kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

আরো জীবন

চকোলেট মানুষ

একদিন পরিচিত একজনের সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পেরেছিলেন একজন মানুষ আছেন, যিনি ঘুরে ঘুরে মানুষকে চকোলেট খাওয়ান। তারপর তাঁকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন রায়হান রাশেদ

৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চকোলেট মানুষ

এক শুক্রবার ভোরে বের হলাম। জানতে পেরেছি তিনি বাজারে মাছ বিক্রি করেন। এক দোকানিকে বললাম, এমন কারোর কথা জানেন, যিনি মানুষকে চকোলেট খাওয়ান? দোকানি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, ‘ও কৃষ্ণদার কথা বলছেন? আমাদের মহল্লারই লোক। আমরা জ্যাঠা ডাকি। ১০-১২ বছর ধরেই দেখছি, মানুষকে চকোলেট দেন। আমাকেও দেন। যাকে সামনে পান, তাকেই দেন। মনে হয় এই নরসিংদী শহরের সব মানুষই তাঁর চকোলেট পেয়েছে।’ তারপর দোকানি আমাকে তাঁর বাসার পথ দেখিয়ে দিলেন।

 

চকোলেটের নেপথ্যে

গোপীনাথ মন্দিরের হরিসেবার সদস্য কৃষ্ণপদ। মন্দিরে প্রতিদিন অনুষ্ঠান হয়। খাবারের আয়োজন থাকে—ফল, বাতাসা, কদমা, সন্দেশ বা মিঠাই। সামর্থ্য অনুযায়ী সদস্যরাই টাকা দেন। কেউ ১০ টাকা, কেউবা ১০০ টাকা। অনেকে আরো বেশিও দেন। অনেক দিন আগের কথা, একদিন ঢিল মারার মতো করে লোকদের মধ্যে কদমা ছুড়ছিল একজন। একটা কদমা গিয়ে পড়ে এক মহিলার চোখে। মহিলা অন্ধ হয়ে যান। এ ঘটনায় কৃষ্ণপদ মনে খুব ব্যথা পান। ‘পরদিন থেকে মাছ বিক্রির টাকায় চকোলেট কিনে মানুষের হাতে হাতে দিতে শুরু করি। এমনও মনে হয়েছিল, কদমা-বাতাসায় ধুলো জমে। হাতের ময়লা লাগে। আবার অনেকে নিতেও চায় না। বাসায় নিতে নিতে গলেও যায়। তাই চকোলেটই বেছে নিলাম।’ বললেন কৃষ্ণপদ দাস।

 

প্রতিদিনই বিলি করেন

শুরুতে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে দিতেন। পরে একবার এক বিকেলে ব্যাগে চকোলেট নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শহরের বাজারে। ছোট-বড় সবাইকে দিলেন। অনেকে খুশি হয়ে নিলেন। কেউ কেউ অবশ্য হাসি-ঠাট্টাও করলেন। তিনি দমে না গিয়ে পরের দিন থেকে প্রতিদিন চকোলেট বিলি করতে থাকলেন। সেই থেকে আজ ১৫ বছর হয়ে গেল। প্রতিদিন বিকেলে বের হন চকোলেটের ব্যাগ হাতে। কখনো ব্যাগ হাতে বসে থাকেন নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদীর বেড়িবাঁধে। চকোলেট দেন পথচারীদের। কোনো কোনো দিন নিজেই ঘুরতে থাকেন নরসিংদী শহরের বাজারের অলিগলিতে। ঘুরে ঘুরে মানুষকে চকোলেট খাওয়ান। ক্রিকেটে বাংলাদেশ এবং ফুটবলে আর্জেন্টিনা জিতলে বেশি বিলি করেন। সেইবার নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ বিজয়ের পর খিচুড়ি রান্না করেছিলেন। পাড়ার ছেলেদের ডেকে খাইয়েছেন। কৃষ্ণপদের ফুটবল খুব পছন্দ। নরসিংদী স্টেডিয়াম ও আশপাশে খেলা হলে মাঠে যান চকোলেট হাতে। বিরতির সময় চকোলেট বিতরণ করেন মাঠজুড়ে। এখন অবশ্য কোথাও বসলে ছেলেরা আপনা থেকেই এসে ভিড় করেন। তিনি চেনা হয়ে গেছেন সবার।

 

একবারের একটা ঘটনা

২১০৬ সাল। নরসিংদীতে ফুটবল টুর্নামেন্ট চলছিল। সেদিন ছিল ডিসি ও পুলিশ দলের মধ্যে খেলা। অনেক চকোলেট নিয়েছিলেন। শুরুতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিলেন। একজন পুলিশ এসে তাঁকে জেরা করতে থাকেন। পরে অবশ্য তাঁর কথাবার্তায় সন্তুষ্ট হয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। তারপর নিজে থেকে বললেন আরেকটি ঘটনা, ‘মরহুম গফুর মিয়ার ছেলের নামে গত বছর ফুটবল লীগ অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনাল খেলায় মেয়র কামরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। আমাকে ডেকে দুটি চকোলেট চাইলেন। আমার কথা তিনি আগেই শুনেছেন বলে জানালেন। খুব খুশি হয়েছিলাম।’

 

ঘুরেছেন নানা জায়গা

চকোলেটের ব্যাগ হাতে তিনি গেছেন নেত্রকোনার মাজুপাড়া, আখাউড়ার মনিরামপুর, ঢাকার রাজারবাগ আর গাজীপুরের কালীগঞ্জে। বললেন, ‘আখাউড়ায় তখন পূজার সময় ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর লোক ছিল অনেক। একে তো অপরিচিত জায়গা। তার ওপর পুলিশও যদি ঝামেলা করে। প্রথমে অনেকগুলো চকোলেট মাটিতে ছড়িয়ে দিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, কয়েকজন আপনা থেকেই কুড়িয়ে নিল। তারপর সাহস পেয়ে হাতে হাতে দিতে থাকলাম। পুলিশরাও নিয়েছিলেন।’

 

ঈদের দিনেও দেন

দুই ঈদের দিন ব্যাগভর্তি চকোলেট নিয়ে বের হন কৃষ্ণপদ। ঈদে মিলাদুন্নবীর মিছিলের সঙ্গে সঙ্গে হেঁটেও চকোলেট বিলি করেন। বললেন, ‘মানুষকে খাওয়ানোর আনন্দটাই আলাদা। টাকা-পয়সা জমাতে আমার ভালো লাগে না। শিক্ষাটা পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। ছেলেবেলায় দেখতাম, পূজা-পার্বণে আমাদের বাড়িতে অনেক লোকের ভিড়। বাবা তাদের খাওয়াচ্ছেন। জেলে, কৃষকদের ডেকে নিয়ে আসছেন। দূরের লোকদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করছেন।’ নরসিংদী বাজারের জুতা ব্যবসায়ী কিরণ সরকার বলেন, ‘এখানে আছি আট বছর হলো। দাদাকে তখন থেকেই দেখতাম। বলতাম, খেয়ে-দেয়ে কোনো কাজ নেই লোকটার। কিন্তু এখন মনে হয়, দাদা ভালো কিছুই করছেন।’ কথা হয় প্রেসের মালিক সজীব রায়ের সঙ্গেও। তিনি টেবিল থেকে কয়েকটি চকোলেট বের করে বললেন, ‘এগুলো দাদা আমাকে দিয়েছেন। এদিকে এলেই আমাকে দিয়ে যান। খুব ভালো লাগে।’

 

তিনি মাছের আড়তদার

এমপি এছাক মার্কেটে সকালের বাজারে বসেন। মাছ বিক্রি করে যা পান, চকোলেট কেনেন। বাসায় টাকা দেন না। স্ত্রী-সন্তানরাও কিছু বলেন না। ছেলেদের নরসিংদী বাজারে কাপড়ের দোকান আছে। স্ত্রীর কোনো অভিযোগ নেই তাঁর প্রতি। ছেলেরা তাঁকে মাছের কাজ ছেড়ে দিতে বলেন। কিন্তু তিনি কাজ ছাড়া থাকবেন না। যত দিন সুস্থ থাকেন, ইচ্ছা আছে মানুষকে চকোলেট খাইয়ে যাবেন।

কৃষ্ণপদের বাড়ি নরসিংদী শহরের বৌয়াকুড় মহল্লায়। তৃতীয় শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় ১২ বছর বয়সেই বাবার সঙ্গে কাজে লেগে গিয়েছিলেন। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক।

মন্তব্য