kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

গ্যালারি নম্বর ২৩

মাঝখানে পাঁচ বছর বন্ধ ছিল। নতুনরূপে ১৮ মে থেকে আবারও চালু হয়েছে জাতীয় জাদুঘরের ২৩ নম্বর গ্যালারি। অস্ত্রশস্ত্রের ১৮০টি নিদর্শন রয়েছে এ গ্যালারিতে। দেখে এসেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গ্যালারি নম্বর ২৩

শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় অবস্থিত এই বিশেষ গ্যালারি নিয়ে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কমতি ছিল না কখনো। কিন্তু মাঝখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর বন্ধ থাকার ফলে অমূল্য এসব নিদর্শন দেখার সুযোগ মেলেনি দর্শনার্থীদের। আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উপলক্ষে ১৮ মে থেকে অস্ত্রশস্ত্রের এই সংগ্রহশালা ফের উন্মুক্ত হলো সবার জন্য। গ্যালারিতে থরেথরে সাজিয়ে রাখা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে গদা, গুরুজ, তরবারি, ছুরি, কুঠার, গুপ্তি, অঙ্কুশ, মাস্কেট, মাস্কেটুন, শিরস্ত্রাণ (কুলাহ খুদ), বক্ষাচ্ছাদন, বিভিন্ন ধরনের ঢাল, ছুরি বা কুকরি, রামদা, খড়্গ, পিস্তল, রিভলভার, কামান, বেয়নেট, যুদ্ধে ব্যবহৃত নিশান দণ্ড, নাকাড়া ইত্যাদি। শুধু শত্রুকে ঘায়েল করার সরঞ্জাম হিসেবে নয়, শৈল্পিক নিদর্শন হিসেবেও এসব অস্ত্রশস্ত্রের কদর রয়েছে। অস্ত্রের গায়ে বিভিন্ন কারুকাজ ও নকশার ব্যবহার চোখে পড়বে, বিশেষ করে তরবারির হাতল, শরীর ও খাপের নকশা দেখে মুগ্ধ হবেন। এ ছাড়া পবিত্র কোরআনের আয়াত কিংবা ফারসি লিপির পাশাপাশি অনেক অস্ত্রের গায়ে দেব-দেবী, মানব ও পশুর প্রতিকৃতিও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি দ্রষ্টব্যের নিচে বাংলা ও ইংরেজিতে নাম, আকার, সময়কাল এবং সংগ্রহের স্থানের নাম লেখা রয়েছে। ডিসপ্লে সেটে যুক্ত করা হয়েছে ছোট ছোট টেলিভিশন পর্দা। সেখানে নিদর্শনসংশ্লিষ্ট ইতিহাস ও বিভিন্ন যুদ্ধের দৃশ্যাবলি দেখার সুযোগ মিলবে। সমৃদ্ধ এই গ্যালারি ঘুরে সহজেই জেনে নিতে পারবেন ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর অস্ত্রের বিবর্তনের ইতিহাস।

জাতীয় জাদুঘরের জনসংযোগ বিভাগের কিপার ড. শিহাব শাহরিয়ার জানালেন, প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ব্যবহৃত এক হাজার ৪৭টি অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে। নবসজ্জিত গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে মোট ১৮০টি নিদর্শন। নিদর্শনগুলোর বেশির ভাগই জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর সংগ্রহ করা। এসব নিয়ে ১৯২৫ সালে তিনি বলধা জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৩ সালে ওই জাদুঘরের সংগ্রহ জাতীয় জাদুঘরে (তৎকালীন ঢাকা জাদুঘর) স্থানান্তর করা হয়। এসব সংগ্রহ ‘বলধা সংগ্রহ’ নামেও পরিচিত।

 

একটুখানি ইতিহাস

বাংলার অস্ত্রশস্ত্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খ্রিস্টীয় ১৫ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত বাংলার সৈন্যরা প্রধানত তীর-ধনুক দিয়েই যুদ্ধ করত। এ ছাড়া তারা বর্শা, বল্লম, শূল প্রভৃতি ব্যবহার করত। ১৬ শতকের কবি মুকুন্দরামের লেখনীতে শূলজাতীয় বর্শা, শেল; কুঠারজাতীয় পরশু, ডাবুশ; মুগুড়জাতীয় ভুষণ্ডি, তোমর, মুদগড়, পাশ ও চক্রের উল্লেখ আছে। খ্রিস্টীয় ১৬ শতকে বাংলাদেশে যুদ্ধে কামান, বন্দুক প্রভৃতি ব্যবহৃত হতো বলে রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর ‘বাংলাদেশের ইতিহাস : মধ্যযুগ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। মধ্য যুগেও বাংলায় অস্ত্রশস্ত্র তৈরির প্রমাণ মেলে। দীনেশচন্দ্র সেনের লেখায় আছে, ...শ্রীহট্টের (সিলেটের) ‘ঢাল একসময় ভারত প্রসিদ্ধ ছিল’। শ্রীহট্ট একসময় কামান নির্মাণের জন্যও প্রসিদ্ধ ছিল। ইটার পাঁচগাঁয়ের কর্মকারদের পূর্বপুরুষ জনার্দন কর্মকার ১৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে হরবল্লভ নামে এক ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে প্রসিদ্ধ ‘জাহানকোষা’ (জগজ্জয়ী) কামান তৈরি করেছিলেন। কামানটির ওজন ২১২ মণ। দৈর্ঘ্য ১২ হাত, পরিধি ৩ হাত। মুখের বেড় দেড় হাত ও অগ্নিসংযোগের ছিদ্র দেড় ইঞ্চি। ভারতীয় উপমহাদেশের অস্ত্রশস্ত্রে সম্মানের সঙ্গে সম্রাট, রাজপুত্র, সেনাপতি বা প্রস্তুতকারকের নাম খোদাই করা থাকত। এসব অস্ত্রে বিভিন্ন ধরনের বাণী, কোরআনের আয়াত, ফারসি লিপি, মানুষ, দানব, দেব-দেবী ও হিংস্র পশুর অনুকৃতি ব্যবহারের রেওয়াজ ছিল। মধ্যযুগীয় অস্ত্র যেমন—তরবারি, ডেগার, কাটার ইত্যাদির ব্লেডে, বাঁটে বা খাপে অলংকরণ ও খোদাই কাজের নমুনা এবং জ্যামিতিক বা ফুলেল নকশা দেখতে পাওয়া যায়।

 

শুরু থেকে শেষ

গ্যালারির প্রবেশমুখেই আছে ছয়টি কামান। তিনটি সম্রাট শেরশাহের আমলের, অন্যগুলো জমিদার ঈশা খাঁর সময়ের। এগুলোর রং কালো। ঈশা খাঁর সময়ের দুটি কামানের গায়ে বাংলায় নাম ও তারিখ (১০০২ হিজরি, ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দ) লেখা। শেরশাহের কামানগুলো ১৫ শতকে তৈরি। কামানগুলোর কিছুটা পেছনে গ্যালারির মাঝ বরাবর আছে বেশ বড় দুটি যুদ্ধের নাকাড়া। সম্রাট আকবরের শাসনামলের (১৫৫৬-১৬০৫ খ্রিঃ) লিপিসংবলিত নাকাড়াগুলো তামার তৈরি। এগুলো ১৫ শতকের শেষ ভাগে তৈরি।

এরপর অস্ত্রের প্রদর্শনী। শুরুতেই কাচ-ঢাকা বক্সের ভেতর তীরসহ ধনুক। আরো আছে খাপসহ ভুজ, গুরুজ ও শুকতারা গদা। অস্ত্রগুলো ১৬ থেকে ১৮ শতকের। গদার দৈর্ঘ্য ১০৯.২২ সেন্টিমিটার। এরপর কুঠার, গুরুজ ও গরুর মাথাকৃতি গদা। পাশেই আছে ছুরি, খাপসহ কুকরি, দুটি খড়্গ। সঙ্গে রামদা। রামদার একপাশে চোখ আঁকা। আরেকটু সামনে এগোলেই একটি অংকুশ আর ছয়টি তরবারি। এর মধ্যে বড় একটি তরবারি আছে, যেটি দুই হাতে ধরে ব্যবহার করা লাগত। গ্যালারির উত্তর-পূর্ব কোনায় আছে তিনটি গুপ্তি। ১৮ শতকের একটি গুপ্তি আছে খাপসহ। কারুকার্য খচিত একটি গুপ্তির হাতল হাতির দাঁতের তৈরি। পাশেই তরবারিসহ ঢাল। এর পর ১৭ থেকে ১৮ শতকে ব্যবহৃত বাহুস্ত্রাণ ও বক্ষাচ্ছাদন। সঙ্গে সর্পিল আকৃতির তরবারি, খাণ্ডা ও কিরিচ। পাশের বাক্সের নির্দশনগুলো খুবই আকর্ষণীয়। এখানে আছে পারস্যের সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের ঢাল ও শিরস্ত্রাণ (কুলাহ খুদ)। ১৫ শতকের এ ঢাল ও শিরস্ত্রাণই গ্যালারির সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন। সব মিলিয়ে আটটি শিরস্ত্রাণ প্রদর্শিত হচ্ছে একসঙ্গে, যা সবই সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের (১৬৪২-১৬৬৬) সময়কালের। মাঝখানে রাখা বিশাল শিরস্ত্রাণটিতে শাহ আব্বাসের নাম লেখা। পাশে আছে সোনালি রঙের কুরিয়্যাস (বক্ষাচ্ছাদন)। আরো কয়েক কদম গেলেই নজরে পড়বে শমসির, কিরিচ, আরপুস্তা, সোসুন, পাটাইসহ মোট ১২টি তরবারি। এর মধ্যে বাঁকা একটি তরবারির আগা আবার দুই ভাগ করা। খাপসহ একটি তরবারির হাতলে বাঘের নকশা। পাশেই আছে বিভিন্ন আকৃতি ও নকশার মোট ছয়টি ছুরি। গ্যালারির দক্ষিণ প্রান্তে শুরু হয়েছে ছুরির সংগ্রহ দিয়ে। একসঙ্গে ২৭টি ছুরি রাখা সেখানে। ধাতুর তৈরি একটি ছুরির মধ্যভাগে মুখোমুখি দুটি বাঘ আঁকা। একটা ছুরির হাতলে আবার কোনো এক রাজার প্রতিকৃতি দেখা গেল। এরপর ঢাল ও ছোট কামান দেখে সামনে এগোলেই বেশ বড় বড় কয়েকটি বর্শা। সবচেয়ে বড়টির দৈর্ঘ্য ২৪৭.৬৫ সেন্টিমিটার। এগুলো ১৮ ও ১৯ শতকে ব্যবহৃত হতো। বর্শার পাশেই দেখবেন ক্ষুদ্রাকৃতির একটা কামান। যেটার ওপরে আবার ছোট্ট একটা সিংহের প্রতিকৃতি আছে। গ্যালারির পশ্চিম কোনায় দেখবেন অনেকগুলো পিস্তল। এগুলো একনলা পিস্তল, আঠার শতকের। চার নলা একটি পিস্তল আছে, যেটার দৈর্ঘ্য ১৯.৫ সেন্টিমিটার। সবার শেষে দেখবেন মেটালের তৈরি পাঁচটি বেয়নেট।

   

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

মন্তব্য