kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

ভিনদেশে বাংলাদেশি

পরাজয় মানেননি যিনি

শাহমিকা আগুন। নামের মতোই তিনি আঁধার তাড়াচ্ছেন। লন্ডনের তিনটি সেন্টারের তিনি থেরাপিস্ট। কথা বলে এসেছেন জুয়েল রাজ

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



পরাজয় মানেননি যিনি

শাহমিকার একমাত্র ছেলে অটিস্টিক। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। সময়টা ছিল দুর্বিষহ। আত্মহত্যাই ছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। পুলিশি তৎপরতা তাঁকে বাঁচিয়ে দেয়। তার পর থেকে জীবন বদলে গেল। এখন দেশ-বিদেশের শত শত মায়ের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন শাহমিকা। পেশায় তিনি একাধারে পুষ্টিবিদ, হোলিস্টিক থেরাপিস্ট ও মাইন্ড-বডি কোচ। খাদ্য ও পুষ্টিবিদ্যায়—বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ড থেকে দুটি মাস্টার্স করেছেন। তারপর কিছুদিন সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেছেন। পরে শুরু করেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস, গড়ে তোলেন নিজের প্রতিষ্ঠান।

 

একা হয়ে যান

ব্রিটিশ এক ভদ্রলোককে বিয়ে করেছিলেন শাহমিকা। তাঁর সংসার সুখের ছিল। বৈশাখী মেলা আয়োজন, বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে প্রচারণা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। তবে এত সব করতে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। ২০১৪ সালে একবার অসুস্থও হয়ে পড়েন। ২০১৫ সালে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তখন সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তাঁর একার যুদ্ধ। এর মধ্যে ভালো একটি ঘটনা ঘটে। ২০১২ সালে সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত পুষ্টিবিদ ড. সুসান লেনহামের তত্ত্বাবধানে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প মিলেনিয়াম রিসার্চে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে যান শাহমিকা। গবেষণার বিষয় ছিল দক্ষিণ এশীয় ও ইউরোপিয়ানদের হাড়ের রোগের সঙ্গে ভিটামিন ডি, আয়োডিন ও থাইরয়েডের সম্পর্ক।

 

বাধার দেয়াল ভাঙা

শাহমিকা বলছিলেন, ২০১৩ সালে আমার ছেলের অটিজম ধরা পড়ে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। বলতে গেলে আমি দিশাহারা হয়ে যাই। কোথাও কোনো আশার বাণী শুনতে পাচ্ছিলাম না। সব ছেড়ে দিয়ে অটিস্টিক শিশুদের কেয়ার হোমে কাজ নিই। বুঝতে চাইলাম অটিজম। আজ আমি ও আমার ছেলে অটিজমকে আমাদের জন্য আশীর্বাদে পরিণত করেছি। শুরুর সময়টা অনেক কঠিন ছিল। তখন আমার ভাবনায় শুধু আমার সন্তান। মানসিক স্বাস্থ্য, নিউরন, মস্তিষ্ক, জিনতত্ত্ব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলাম। সে সঙ্গে জানতে থাকলাম কালার থেরাপি, ব্রেইন ভাইব্রেশন ফ্রিকোয়েন্সি থেরাপি, চায়নিজ মেরিডিয়ান থেরাপি, ইমোশনাল ফ্রিডম টেকনিক, জার্মান নিউ মেডিসিন ইত্যাদি। তখন শুধু নিজের সন্তানের কথাই ভেবেছি, অন্য কিছু ভাবার সময় ছিল না।

 

মায়ের মুখে হাসি

প্রাইভেট ক্লিনিকে নিজস্ব পদ্ধতিতে চিকিৎসা করি এবং অনলাইনেও রোগী দেখি। ইংল্যান্ডসহ পৃথিবীর অনেক শিশু ও তাদের পরিবারকে জটিল যন্ত্রণা থেকে বের করে আনতে সফল হয়েছি। আমার রোগীদের একটা বড় অংশ আসে ডাক্তারদের রিকমেন্ডেশনে (পরামর্শে)। নিজের সন্তান এখন নিজের কাজটুকু করতে পারে, মায়ের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে আসতে পারে। এর চেয়ে সুখের, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে বলুন? বলছিলেন শাহমিকা।

 

বাংলাদেশে যাত্রা

আসছে আগস্টেই বিশেষ শিশুদের (স্পেশাল চিলড্রেন) নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে যাচ্ছেন শাহমিকা। সেখানে মায়েদের পরামর্শ দেবেন। এখন অনলাইনে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠায় ভিডিওকলের মাধ্যমেও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে আগেও অনেকবার দেশে গেছেন। শাহমিকা বললেন, ‘ফরমালিনযুক্ত মাছ বা মাংস আমাদের দেশের মানুষ সারাক্ষণ খাচ্ছে। শিশুকেও খাওয়াচ্ছে। প্রোটিনের মান ভালো না হলে জিন তো বদলে যাবেই। জিনের বেশির ভাগটা তৈরি হয় প্রোটিন আর অ্যামাইনো এসিড দিয়ে। আর অটিজমের জন্য জিন দায়ী। তাই সবারই বিশুদ্ধ খাবারের প্রতি মনোযোগী হতে হবে।’

মন্তব্য