এখন এখানে মোবাইল ফোনও কাজ করে। ল্যাপটপের ব্যবহারও ঘরে ঘরে। তবু এটি ভিন্ন জগৎ। ফেরিতে করে যাঁরা আসেন, তাঁরা অচিন জায়গায় এসেই নামেন। মনে মনে বলেন, এলেম নতুন দেশে। চিপ বলছিলেন, ‘সত্যিই একটি আলাদা জায়গা। অনুভূতিটা অন্য রকম। ছোটবেলায় আমরা ঘর ছাড়তাম নাশতা সেরেই। সারা দিন সৈকতে খেলে বেড়াতাম, নয় তো জলে দাপাদাপি। দুপুরে কাছে কোথাও খেয়ে নিতাম। মা-বাবা আমাদের নিয়ে একটুও চিন্তা করতেন না। সারা দিনের খেলাধুলা সেরে সন্ধ্যায় ফিরতাম ঘরে।’

ওকরাকোকের বাসিন্দারা নিজেদের ওকোকার্স বলে পরিচয় দেয়। এমি হাওয়ার্ড একজন দ্বীপবাসী। উইলিয়াম হাওয়ার্ডের উত্তরসূরি। স্থানীয় চারু ও কারুশিল্পের একটি দোকান চালান। বলছিলেন, ‘অনেক শব্দ শুনবেন এখানে, যা আমাদের একান্ত নিজস্ব। এখানে অনেক সংস্কৃতির মিল ঘটেছে। প্রথম দিকের সবাই দূর দূর থেকে এসেছে। আমরা এখানে একটা শব্দ বলি—পিজার, এসেছে ইতালির পিয়াৎসা থেকে। কেউ  যখন বলে, আমি পিজারে বসে আছি, তার মানে হলো সে বারান্দায় বসে আছে।’

ভাষা দিয়েই বোঝা যায় ওকরাকোক বহুজাতির মানুষের বাসস্থান। ‘কামিশ’ বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ অসুস্থ। ১৬ শতকের একটি ইংরেজি শব্দ কালম থেকে এসেছে। তারপর ধরা যাক ‘বাক’ শব্দটি। এর অর্থ পুরুষ বন্ধু। ১৩ শতকের জার্মানিতে এর প্রচলন ছিল।

এমির দুঃখ হলো, এখন টেলিভিশন আর ইন্টারনেটের বদৌলতে ওকরাকোক বদলে যাচ্ছে। ড. ওলফ্রামও বলছিলেন, ‘এখন আর বিচ্ছিন্ন শব্দটি ব্যবহারের সুযোগ নেই। সারা পৃথিবীই এখন সংযুক্ত। আর হয়তো এক-দুই প্রজন্ম ওকরাকোকের নিজস্বতা বহন করার সুযোগ পাবে, তারপরই হয়তো হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে।’

মন্তব্য