kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

ফেসবুক থেকে পাওয়া

আমারই রক্ত বইছে ওর শরীরে

১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমারই রক্ত বইছে ওর শরীরে

হাঁটি হাঁটি পা পা করে ২২ এপ্রিল আমার মেয়ে এক বছরে পদার্পণ করেছে। সব কিছুই যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এইতো সেদিন তার মা তাকে পেটে নিয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে ক্লাস করেছে, পরীক্ষা দিয়েছে, ডাক্তার দেখিয়েছে। সত্যি সময় বোধ হয় এভাবেই চলে যায়।

মামণিকে প্রথমবার দেখার পরে অসীম এক আনন্দে বুক ভরে গিয়েছিল। কান্না আসছিল—ও আমার সন্তান, আমি ওর বাবা। আমারই রক্ত বইছে ওর শরীরে! এমনি অনেক কথা মনে এসেছিল। তখন আমার মা-বাবার কথা মনে করে কেঁদেছিলাম। কারণ আমার মেয়ে তার দাদা-দাদির আদর থেকে বঞ্চিত হলো। মাকে বেশি ভালোবাসতাম বলে হয়তো আল্লাহপাক আমাকে একটা ছোট মা দিয়েছেন। প্রথম কয়েক দিন ও যখন বুকের দুধের জন্য কাঁদত মনে হতো আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। এখন আনিসা যখন বাবা বলে ডাকে তখন মনে হয় এটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শব্দ। সবচেয়ে সুখের ডাক।

দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল। অথচ আমার মনে হয় এইতো সেদিন, ছোট্ট একটা মা এসেছে আমার কোলে। একটু একটু করে বড় হচ্ছে। তার প্রতিটি মুভমেন্টই এত বেশি রোমাঞ্চকর মনে হয়! যখন প্রথম হাসল, আমাদের চিনল, বসতে পারল, মা-বাবা বলে ডাকল, হামাগুড়ি দেওয়া শিখল—সব কিছুই বিস্ময় নিয়ে দেখতাম, এখনো দেখছি। আনিসা এখন নিজে নিজে দাঁড়ায়, খাট থেকে নিজে নিজে নামার চেষ্টা করে। জানালায় গ্রিল কিংবা টেবিলের কোনা ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। নিজে নিজে কত-শত কথা বলে যায়! দাঁত উঠেছে, নিচের মাড়িতে দুটি, ওপরের মাড়িতে তিনটি। আর এই পাঁচটি দাঁত দিয়ে ইঁদুরছানার মতো হাতের কাছে যা পাবে কুটি কুটি করবে। কখনো আমাকে কামড়ে দেবে, কখনো মাকে, কখনো বড় খালা বা ছোট খালাকে। হাতের কাছে কিছু না পেলে আমাদের হাতের আঙুল মুখে ঢুকিয়ে কামড় দেবে। কামড় খেয়েও খুশি আমরা। অনেক সময় ইচ্ছা করে হাত কামড়াতে দিই আমরা। ঘরের ভেতরে বন্দিজীবন তার একটুও ভালো লাগে না। প্রায়ই বাসা থেকে নিচে যাওয়া জন্য অস্থির থাকে। নিচে গেলে খুবই খুশি। মুরব্বি দেখলে তাঁদের কাছে যেতে চায়।

তবে বাবাকে কাছে পেলে কাউকে তেমন আর দরকার হয় না। রাতে ঘুমের মধ্যে অবশ্য বাবাকে চেনেই না। ওর মা মেডিক্যালে গেলে আয়েশা আন্টি তাকে দেখভাল করে। আমি থাকি ঢাকায়। তাই সব সময় মেয়েকে কাছে পাই না। রংপুরে যখন যাই, দেখি মা আর মেয়ে নিজেদের মতো কথা বলছে, খেলছে, দুষ্টুমি করছে। আমি শুধু তাকিয়ে দেখি। আমার মেয়ে প্রাণ খুলে শব্দ করে হাসে। বেঁচে থাকাটা অনেক সুখের হয়ে উঠে। ঘুমের মধ্যে ওর মা যখন ওকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তখন আমার খুব হিংসা হয়। আহা, মেয়ে যদি আমার বুকে এভাবে ঘুমিয়ে থাকত!

আনিসার নানুর বাসাটা আমার কাছে ছোট্ট একটা স্বর্গ মনে হয়। ও যখন হামাগুড়ি দিয়ে পুরো বাসা ঘুরে বেড়ায় আর প্রাণ খুলে হাসে, তখন মনে হয় স্বর্গে আছি। আনিসার মা শাকিলা যখন রংপুর থেকে ঢাকা আসে, যত দিন থাকে তখন দিনগুলো আমার কাছে চাঁদের হাটের মতো লাগে। কারণ তখন অফিস থেকে বাসায় ফিরে মামণির হাসিমাখা মুখটা দেখতে পাই। মাঝে মাঝে অফিস ফাঁকি দিয়ে সারা দিন মেয়েটার সঙ্গে খেলা করি। ওর শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ নিই। সময় কখন যে চলে যায় বুুঝি না। ঢাকা থেকে রংপুর যাওয়ার সময় আনিসা যখন গাড়িতে ওঠে, আর আমি চলে এলে সে গাড়িতে আমাকে খুঁজতে থাকে। না পেয়ে কাঁদে। সেদিন আমার যে কি খারাপ লাগে, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পরম করুণাময়ের কাছে আমি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ এমন সুখের একটা জীবন দেওয়ার জন্য। একটা জীবনে এর চেয়ে বেশি সুখ আর চাই না। সময় বয়ে যাবে। আমাদের রাজকন্যাও একদিন বড় হবে। তুমি ভালো থেকো মা।

বশিরুল ইসলাম

জনসংযোগ কর্মকর্তা, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য