kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

স্বপ্ন ডুবে গেল

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্বপ্ন ডুবে গেল

মা স্বপ্ন দেখেছিলেন ছেলে বিদেশ গিয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনবে। ছেলে স্বপ্ন দেখেছিল বিদেশে গিয়ে মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন ছেলেটা বিদেশ গেলে নিজে দেশে ফিরে আসবেন। বোন ভেবেছিল ভাই ফিরলে ভাবি আনবেন। সব স্বপ্ন ডুবে গেল ভূমধ্যসাগরে। ফাহাদ লিবিয়া থেকে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। লিটন শরীফ শুনে এসেছেন বিস্তারিত

 

‘মাইগো, আমি যাইরামগি (চলে যাচ্ছি)। আমারে যে টেখা (টাকা) দিছো একটাও আমি খাইছি না। ওরা সব নিয়ে গেছে। কোনো কিছু খাইতে দেয়নি। দোয়া করিও।’

৮ মে রাত ৮টায় মুঠোফোনে মা আয়েশা আক্তারের সঙ্গে ফাহাদের কথোপকথন। মায়ের সঙ্গে ছেলের সেটিই ছিল শেষ কথা।

পরদিন ৯ মে রাত ১টার দিকে ফাহাদ তাঁর প্রবাসী মামার মুঠোফোনে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। তাতে বলেছিলেন, ‘মামা আমি বোটে বনো (বসা)। আমার আম্মারে (মাকে) কইও। কইবায়নি মামা?’ এটিই ছিল ফাহাদ আহমেদের শেষ বার্তা।

এরপর ফাহাদের স্বজনরা জানতে পারে সাগরে একটি নৌকাডুবি হয়েছে। বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মারা গেছেন। ওই নৌকায় মৌলভীবাজারের বড়লেখার ফাহাদও ছিলেন। এর পর থেকে মা আয়েশা আক্তারের কান্না আর থামছে না। কয়েক দিন ধরেই মৌলভীবাজারের বড়লেখার আকাশ ভারী হয়ে আছে আয়েশার দুঃখে। দেড় বছর আগে ফাহাদ দূরদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। একটা ভালো জীবন, একটা সচ্ছল জীবনের আশায়।

 

ফাহাদ ছিলেন সবার বড়

ফাহাদের বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখার পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিটেকা পূর্বের চকে। বাবা আব্দুল আহাদ দুবাইপ্রবাসী। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন সবার বড়। প্রবাসে যাওয়ার আগে বড়লেখা সরকারি কলেজে পড়তেন, ছিলেন এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র।

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিশিয়া উপকূলে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি হয়। নৌকাটি অভিবাসীদের বহন করছিল। ১৪ মে রেড ক্রিসেন্ট প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে মৌলভীবাজারের নিহত যে দুজনের নাম জানিয়েছে তাদের একজন শামীম ও অপরজন ফাহাদ।

যেভাবে প্রলোভন

দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় নাসির উদ্দিন নামের এক দালালের সঙ্গে। অল্প খরচে ইতালি পৌঁছানোর আশ্বাস দিয়েছিল সে। বলেছিল উচ্চ বেতনের কাজ পাবে ফাহাদ। বারবারই সে ফাহাদের সঙ্গে দেখা করে লোভ দেখাত। কখনো বাড়িতে এসে, কখনো বা কোনো চায়ের স্টলে বসে। আয়শা চাইছিলেন না সাগর পাড়ি দিয়ে ছেলেকে ইতালিতে পাঠাতে। কিন্তু নাসির উদ্দিন ফাহাদকে রাজি করিয়ে ফেলে। বলে, কোনো সমস্যা হবে না। যাবে জাহাজে। ভয়ের কিছু নেই। ফাহাদ অনেকটা জোর করেই মাকে রাজি করিয়েছিলেন। চুক্তি হয় আট লাখ টাকায়। মায়ের কাছে নগদ দুই লাখ টাকা ছিল। বাকিটা কয়েকজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে জোগাড় হয়। 

২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর ফাহাদ ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ার পথে বাড়ি থেকে বের হন। দুবাই, তুরস্ক হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পৌঁছানোর তিন মাস পরে একবার ইতালির উদ্দেশে নৌকায় তোলা হয়েছিল। কিন্তু ধরা পড়ে যায় ফাহাদরা। ধরা পড়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত আনার জন্য নাসির উদ্দিনকে চাপ দেওয়া হয় পরিবারের পক্ষ থেকে। কিন্তু নাসির উদ্দিন এবার উল্টোপথ ধরে। চাপ দিতে থাকে মুক্তিপণের জন্য।

 

ভয়ংকর দালালচক্র

প্রথমবার ধরা পড়ার পর ফাহাদরা ভয়ংকর দালালচক্রের ফাঁদে পড়েন। শুরু হয় নির্যাতন। কিছুদিন পরপরই ভিডিও কলে ফাহাদের দিকে বন্দুক ধরে আত্মীয়স্বজনের কাছে টাকা চাওয়া হতে থাকে। সন্তানের মায়ায় মা আয়েশা আক্তার দেশীয় দালাল নাসিরের কাছে টাকা দেন। দফায় দফায় বিক্রি করা হতে থাকে ফাহাদকে। সব শেষ হলে শেষ সম্বল বাড়িটিও প্রতিবেশীর কাছে বন্ধক দেন মা। মোট ১৮ লাখ টাকা দিয়েছেন দালালের কাছে।

পরিবার থেকে খাবারের টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওরা খাবার দিত অল্প। দিনে মাত্র একবার। গোসলের জন্য পানি দিত দুই-তিন দিন পর পর। পরিমাণে তা পর্যাপ্তও ছিল না। দিন-রাত শুধু কাঁদতেন ফাহাদ। ভয়েস মেসেজে নির্যাতনের এসব কথা মাকে কয়েকবারই জানিয়েছেন।

 

মরণ যাত্রা

শেষে ৯ মে চক্রটি ভূমধ্যসাগরের জলপথ পাড়ি দেওয়ার জীবন-মরণ খেলায় নামিয়ে দেয় ফাহাদদের। যাত্রা শুরু হয় বড় বোট দিয়ে। একপর্যায়ে বড় বোট থেকে ছোট একটি প্লাস্টিকের বোটে তোলা হয় অভিবাসীদের। বোটটি এতই ছোট ছিল যে একসঙ্গে এত মানুষের স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। প্লাস্টিকের বোটে উঠে ফাহাদ প্রবাসী মামার কাছে শেষবারের মতো বার্তা পাঠান। সবশেষে সমাধিস্থ হয় ভূমধ্যসাগরে।

 

মা কাঁদছেন

মা আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্বামী তাঁর বিদেশে। এ অবস্থায় বাবার বাড়ির লোকজন নিয়ে গেছেন নিজেদের বাড়িতে। বাবার বাড়ি বড়লেখার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল স্বজনরা আহাজারি করছে। আত্মীয়স্বজন ও আশপাশের লোকজন পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

মা আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আমি কিতা করতাম (কী করব)। আমি চাইছলাম না (চাইনি) পোয়ারে পাঠাইতে। নৌকা ডুবি যায়। পোয়ারে এমনভাবে উসকাইছে নাসির দালালে। পোয়া পাও ধরি কইছে কাঠের শিপে নিব, কিচ্ছু অইতো (হবে) নায়। রাজি অই যাও। অখন আমার বাইচ্চা আছে কি না কুনতা জানি না। জামাইও বেমার (স্বামী অসুস্থ)। তিনটা বাইচ্চা নিয়া বাড়ি ছাড়িয়া রোডও। না খাইলাম পানি, না খাইলাম দানা। অনাহারে জীবন কাটাইলাম (কাটাচ্ছি)।’

 

মামা বললেন

ফাহাদের এক মামা সাব্বির আহমদ বলেন, ‘আমার ভাগনা খুব সরল-সোজা। তারে খুব বেশি উসকানি দিত নাসির। ১০ দিনের মধ্যে ইটালি পৌঁছে দিব। এমনটা বলেছে। প্রথমে আট লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পরে কয়েকবার বন্দুক ধরে ভিডিও কল করে বলে, টাকা পাঠাও। ধারদেনা আর বাড়ি বন্ধক দিয়ে ১৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন ছেলেও গেল। বাড়িও গেল।’

 

চাচা বললেন

চাচার নাম নূরুল ইসলাম। তাঁর কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। ফাহাদের ছবি দেখে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘মায়ার ভাতিজা। ছেলেটারে মেরে ফেলেছে। আমার কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। ফাহাদ ছিল আমার কলিজার টুকরা। সব শেষ আমাদের।’

 

একজন নাসির

বড়লেখার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের বেয়ালি গ্রামের আমিন উদ্দিনের ছেলে। স্থানীয়ভাবে সবার কাছে তার পরিচিতি আদম ব্যবসায়ী হিসেবে। তার হাত ধরে অনেকেই স্বপ্নের দেশে যাত্রা করেন। এরপর জিম্মি হয়ে পড়েন। পরিবারকে দিতে হয় বড় মুক্তিপণ। আটকে পড়াদের স্বজনরা প্রতিকার চাইতে গেলে নাসির ও তার পরিবার ভয়ভীতি দেখায়। অনেক ওপরে তার হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতারিত লোকজন বিচার নিয়ে আসেন জনপ্রতিনিধিদের কাছে। কয়েকবার সালিস বিচারও হয়েছে। হঠাৎ সে উধাও হয়ে যায় এলাকা থেকে। ফাহাদের সঙ্গেও উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর নাম জুয়েল আহমদ (২৩)। জুয়েল আহমদ ওই ইউনিয়নের ছাতারখাই গ্রামের জামাল উদ্দিনের ছেলে। জুয়েলকেও নাসির পাঠিয়েছে। এমনটিই জানিয়েছেন জুয়েলের বাবা জামাল উদ্দিন।

উল্লেখ্য, এই ঘটনার পর বারবার নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

ছবি : লেখক

মন্তব্য