kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

কুকুর নয় মানুষ

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সকালে ঘুম থেকে জাগতে প্রত্যেকের নানা রকমের তরিকা থাকে। সকাল সকাল ওই ঘুমের রাজ্য থেকে ফিরতে অনেকেরই বিছানা-বালিশের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। আহা, চোখ যেন খুলতেই ইচ্ছা হয় না। তবু জীবনের জন্য প্রতিদিন আমাদের জেগে উঠতেই হয়। কেউ জাগে অ্যালার্ম ঘড়ির একঘেয়েমি শব্দে, কেউ বা জাগে শহুরে জীবনের কর্কশ-যান্ত্রিক কোলাহলে। কারো সকাল হয় মায়ের হাতের স্নেহের পরশে। আবার কারো ঘুম ভাঙে পাখ-পাখালির কলতানে। সেই ঘুম কখনো যদি একটা শক্তপোক্ত লাঠির আঘাতে ভাঙে তাহলে সেটা মোটেও সুখকর কোনো ব্যাপার নয়, বরং অমানবিক। তবে কারো কারো ঘুম এভাবেও ভাঙে!

ছোট ভাই গ্রাম থেকে আসবে। তাই ওর জন্য সকাল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছি। তবে অপেক্ষার চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি। আগে কখনো ঢাকায় একা আসেনি। ওর কাছে কোনো মোবাইল ফোনও নেই। তবে আসার আগে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। কোথায় নামতে হবে, আমি কোথায় ওর জন্য অপেক্ষা করব ইত্যাদি। যাত্রী বের হওয়ার সরু গেটের কাছে অপেক্ষা করছি। এক জোড়া চোখে অসংখ্য মানুষের মাঝে পরিচিত একখানা মুখ খুঁজছি। কর্মজীবী নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নব দম্পতি, তরুণ-তরুণী,  রোগী, কুলি, পুলিশ, ভিখারি কত শত মানুষ গেট গলে বেরিয়ে যাচ্ছে এই স্টেশনে, শান্ত সকালে। কিন্তু মন ক্রমে দুশ্চিন্তায় অশান্ত হয়ে উঠছে পরিচিত একটি মুখ খুঁজে না পাওয়ায়। পরে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলাম নির্দিষ্ট ট্রেনটি তখনো আসেনি; বরং আমিই আগে এসে পড়েছি।

গেটের কাছেই স্টিলের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলাম।

দূরে কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী লাঠি হাতে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। আমার পাশে বসা একজন বয়স্ক ভদ্রমহিলা হকারের কাছ থেকে দৈনিক পত্রিকা কিনলেন। আরেক বৃদ্ধ মহিলার একটা মলিন হাত আমার দিকে শ্লথ গতিতে এগিয়ে এলো। মানিব্যাগ খুঁজে পাঁচ টাকা তুলে দিলাম সেই হাতে। এসবের মাঝেই হঠাৎ পেছন থেকে সপাৎ সপাৎ আওয়াজ এলো কানে! লাঠি দিয়ে গরু-মহিষ পেটালে যেমনটা শোনা যায়, ঠিক তেমন। ছোটবেলায় গ্রামে দেখেছি—ধান, পাট, আখ ইত্যাদি পণ্যবোঝাই গরু-মহিষের গাড়ি প্রায়ই জলকাদার রাস্তায় আটকে যেত। আর তখন কোনো কোনো বদরাগী গাড়োয়ান এসব নিরীহ পশুকে হাতের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাত। তখন এ ধরনের সপাৎ সপাৎ আওয়াজ মনে ভয় ধরাত। কিন্তু এখানে কে কাকে পেটাল? দেখলাম বাঁ দিক দিয়ে লাঠি ঘুরাতে ঘুরাতে একজন নিরাপত্তাকর্মী বেরিয়ে এলো। লোকটাকে মনে মনে ধিক্কার জানালাম। আরে ভাই! কুকুর, তাই বলে এভাবে মারতে হবে। ওরা কি ব্যথা পায় না? ঘুমন্ত প্রাণীকে কেউ এভাবে পেটায়?

কিন্তু এমন পিটুনি খেয়েও কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ শোনা গেল না দেখে অবাক হলাম। ভুল ভাঙল একটু পর। না, কুকুর নয়? একটা সাত কি আট বছরের ছেলে চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এলো। টোকাই, যার ঘুম ভাঙল লাঠির আঘাতে। ওর চোখে ঘুম তখনো লেগেছিল। খানিকবাদে লাঠির আঘাতে আরো দুজনের ঘুমের শান্তি সাঙ্গ হলো। ওরা ঘুমিয়েছিল আমি যেখানে বসেছিলাম ঠিক তার বিপরীত দেয়াল ঘেঁষে। চোখে পৃথিবীর আলো পৌঁছানোর আগেই অকস্মাৎ নিরাপত্তারক্ষীর লাঠির আঘাত ওদের জানিয়ে দিয়েছে ‘গুড মর্নিং’। ওরাও নির্বিকার চিত্তে মেনে নিয়েছে—যেন এটা একটা দুঃস্বপ্ন। তাদের মুখে কোনো শব্দ ছিল না। শুধু ছিল অসহায়ের মতো চোখে চেয়ে থাকা এবং নিশ্চুপ প্রস্থান। চোখগুলো ভালো করে খেয়াল করলে মনে হয় নীরব চোখে সরবে ছুটে বের হচ্ছে অভিশাপের তীর। সে তীর কার দিকে ধেয়ে আসছিল? যে আঘাত করল তার দিকে, নাকি যিনি আমাদের হাত দিয়েছেন তার দিকে? নাকি আমার দিকে? এসবে কার কী এসে যায়? ওরা তো কুকুর নয়, মানুষ।

—শংকর বিশ্বাস

থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য