kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

হান্নানের ঘোড়া

ড. এম এ হান্নান বাংলাদেশি তরুণ বিজ্ঞানী। গবেষণা করছেন জাপানে। ভ্রূণ স্থানান্তরের মাধ্যমে ঘোড়ার বাচ্চা প্রসব করিয়েছেন। তাঁর সাফল্যে খুশি সারা বিশ্ব। আবুল বাশার মিরাজ জানাচ্ছেন বিস্তারিত

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হান্নানের ঘোড়া

২০০২ সাল। সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চান্স না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন হান্নান। তবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ভেটেরিনারি অনুষদে চান্স পান। বন্ধুরা বলাবলি করত, গরুর ডাক্তার। হান্নানের একটু মন খারাপ হতো। তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম বললেন, ‘বন্ধুদের কথা বাদ দাও! মানুষের সেবা করতে পারবে না তো কী হয়েছে? পশুপাখির সেবা করতে তো পারবে।’ হান্নানকে তিনি বোঝালেন—পশুপাখি স্রষ্টার সৃষ্টি, অবলা প্রাণী, এদের চিকিৎসা করাও অনেক পুণ্যের কাজ। বাবার কথাগুলো আজও মনে গেঁথে আছে হান্নানের। বলছিলেন, ‘হয়তো মেডিক্যালে পড়লে এত দূর না-ও আসতে পারতাম। দেশের বাইরে এত ভালো গবেষণাও হয়তো করতে পারতাম না।’

সম্প্রতি হান্নান কৃত্রিম প্রজননের পর ভ্রূণ স্থানান্তরের মাধ্যমে ঘোড়ার বাচ্চা প্রসব করিয়েছেন। জাপানের ইতিহাসে এটা প্রথম। তিনি বলছিলেন, ‘বাবাই ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। তিনিই আমাকে বাকৃবিতে ভর্তির পরামর্শ দেন। আসলে আমি অনেক ভাগ্যবান ছিলাম, বাড়ির (দিঘারকান্দা) পাশেই ছিল আমার ক্যাম্পাস। এমনকি আমি শৈশবে যে স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়েছিলাম, তিনিই আমেরিকায় আমার সুপারভাইজার (তত্ত্বাবধায়ক) ছিলেন। তিনিও বাকৃবিতেই ভেটেরিনারি অনুষদে একই বিভাগে পড়াশোনা করছেন। আমার সেই স্যার ড. আজিজ সিদ্দিকীর পরামর্শেই পথ চলার চেষ্টা করি। তাঁর পরামর্শেই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সার্জারি ও অবস্ট্রেট্রিকস বিভাগে ভর্তি হই। কারণ স্যার জানতেন আমি নতুন নতুন আবিষ্কারের বিষয়ে বেশ আগ্রহী। তিনি এখন আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। মাস্টার্সে আমার সুপারভাইজার ছিলেন অধ্যাপক ড. মো. শামছুদ্দিন স্যার। তিনি এখন ইতালির রোমে এফএওয়ের প্রধান দপ্তরে কর্মরত। তাঁর সহযোগিতার কথাও আমি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।’

 

গবেষকই হতে চেয়েছিলাম

‘২০০৮ সালে মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। মাস্টার্সে তিন সেমিস্টার—দুটি একাডেমিক আর একটি থিসিস। আমি দুই একাডেমিক সেমিস্টার শেষ করে ড. আজিজ এবং ড. শামছুদ্দিন স্যারের সহযোগিতায় আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রকল্পে গবেষণা করার সুযোগ পাই। গবেষণা শেষে বাংলাদেশে এসে থিসিস জমা দিই। সে সময় ভালো গবেষণা করার কারণে গবেষণা সহযোগী হিসেবে আবার আমেরিকায় ডাক পাই। আরো এক বছর পরে ফিরে এসে আইসিডিডিআরবিতে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিই। গবেষণায় আমার বেশি আগ্রহ। তাই পরের বছরে জাপান সরকারের মনবুকাগোসো বৃত্তি নিয়ে জাপানের ওসাকা প্রিফেকচার ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে যাই। ২০১৭ সালে পিএইচডি শেষ করে সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিই। ওই বছরই পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের সুযোগ পেয়ে যাই। গণবিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাছুটি নিয়ে চলে আসি জাপানের অবিহিরো ইউনিভার্সিটি অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিনে। প্রফেসর ড. ইয়াসুও নামবোর তত্ত্বাবধানে ভ্রূণ স্থানান্তর গবেষণা প্রকল্পে যোগ দিই।’

 

ঘোড়া নিয়ে বলি

‘হিমায়িত শুক্রাণু দ্বারা ঘুড়ি কৃত্রিম প্রজননের পর তা থেকে ভ্রূণ সংগ্রহ করে অন্য ঘুড়িতে স্থানান্তর করি। এটি সুস্থ বাছুর জন্ম দিয়েছে। ভ্রূণ সংগ্রহ ও স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। এ জন্য প্রথমে আমি ইউরোপ থেকে ‘আইরিশ কনেমারা পনি’ জাতের পুরুষ ঘোড়ার হিমায়িত সিমেন আমদানি করি। স্থাপন করেছিলাম ‘জাপানিজ হোক্কাইডো পনি’ জাতের ঘুড়িতে। তারপর গত বছরের মে-জুন মাসে ভ্রূণ স্থানান্তরের কাজ করি আরো বড় পরিসরে। একটি দাতা ঘুড়ি থেকে ভ্রূণ নিয়ে তিনটি গ্রহীতা ঘুড়িকে গর্ভবতী করি। এদের মধ্যে একটি ঘুড়ি গেল ১০ এপ্রিল একটি সুস্থ নতুন শংকর জাতের বাছুর জন্ম দেয়। এ সুসংবাদ ১২  এপ্রিল জাপানের প্রধান দৈনিকগুলো গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে। কিছুদিন পরে বাকি দুটি ঘুড়িও বাচ্চা প্রসব করেছে। এর আগে ঘুড়িগুলোর গর্ভধারণের বিষয়টি আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির দ্বারা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হলে সেই ফলাফল একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়।’

 

আগামী দিন

হান্নান বলেন, ‘যত দিন বেঁচে আছি তত দিন গবেষণা চালিয়ে যেতে চাই। এ বছরের শেষের দিকে আমার দেশে ফেরার পরিকল্পনা আছে। দেশে এসে এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় ঘোড়া পুনরুদ্ধারে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদে এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, বিশেষ করে কোরবানির সময় প্রচুর গবাদি পশু আমদানি করতে হয়। সে কারণে দেশে ফিরে গরু ও মহিষের প্রযুক্তিটি প্রয়োগ করতে চাই। আর ঘোড়ার চেয়ে গরুতে ভ্রূণ স্থানান্তর সহজ। সফলতার হারও অনেক বেশি। এ জন্য আমাদের দেশীয় জাতের ভালো মানের গাভিগুলোতে বিদেশি জাতের ষাঁড়ের বীজের মাধ্যমে নতুন শংকর জাত উদ্ভাবন করতে চাই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কয়েক বছরের মধ্যেই প্রচুর দুধ ও মাংস উৎপাদনকারী গরু ও মহিষ উৎপাদন সম্ভব হবে।’

মন্তব্য