kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

সুপ্রভাত বাংলাদেশ

বাবু একজন আদর্শ কৃষক

কৃষির টানে সরকারি চাকরিও ছেড়েছেন আহসান-উল হক বাবু। স্বল্প দিনে তাঁর অর্জনও অনেক। সৈয়দপুরের তিনি একজন আদর্শ কৃষক। দেখা করে এসেছেন ভুবন রায় নিখিল ও তোফাজ্জল হোসেন লুতু

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাবু একজন আদর্শ কৃষক

কামারপুকুর ইউনিয়নের অসুরখাই গ্রাম। বাবু অতি প্রাচীন বিভিন্ন জাত রক্ষার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবারে আবাদ করেছেন পার্পল ভুট্টা। এটি প্রাচীন একটি পেরুভিয়ান জাত। এর দানা গাঢ় জাম রঙের হয়। এটি বিলুপ্তপ্রায়। তবে সাধারণ ভুট্টার চেয়ে এর পুষ্টিমান অনেক বেশি।

বিখ্যাত খোরাসান গম নিয়েও কাজ করছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় ধান কাটারিভোগ, কালিজিরা, বালাম, লক্ষ্মীদিঘা, ধনিয়া, রাঁধুনিপাগল, সাহেব চিকন, কালাভাত ধানের আবাদ করছেন। পাশাপাশি ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন প্রজাতির জনপ্রিয় আম, মালটা, বিভিন্ন জাতের লিচুর আবাদ করছেন। রামবুটান ফল আর কফিরও সফল চাষি তিনি।

পার্পল ভুট্টা

ইনকা সভ্যতার আমল। পার্পল ভুট্টা মুখরোচক খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত পেরুর লোকেরা। এই ভুট্টার রসের পানীয়েরও দারুণ কদর ছিল। ব্লুবেরির চেয়েও এই ভুট্টায় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে। বাবু বলেন, সুস্বাদু ওই ভুট্টা খেতে পাকা ফজলি আমের মতো মিষ্টি। এর মিষ্টতার মাত্রা ২০, যেখানে পাকা ফজলি আমের ১৯। প্রথমে আমি ইন্টারনেটে ভুট্টার জাতটি সম্পর্কে জানতে পারি। পরে এর বীজ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল ঠিকানা সংগ্রহ করি। তারপর আমেরিকায় আছেন এমন একজন আত্মীয়ের মারফত বীজ সংগ্রহ করি। গত বছরের ২২ নভেম্বর জমিতে ১২ দিন বয়সী চারা রোপণ করি। রোপিত প্রতিটি চারা থেকে তিন-চারটি করে কার্যকর কুশি বের হয়। আর প্রতিটি ভুট্টাগাছেই তিন থেকে চারটি ভুট্টার মোচা হয়। সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে এই ভুট্টা চাষে ব্যবহার করা হয়েছে বায়োগ্যাস, কেঁচো সার, হাড়ের গুঁড়া, শিঙের গুঁড়া, কোকো কয়ার ও সামান্য পরিমাণে ডিএপি, এমওপি এবং ইউরিয়া সার। কীটনাশক হিসেবে মেহগনি ও নিমতেল ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে মোটেও পোকার আক্রমণ দেখা যায়নি।

 

খোরাসান গম

মিসরের পিরামিডে ফারাওদের মমির ধারে-কাছে আরো সব জিনিসের সঙ্গে খোরাসান গমও পাওয়া গেছে। এই গম অন্য গমের তুলনায় দ্বিগুণ লম্বা। এর রং আকর্ষণীয় আর এটি মিষ্টিগন্ধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক আমেরিকান বৈমানিক মিসর থেকে খোরাসান গমের কিছু বীজ উত্তর আমেরিকায় নিয়ে যান। বাবু এই গমের বীজ সংগ্রহ করেছেন কানাডাফেরত সিলেটের আব্দুল বাসিত সেলিমের কাছ থেকে। পরীক্ষামূলক চাষ করে সফলও হয়েছেন।

প্রথমে ট্রেতে বীজতলা তৈরি করেছেন। তারপর ১২ দিন বয়সী গমের চারা জমিতে রোপণ করেন গত নভেম্বরের ১০ ও ১১ তারিখে। বাবু জানান, প্রতিটি গমগাছ থেকে সর্বোচ্চ কুশি আসে ১২৫টি। আর কার্যকর সর্বোচ্চ গমের শীষ হয়েছে ৯০টির মতো। এই গমের চাষ সম্পূর্ণ অর্গানিকভাবে করা হয়েছিল।

বাবু বলেন, মিষ্টিগন্ধী এই গমের আটার মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে যেকোনো গমের তুলনায় অনেক বেশি। মূলত জাপান এর প্রধান ক্রেতা।

 

কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম ধান

রংপুর ও দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কাটারিভোগ, কালিজিরা ও বালাম ধান বিলুপ্ত হতে চলেছে। রেইজড বেড ফারো অ্যান্ড টুইন প্লান্টেশন পদ্ধতিতে ওগুলো আবাদ করে ফলন বৃদ্ধিতে সফল হয়েছেন বাবু।  জাপানি শস্যবিজ্ঞানী টি কাটায়ামা ১৯৫১ সালে এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পদ্ধতিটির কথা বাবু জানতে পারেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। বীজ সংগ্রহ করেছিলেন সিলেটের এবি কৃষি প্রকল্প নামের একটি বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে।

বললেন, ‘বীজতলায় বীজ বপনের ১৪ দিনের মধ্যে তা জমিতে নিয়ে লাগাই। ৫৫ শতক জমির ১৫ শতকে কাটারিভোগ, কালিজিরা ১৫ শতক ও বালাম ২৫ শতকে লাগানো হয়েছিল। রেইজড বেড প্রস্থে ছিল ৩ ফুট। একটি সারি থেকে অপর সারির দূরত্ব এক দশমিক আট ফুট। চারা থেকে চারার দূরত্ব এক দশমিক তিন ফুট। একটি চারা থেকে সর্বোচ্চ ১৫২টি কুশি বের হয়েছে। সেচের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বেড়ের ফাঁকা জায়গা। চারা রোপণের ১৪০ দিন থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে ধান কেটে ঘরে তুলেছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান, অতিরিক্ত মহাপরিচালক শাহ্ আলম, রংপুরের তাজহাট কৃষি ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মো. মনিরুজ্জামান বাবুর কৃষিজমি পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন।

 

একজন বাবু

পিতা তছির উদ্দিন সরকার ছিলেন চাকরিজীবী। মাতা আছিয়া খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তাঁদের চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট বাবু। বাবাকে ছোটবেলায় নিজের জমিতে ডাল, জব, গম, সরিষা, ধান, আলু, রসুন, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ আবাদ করতে দেখেছেন। বাবা বাড়িতে  গরু পালতেন, পুকুরে মাছও চাষ করতেন। বাবু স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে চাকরি নিয়েছিলেন। পরে সব ছেড়ে কৃষিকাজে ফিরে আসেন।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে মত্স্য ও পশু পালনের ওপর তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর ১৯৯৯ সালে এক মাসের প্রশিক্ষণ নেন ভারতে। পরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ উৎপাদনকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ২০০৩ সালে সজীব সিডস্ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে নিজেই ধান ও আলু বীজ উৎপাদন করে বাজারজাত করতে থাকেন।

মন্তব্য