kalerkantho

বুধবার । ২৯ জানুয়ারি ২০২০। ১৫ মাঘ ১৪২৬। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

মহাপৃথিবী

যে রবিবার কাঁদায়

প্রতি মা দিবসেই নিক ডুয়েরডেন খুঁজতে বসেন কেন তাঁর মায়ের এত কষ্ট ছিল। শেষে ‘দ্য স্মলেস্ট থিংজ’ নামের একটি বই লেখেন। আর তাতে বলেন, মায়ের রাগ ছিল নানির ওপর

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যে রবিবার কাঁদায়

লরেটা আমার মায়ের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিলেন। ভালো ইংরেজি জানেন। ভালো পোশাক পরে থাকেন। মিলানে তাঁর ফ্ল্যাটটি ছোট কিন্তু গোছানো। আমার মায়ের কথা সবচেয়ে বেশি বুঝি তিনিই জানেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমার নানি যুগোস্লাভিয়া থেকে ইতালিতে আসেন। তাঁর বয়ফ্রেন্ড ছিলেন একজন রুশ। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের সম্পর্ক। যখন নানি বুঝলেন তিনি গর্ভবতী, রুশ মানুষটিকে বিয়ের জন্য তাগাদা দিলেন; কিন্তু লোকটি কিছুতেই বিয়েতে রাজি হলেন না। উল্টো নানিকে ছেড়ে চলে গেলেন দূরে কোথাও। নানির শেষে জায়গা হলো ধর্মশালায়। একসময় এক ইতালীয়র সঙ্গে নানির সম্পর্ক গভীর হলো। তাঁরা বিয়েতে একমত হলেন; কিন্তু নানির হবু শাশুড়ি কোনোভাবেই সন্তানসহ তাঁকে গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। নানি তাই আমার মাকে একটি ধর্মশালায় (কনভেন্টে) পাঠিয়ে দিলেন। মায়ের তখন বয়স পাঁচ বছর।

‘তোমার মা কিন্তু ব্যাপারটি সহজভাবে নেয়নি। একেবারেই সহজভাবে নেয়নি।’ বলছিলেন লরেটা। ‘কোনো দিন ভুলেও যায়নি এবং তোমার নানিকে ক্ষমাও করেনি।’

মায়ের বয়স যখন ১০, তখন নানির শাশুড়ি একটু নরম হলেন। তিনি মাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে সম্মত হলেন। তবে সেখানে শান্তি ছিল না। সব সময় ঝগড়া চলত।

আমার মা চাইতেন ওই সংসার থেকে দূরে কোথাও চলে যেতে। লন্ডন চলে যেতে চাইতেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঠিকই লন্ডনে পাড়ি জমালেন। সেখানে তিনি একজন আয়ার কাজ নিলেন, পরে একান্ত সচিব হয়েছিলেন। আর্লস কোর্ট রোডে বাসা নিয়েছিলেন।

আমি তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম ছয় মাস পর। বলছিলেন লরেটা। ‘সেটা একটা তুঙ্গ সময় ছিল। লন্ডন তখন নাচছিল বিটলসের সঙ্গে। আমরা দুই বান্ধবী আরো কয়েকটি ইতালিয়ান মেয়ের সঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে থাকতাম। আমরা ছিলাম মুক্ত, আর সবাই ছিলাম কর্মজীবী। সবাই ইচ্ছামাফিক স্বাধীন জীবনযাপন করছি; কিন্তু তোমার মাকে বিষণ্ন দেখাত। সে খুব সিরিয়াস টাইপের ছিল। সব সময় চাইত পারফেক্ট হতে। কখনোই ভুল করতে চাইত না। গভীর চিন্তা করত। এতগুলো মেয়ের মধ্যে শুধু আমার সঙ্গে সে কিছুটা মিশত। সে কখনো মজা করত না। আমার মনে হতো সে একটি ভারী বোঝা বয়ে চলেছে সব সময়—ভালো হতে চাওয়ার, ঠিক হতে চাওয়ার বোঝা।’

১৯৬৮ সালে লরেটা ইতালি ফিরে গিয়েছিলেন। আমার মায়ের সঙ্গে একজন হোটেল ব্যবসায়ীর সম্পর্ক হয়। এই মানুষটিই পরে আমার বাবা হবেন; কিন্তু আমার নানি কখনোই চাইতেন না মা ওই লোকটাকে বিয়ে করুক। তাঁরা চাইতেন না মা অত দূরের দেশে থাকুক। বলতেন, ‘এই বিয়ে টিকবে না। লোকটা তোমাকে কাঁদাবে।’ এক যুগ পরে যখন সত্যি বিয়েটা ভাঙল নানি আবার এলেন মাকে মিলান ফিরিয়ে নিয়ে যেতে; কিন্তু মা রাজি হলেন না।

‘তোমার নানি কিন্তু সব সময় অপরাধবোধে ভুগতেন মেয়েকে ধর্মশালায় পাঠিয়ে। এর জন্য তিনি ক্ষমাও চেয়েছেন; কিন্তু তোমার মা খুব জেদি ছিল। সে কখনোই ক্ষমা করেনি।’ বলছিলেন লরেটা।

সত্তর ও আশির দশকের অনেকটা সময় মা আমাকে নিয়ে একাই কাটিয়েছেন। মাকে আমি একাই দেখতাম, অসুখী দেখতাম। একপর্যায়ে ইয়োগা করতে শুরু করলেন। ভেজিটেরিয়ান হয়ে গেলেন। তাঁর প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার ধরা পড়ল ১৯৯৯ সালে। ডাক্তার বললেন, ছয় মাস টিকবে। তিনি ১১ মাস টিকেছিলেন। তিনি ব্যথানাশক ওষুধ খেতেন। তাঁর বিশ্বাস নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার কারণেই অসুখটা হয়েছে, এই শাস্তি তাঁর নিয়তি নির্ধারিত। ভাগ্য, কিসমত, কর্ম ইত্যাদি শব্দের প্রতি তত দিনে তিনি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি চাকরিবাকরি ছেড়ে তাই চিতে (চীনা ব্যায়াম যার অনুশীলন শরীরকে শক্ত করে ও মনে আনে প্রশান্তি) পুরোপুরি মগ্ন হলেন।

আমরা নানি ও মাকে দেখতে এসেছিলাম একেবারে শেষ বেলায়। সেটা ছিল অক্টোবর মাস। মায়ের শরীরের সব হাড় তখন বেরিয়ে এসেছিল। মা ও মেয়ের আবার একসঙ্গে হওয়াটা আমাকে আশাবাদী করেছিল; কিন্তু মা নানির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। আমি করিডরে পায়চারি করছিলাম, যেন তাঁরা একান্তে কিছু সময় কাটান।

শেষটা ঝগড়া দিয়েই শেষ হলো। আমার নানি পুরো রাত কেঁদে কাটালেন; কিন্তু কান্না আমার মাকে নরম করতে পারল না। নানি শেষে ফিরে গেলেন। তার কিছুদিন পরই নভেম্বরের ২৭ তারিখে মারা গেলেন মা। সে দিনটা ছিল আমার নানির ৮১তম জন্মদিন। নানি আর আসেননি। পরের ওই দিনটায় আমি যখনই নানিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গেছি, নানি শুধুই কান্না করেছেন।

 

সূত্র : ইনডিপেনডেন্ট ইউকে। ৩১ মার্চ ২০১৯। গ্রন্থনা : আহনাফ সালেহীন

মন্তব্য