kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

বালিশের নিচে রাখা চিঠি

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



এখন আর এমন টিনশেড বাসা দেখা যায় না। গ্রিলের বারান্দা। চালে দেখলাম কবুতরের খোপ। ছোট ছোট প্লাস্টিকের বোতল কেটে টব বানানো হয়েছে। নীল অপরাজিতা আর গেটফুল, সঙ্গে কয়েক রঙের মর্নিং গ্লোরিতে ছেয়ে আছে গ্রিল। এসব যার কারবার, তার রুচির তারিফ করলাম মনে মনে! তনমনা খুব সম্ভবত গোসলে আছে। ওর শাশুড়ি এসে দরজা খুলে দিলেন। ড্রয়িংরুমে বসতে দিলেন। আমি লাগোয়া বারান্দাটায় পায়চারি করছি।

আমার এদিকটা খুব পরিচিত না। ঢাকা উত্তর ফেলে আমি ঢাকা দক্ষিণে চলে এসেছি। ঠিকানা খুঁজব কি, গোলকধাঁধার মতো ফ্লাইওভারের নিচে এমন কদর্য রাস্তা দেখে পুরো ভড়কে গেলাম। শেষমেশ বহু ভুল গলি ঘুরে তনমনার শ্বশুরবাড়ি খুঁজে পেলাম। বেশ পুরনো বাড়ি। সামনে পাকা উঠান। দুই পাশে রাস্তা থাকায় বিল্ডিংয়ের ছায়া পড়ে অন্ধকার হয়ে যায়নি। আশির দশকের বাড়িগুলোর ফ্লেভার আছে!

‘স্যরি! দেরি করে ফেললাম। তুই কি অনেকক্ষণ আগে এসেছিস?’

তনমনা কাঁধে টোকা দিল। টাওয়েল দিয়ে চুল বেঁধেছে, কপাল গড়িয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আমার সম্মানে শাড়ি পরেছে। শাড়ির অবস্থা বেগতিক! এ কারণেই হয়তো এত দেরি করেছে।

আমাকে হাত ধরে ডাইনিংরুমে নিয়ে এলো। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ওর শাশুড়ি-ননদ সবাইকে নিয়ে খেতে বসলাম। তনমনার ননদ দুই ছেলের মা। তাদের মায়ের দুই পাশে বসানো হলো। বাচ্চাগুলো ডেঞ্জারাস! চেয়ারে বসে হুট করে এক জগ পানি ফেলে দিল! কি যেন কী হলো, দুই ভাই চুল টেনে যুদ্ধ শুরু করে দিল। খুব সম্ভবত গুরুতর কোনো যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বাচ্চা দুটি হোমো ইরেক্টাসই রয়ে গিয়েছে! সেপিয়ান্স অব্দি হতে পারেনি!

দাওয়াত দেওয়ার সময় তনমনাকে বলেছিলাম সবচাইতে শান্তিপূর্ণ খাবার, ভাত করতে। আমার কথা শুনেছে। চিংড়ি মাছ দিয়ে ঢেঁড়স ভাজি, মুরগির লটপটি দিয়ে লাউ-ডাল। অনেক রকম ভর্তা। ইলিশ মাছ ভাজি। শেষের কাস্টার্ডটা হয়েছে বেহেশতের অমৃত!

খাওয়ার পর্ব চুকে গেলে তনমনার ঘরে আমাকে নেওয়া হলো। আমি চোখ বুলিয়ে পুরোটা ঘর একবার দেখলাম। অকাজের জিনিস তনমনা ওর ঘরে রাখবে না। দেখতে সুন্দর, কিন্তু কাজের না—এমন কিছু আমার বান্ধবী তার ঘরে রাখবে না! তাই বোধ হয় আসবাব কম। থাকার মধ্যে আছে একটা ঢাউস বুকশেলফ। এবং মজার বিষয় হচ্ছে, সেলফের প্রতিটি বই খবরের কাগজ দিয়ে মলাট করা! তনমনা পেছনের ঘটনাটা বলল। মোটু, মানে নিলয় ভাই বই সংগ্রহ করা শুরু করেছেন অনেক আগে; কিন্তু কিছু অসাধু লোক তাঁর বই পড়তে নিয়ে আর ফেরত না দেওয়ায় তিনি ত্যাক্ত হয়ে এই মলাট পদ্ধতি শুরু করেছেন!

সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেক কথা হলো তনমনার সঙ্গে। ওর রাগী ননদ-নিলয় ভাইয়ের কবুতরপ্রীতি-প্রচুর কথা বলা শ্বশুর! মুখ ফসকে বলে ফেলল, নিলয় ভাই ওকে ‘পুতুল’ ডাকে। আজকে নিলয় ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হলো না। উনি রাতে ফিরবেন। ডিউটি শেষে চেম্বারে যাবেন। তনমনা আমাকে এগিয়ে দিতে চাইল। মানা করলাম। এবার রাস্তা চিনব। দরজা দিয়ে পা বাইরে ফেলতে তনমনা একটা চিঠি গুঁজে দিল। রাগ হলো আমি কেন আনিনি, তাই!

ঢাকার এক প্রান্তে প্রাণের বান্ধবীকে ফেলে আরেক প্রান্তে চলে যাচ্ছি। আবার কবে দেখা হবে, কে জানে! রাতে ডায়েরি লেখার সময় তনমনা অনেক অবাক হবে। বালিশের নিচে চিঠিটা দেখে ও কত খুশি হবে—ভাবতেই মন ভালো হয়ে গেল!

জুয়াইরিয়া জাহরা হক

মিরপুর, ঢাকা।

মন্তব্য