kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

খুঁজে ফেরা

মাহমুদাবাদের চিমনি

আকাশে কালো মেঘ, থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে, কোথাও কেউ নেই। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নীলকুঠি বাসস্ট্যান্ডের উত্তর দিকে একটি কাঁচা মেঠো পথে তিন শ গজ গিয়ে মো. আব্দুল কাদির দেখলেন একটি চিমনি। জানতে চেয়েছিলেন এর ইতিকথা

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মাহমুদাবাদের চিমনি

গ্রামের নাম মাহমুদাবাদ। নরসিংদীর রায়পুরায় এই গ্রাম। একজন বৃদ্ধ দূর থেকে আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন। নাম বললেন জয়নাল আবেদিন মিস্ত্রি। বয়স আশির বেশিই হবে। তিনি বললেন, এটি নীলকুঠির চিমনি। দুই শ বছর আগের কথা। ইংরেজদের কুঠি ছিল এখানে। তারা এখানে নীল আবাদ করত। এখানকার মাটি নীল চাষের জন্য খুব উপযোগী। রায়পুরার বটতলী, মির্জানগর, হাইরমারা, চরসুবুদ্ধি, আগারনগর, মাহমুদাবাদ ও দৌলতকান্দি রেললাইন পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় তখন নীল চাষ হতো। পরে এই কুঠির নাম থেকেই এখানে বাসস্ট্যান্ড ও বাজার হয়। নরসিংদী জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে এ জায়গা।

 

মিস্ত্রিবাড়ি

জয়নাল আবেদিন মিস্ত্রি আরো জানালেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের আদিভূমি ছিল যশোরে। এককালে এখানে কোনো জনবসতি ছিল না। জনমানবহীন জায়গাটিতে তিন ইংরেজ ভিড় জমান। তাঁদের নাম জিপি ওয়াইজ, ডাব্লিউ ওয়াটস ও জর্জ লেমন। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে জাহাজ ভিড়িয়ে কুঠি স্থাপন করেন। নীল উৎপাদনের জন্য তাঁদের দরকার ছিল দক্ষ শ্রমিক। তখন এখানে সে রকম দক্ষ শ্রমিক ছিল না। তাই ইংরেজরা যশোর জেলা থেকে একজন দক্ষ মিস্ত্রি নিয়ে আসেন। তাঁর নাম ছিল মনোহর মিস্ত্রি। তাঁর হাত ধরেই এ অঞ্চলে নীল উৎপাদন শুরু। পরে তিনি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেই মনোহর মিস্ত্রি থেকেই আজকের এই মিস্ত্রিবাড়ি।

 

পাতা থেকে নীল

প্রাপ্তবয়স্ক নীলগাছের পাতার অংশবিশেষ কেটে বড়সড় পাত্রে ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর পানি ছেঁকে আরেকটি পাত্রে ঢালা হয়। অনেকক্ষণ পানি নাড়লে নীল রং বেরিয়ে আসে। তারপর চুল্লির আগুনে গরম করলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে নীল নিচে জমা হতে থাকে। তখন চিমনি দিয়ে উড়ে যেত সাদা ধোঁয়া। জয়নাল মিস্ত্রি বললেন, কৃষকরা নীল চাষ করতে চাইতেন না। কিন্তু তাঁরা নীলকরদের থেকে দাদন নিয়ে আটকে যেতেন। কোনো কোনো সময় তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়েও পালাতেন। তখন নীলকররা কৃষকদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিত। একসময় এখানকার কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নীল বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন। ইংরেজরা তাঁদের পেছনে লাঠিয়াল বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিল। কোনো কোনো বিদ্রোহী কৃষককে জ্বলন্ত চুল্লিতে পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে।

 

কুঠির চিমনি

চিমনিটি ব্রহ্মপুত্রের পারে। আজও নীলচাষের ইতিহাস বহন করে টিকে আছে। একবারের ভূমিকম্পে এর খানিকটা দেবে গিয়েছিল। চিমনির উচ্চতা ৭৫ ফুট। এটি ইটের তৈরি। প্রস্থ ১০ ফুট। দেওয়াল ২ ফুট পুরু। চিমনির দেওয়ালে অনেক গর্ত। এক শর বেশি টিয়া পাখি ওসব গর্তে বাসা বেঁধেছে। কুঠির দক্ষিণ দিকে পুরনো দালানে বাস করেন আবুল কালাম মিস্ত্রি। তিনি জানান, অযত্ন-অবহেলায় চিমনিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি ইতিহাস ধরে রেখেছে। এর সংরক্ষণে সবার সহযোগিতা দরকার।

মন্তব্য